
মহেশপুর (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি।।
ঝিনাইদহের মহেশপুরে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পরও বন্ধ হয়নি গ্রামীণ সড়ক নির্মাণে হরিলুট। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কর্মকর্তা ও তদারককারীদের ‘ম্যানেজ’ করে সরকারি নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে নিম্নমানের ইট ও খোয়া দিয়েই রাস্তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এতে স্থানীয় জনগণের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হলেও অদৃশ্য ক্ষমতার ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না।
সংবাদ প্রকাশের পরও তোয়াক্কা নেই ঠিকাদারের: অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘গ্রামীণ সড়ক মেরামত ও সংরক্ষণ’ প্রকল্পের আওতায় উপজেলার নাটিমা ইউনিয়নের তালপট্রির মোড় থেকে মান্দারতলা অভিমুখ পর্যন্ত ১১৭০ মিটার রাস্তা প্রায় ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে পুনর্নির্মাণের কাজ পায় ‘মেসার্স শেখ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু শুরু থেকেই এই কাজে চরম অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়। অত্যন্ত নিম্নমানের দুই ও তিন নম্বর ইট এবং ইটের আদলা-খোয়া দিয়ে রাস্তার কাজ করায় গত ১৫ জুন জাতীয় ও একাধিক আঞ্চলিক দৈনিকে সচিত্র সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদ প্রকাশের পর উপজেলা প্রকৌশলী নিম্নমানের সামগ্রী অপসারণের নির্দেশ দিলেও, বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি।
সরেজমিন চিত্র: খোয়া না সরিয়েই চলছে রোলার: সরেজমিনে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নিম্নমানের ইট ও খোয়া রাস্তা থেকে অপসারণ করার সরকারি নিয়ম থাকলেও ঠিকাদার তা করেননি। উল্টো সেই পচা খোয়া ও ইটের আদলার ওপর নামমাত্র কিছু ভালো খোয়া ছিটিয়ে দিয়ে তড়িঘড়ি করে রোলার (রুলার) দিয়ে চেপে দেওয়া হয়েছে, যাতে অনিয়মটি ঢাকা পড়ে যায়।

কর্মকর্তাদের দ্বিমুখী বক্তব্য ও ‘অদৃশ্য শক্তি’র খেলা: স্থানীয় সাংবাদিক ও এলাকাবাসী জানান, শুরুতে মহেশপুর উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) মোঃ আবুল ফয়েজ ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, রাস্তায় ফেলা নিম্নমানের খোয়া ঠিকাদারকে অবশ্যই অপসারণ করতে হবে এবং এস্টিমেট (প্রাক্কলন) মেনেই কাজ করতে হবে। অন্যথায় কাজ করতে দেওয়া হবে না। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সেই নির্দেশ ফাইলবন্দিই রয়ে গেছে। অভিযোগ উঠেছে, কোনো এক ‘অদৃশ্য ক্ষমতা’র জোরে উপজেলা প্রকৌশলী ও তার অফিসকে ম্যানেজ করে ঠিকাদার বুক ফুলিয়ে এই অনিয়ম সচল রেখেছেন।
কাজের দেখভালের দায়িত্বে থাকা উপ-সহকারী প্রকৌশলী আলমগীর হোসেন নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন:
“নিম্নমানের ইট ব্যবহার করায় আমরা রাস্তার কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলাম এবং তা অপসারণ করতে বলেছিলাম। কিন্তু ঠিকাদার আমাদের কথার কোনো তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার জোরে সেই নিম্নমানের ইট দিয়েই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।”
ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগী এলাকাবাসী: রাস্তার অনিয়ম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা আশরাফুল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ঠিকাদার যখন রাস্তায় দুই ও তিন নম্বর ইট ফেলে, আমরা বাধা দিয়েছিলাম। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি। পরে সাংবাদিকরা এলে কাজ দুদিনের জন্য বন্ধ থাকে। কিন্তু এরপর আবার সেই দুই নম্বর ইট দিয়েই কাজ শুরু করা হয়।”
একই এলাকার বাসিন্দা শাহজাহান বলেন: “রাস্তা থেকে কোনো খারাপ ইট বা খোয়া সরানো হয়নি। চোখের পলক ফাঁকি দিতে খারাপ খোয়ার ওপর সামান্য কিছু ভালো খোয়া ছিটিয়ে রোলার চালিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, উন্নয়নের নামে প্রতিনিয়ত ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি টাকা লুটেপুটে খাওয়া হচ্ছে, অথচ প্রশাসনের নীরব ভূমিকা সাধারণ মানুষকে হতাশ করছে।
ঠিকাদার ও প্রকৌশলীর দায়সারা বক্তব্য: অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স শেখ ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী রাব্বি বলেন, “আমাকে মৌখিকভাবে কাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছিল। পরে ভালো মানের ইট দিয়ে কাজ করতে বলায় আমি এখন ভালো ইট দিয়েই কাজ করছি।” (যদিও সরেজমিনে নিম্নমানের খোয়া রোলার করার সত্যতা পাওয়া গেছে)।
এই বিষয়ে মহেশপুর উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) মোঃ আবুল ফয়েজ বলেন, “রাস্তার কাজ তো বন্ধ থাকার কথা। নিম্নমানের ইট ও খোয়া অপসারণের পরই এস্টিমেট অনুযায়ী কাজ করতে হবে।”
খারাপ খোয়া অপসারণ না করেই রোলার করা হয়েছে— এমন তথ্যের জবাবে তিনি বলেন, “রোলার করার বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কোনোভাবেই নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করতে পারবে না। আমি খোঁজ নিচ্ছি।”
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ঠিকাদারের এই জালিয়াতির নেপথ্যে এলজিইডির কারা জড়িত তা খতিয়ে দেখে অবিলম্বে এই নিম্নমানের কাজ বন্ধ করা হোক এবং তদন্তপূর্বক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক।










































