মিজানুর রহমান মিলটন ।।
প্রিয় পাঠক, বিগত ৫টি পর্বে আপনাদের জানিয়েছিলাম কীভাবে ক্ষমতার লোভ আর ছদ্মবেশী কিছু সাংবাদিক নামধারী শকুনের দল তৎকালীন সিআইডি-র স্পেশাল সুপার (নড়াইলের সন্তান) মোল্লা নজরুলের সাথে হাত মিলিয়ে আমাকে জীবন্ত কবর দেওয়ার নীল নকশা তৈরি করেছিল। ১০ জুন ২০১৯-খুলনা থেকে আমাকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতারের পর খুলনা, যশোর, নড়াইল ও গোপালগঞ্জে মোট ২৯টি গায়েবি মামলার বেড়াজালে বন্দী করা হয়। আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরব সেই বন্দিজীবনের সবচেয়ে অমানবিক ও রক্তাক্ত অধ্যায় এবং কারাগার থেকে বের হওয়ার পরও এক নির্মম প্রতিহিংসার গল্প।
ডান্ডাবেড়ি ও রক্তাক্ত লোহাগড়া এক্সপ্রেস: সেদিন ছিল নড়াইল কারাগার থেকে আমাকে গোপালগঞ্জ কারাগারে চালান করার দিন। সকাল হতেই সাজ সাজ রব। বাইরে একটা থ্রি-হুইলার এসে দাঁড়িয়েছে। তৎকালীন নড়াইল জেলখানার প্রধান মেট ঠান্ডু ভাই আমাকে একটি রুমে ডেকে নিয়ে মাটির মেঝেতে বসতে বললেন। আমি স্তব্ধ হয়ে মাটিতে বসলাম।
ঠান্ডু ভাই দুটি ভারী লোহার রেলপাটি এনে পাশাপাশি রাখলেন এবং তার মাঝে আমাকে পা রাখতে বললেন। প্রথমে ডান পা, তারপর বাম পা। পা দুটো রাখতেই তিনি ভারী ‘ডান্ডাবেড়ি’ এনে অদ্ভুত এক হিংস্রতায় আমার দুই পায়ে সিল করে দিলেন। আইন ও নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস! দুই পায়ে ডান্ডা আর বেড়ি, দুই হাতে হাতকড়া, আর সেই অবস্থাতেই হাতে তুলে নিতে হলো কারাগারে ব্যবহৃত আমার সামান্য কাপড়ের ব্যাগ। বের হওয়ার আগে কারা অফিস থেকে আমার পিসিতে (কারা অ্যাকাউন্ট) থাকা অবশিষ্ট মাত্র ৬০০ টাকা আমার হাতে বুঝিয়ে দেওয়া হলো।
লোহার শিকল টানতে টানতে থ্রি-হুইলারে চড়ে যখন নড়াইল মালিবাগে পৌঁছালাম, তখন আমাকে লোকাল বাসে তোলা হলো। বাসের সাধারণ যাত্রীরা আমার দিকে এমন কড়া আর আতঙ্কিত চোখে তাকাচ্ছিল, যেন আমি দেশের কোনো নামকরা দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী! লোকাল বাসে কোনো সিট পেলাম না। ডান্ডাবেড়ির তীব্র ওজন আর হাতকড়ার যন্ত্রণা নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই লোহাগড়া পর্যন্ত পৌঁছালাম। বাস যখন লোহাগড়া পার হচ্ছিল, তখন আমি নিচের দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠলাম। আমার ডান পা কেটে রক্তক্ষরণ হচ্ছে; ডান্ডাবেড়ির ধারালো লোহার অনবরত আঘাতে চামড়া উঠে মাংস খুবলে গেছে। কিন্তু সেই রক্ত আর ব্যথার দিকে তাকানোর মতো কোনো মানবিক চোখ সেদিন রাষ্ট্র কিংবা সমাজের ছিল না।
গোপালগঞ্জ কারাগার ও সাংবাদিক নিশান ভাইয়ের গল্প: গোপালগঞ্জে পৌঁছানোর পর আবারো চেনা নরকযন্ত্রণা—প্রথম দিনের আমদানি ওয়ার্ড, ভোররাতে কেস টেবিল, মেডিকেল চেকআপ এবং সবশেষে কপালে জুটল সিলেটের হাজতী নম্বর। তবে এই অন্ধকারের মাঝেও ঈশ্বর একজন মানুষকে আমার পাশে পাঠিয়েছিলেন। কারাগারে পরিচয় হলো গোপালগঞ্জের স্থানীয় সাংবাদিক মোর্শেদায়ন নিশান ভাইয়ের সাথে (মাছরাঙা টেলিভিশনের তৎকালীন প্রতিনিধি)। ২০১৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে গোপালগঞ্জ শহরের বেদগ্রাম এলাকায় নিজ বাড়িতে স্ত্রী জাকিয়া মল্লিক হত্যাকাণ্ডের এক নির্মম ও সাজানো মামলায় তিনি দীর্ঘ বছর ধরে কারাবন্দী ছিলেন। সহকর্মী আর সহযোদ্ধা হওয়ার কারণে আমরা দুজনে কারাগারের এক কোণে বসে একে অপরের সুখ-দুঃখের গল্প করে অধিকাংশ সময় কাটাতাম। সাতটি দিন গোপালগঞ্জ কারাগারে নিশান ভাইয়ের সাথে কাটানোর পর, আবারো আমাকে নড়াইলে চালান দেওয়ার নির্দেশ আসে।
জসিