Home আঞ্চলিক প্রকৃতির আদালতে অহংকারের পতন ও আমার অবরুদ্ধ বিবেকের দায়মুক্তি

প্রকৃতির আদালতে অহংকারের পতন ও আমার অবরুদ্ধ বিবেকের দায়মুক্তি

9

মিজানুর রহমান মিলটন।।

প্রিয় পাঠক, ১১ জুন থেকে শুরু করে আমার বিরুদ্ধে হওয়া একের পর এক ষড়যন্ত্রমূলক মামলা, সেই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটানো ৪ মাস ১৪ দিনের নির্মম কারাবাস এবং জেলের ভেতরের ছোট-বড় নানা ঘটনাপ্রবাহ আপনাদের সামনে একে একে তুলে ধরেছি। এই দীর্ঘ পথযাত্রায় অনেকেই হয়তো মনে মনে প্রশ্ন তুলেছেন-যে ঘটনা ঘটেছিল বহু বছর আগে, তা নিয়ে আজ ৭ বছর পর কেন লিখতে বসলাম?

উত্তরটা অত্যন্ত স্পষ্ট এবং নির্মম। বিগত সময়টা আমার কিংবা মুক্ত সাংবাদিকতার অনুকূলে ছিল না। চারপাশের পরিবেশ এতটাই বিষাক্ত আর শোষণে ভরা ছিল যে, সত্য উচ্চারণ করার মতো ন্যূনতম স্বাধীনতাটুকুও অবশিষ্ট ছিল না। কিন্তু গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পর যখন অবরুদ্ধ এই দেশে মুক্ত বাতাসের আগমন ঘটল, পরিবেশ অনুকূলে এল, ঠিক তখনই আমার কলম আবার সচল হয়েছে।

আমি এই দীর্ঘ বেদনার মহাকাব্য কারো করুণা, দয়া কিংবা সস্তা সমমর্যাদা পাওয়ার জন্য লিখিনি। আমি লিখেছি আমার নিজের আত্মতৃপ্তির জন্য, আমার অবরুদ্ধ বিবেকের দায়মুক্তি এবং ইতিহাসের পাতায় সত্যকে জ্যান্ত রাখার জন্য।

অহংকারের পতন: সারদা থেকে কারাগারের অন্ধকার: আমি সবসময় একটি কথা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি-মানুষের তৈরি আদালতের চেয়ে ‘প্রকৃতির আদালত’ অনেক বেশি শক্তিশালী। ক্ষমতার দাপটে অন্ধ হয়ে যারা একদিন অন্যের জীবনকে জীবন্ত কবর দিতে দ্বিধা করে না, প্রকৃতি তাদের ঠিক একইভাবে ধূলিসাৎ করে দেয়। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ স্বয়ং সাবেক ডিআইজি মোল্যা নজরুল ইসলাম।

বিগত ২০২৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীর সারদা পুলিশ একাডেমি থেকে এই প্রতাপশালী কর্মকর্তাকে যখন পুলিশই গ্রেফতার করে নিয়ে যায়, সেদিন আমি আবারও প্রকৃতির অমোঘ নিয়মের প্রতি অবনত হয়েছিলাম। যে মানুষটি একদিন অন্যের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে দ্বিধা করেনি, আজ সে নিজেই জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে নিষ্ঠুর সহিংসতা এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের দায়ে কাঠগড়ায় বন্দি।

২০২৪ সালের ২২ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর গুলশানে কমার্স কলেজের ২০ বছরের তরুণ শিক্ষার্থী ফাহিম হোসাইন জুবায়ের গুলিবিদ্ধ হয়ে যখন মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েছিল, তখন ক্ষমতার মদমত্ততায় কেউ ভাবেনি এর হিসাব দিতে হবে। কিন্তু ৫ অক্টোবর জুবায়েরের বাবার দায়ের করা হত্যাচেষ্টা মামলায় (মামলা নং-৩৫) এই মোল্যা নজরুল ইসলামকেই অন্যতম প্রধান আসামি করা হয়। এই পাপের দাগ নিয়েই তাকে রিমান্ডের মুখোমুখি হতে হয়েছে, দেখতে হয়েছে চেনা লকআপের অন্ধকার।

পাপের খতিয়ান: দুদক থেকে শাপলা চত্বরের গণহত্যা: মোল্যা নজরুলের পাপের খতিয়ান এখানেই শেষ নয়। ২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাঁর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা দায়ের করে। এরপরই ঢাকার আদালত আফতাবনগর ও রামপুরায় তাঁর আলিশান ফ্ল্যাট, জমিসহ যাবতীয় স্থাবর সম্পত্তি ক্রোক এবং ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করার আদেশ দেয়। যে অর্থ ও সম্পদের লোভে তিনি একদিন আমার স্বপ্নের ছাপাখানায় ৭টি নির্মম তালা ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন, আজ তাঁর নিজের সেই অবৈধ সম্পদই তাঁর গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শুধু তাই নয়, ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে যে নির্মম হত্যাযজ্ঞ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ চালানো হয়েছিল, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের হওয়া সেই ঐতিহাসিক গণহত্যা মামলারও অন্যতম আসামি এই মোল্যা নজরুল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে একই সমান্তরালে আজ তাকেও গণহত্যার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে, ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে সরকারি চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। যে উর্দির গরমে তিনি নিজেকে ঈশ্বর ভাবতেন, সেই উর্দিও আজ তাঁর গা থেকে ধুলোর মতো ঝরে গেছে।

উপসংহার: প্রতিশোধ নয়, আমি প্রকৃতির বিচারের প্রতীক্ষায়: প্রিয় পাঠক, আমি জীবনের কঠিনতম সময়েও কখনো কারও প্রতি হিংসা বা প্রতিশোধের আগুনে জ্বলে উঠিনি। আমি সবসময় প্রকৃতির বিচারের ওপর ভরসা রেখেছি। আজ প্রকৃতি আমাকে সেই চাক্ষুষ নিখুঁত বিচার দেখিয়েছেন। যে মানুষটি আমার জীবন থেকে মূল্যবান সময় আর আমার রুটি-রোজগারের মাধ্যম কেড়ে নিয়েছিল, আজ সে নিজেই সমাজে ঘৃণিত, চাকরিচ্যুত এবং কারাবন্দি।

তবে লড়াইটা এখানেই শেষ নয়। মোল্যা নজরুলের সেই দুই বিশ্বস্ত সাগরেদ—এসআই অলোক কুমার হালদার ও এসআই অনুপ কুমার দাশ, যারা গায়ের জোরে আমার প্রিয় ‘খুলনাঞ্চল’ অফিসে ৭টি তালা ঝুলিয়ে দিয়েছিল, তারা এখনো বাংলাদেশ পুলিশে কর্মরত আছে। কিন্তু আমি জানি, পাপের ঘড়া তাদেরও পূর্ণ হয়ে এসেছে। তাদের বিচার এখন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।

আজকের এই শেষ পর্বে এসে বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধু এটুকুই বলব-ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু সত্য চিরন্তন। অন্যায় যত শক্তিশালীই হোক না কেন, তার পতন অনিবার্য। আমি আমার ছাপাখানার ধুলোবালি মাখা মেশিনের দিকে তাকিয়ে আজও স্বপ্ন দেখি, খুব শীঘ্রই এই আঁধার কেটে যাবে। আলোর মুখ দেখবে আমার ভালোবাসা, আমার ‘খুলনাঞ্চল প্রেস এন্ড পাবলিকেশন্স’। প্রকৃতির এই অমোঘ বিচারের বাণী বুকে নিয়েই আমি আজও বেঁচে আছি, এবং আগামীর বুক বেঁধে লড়াই করে যাব। (সমাপ্ত)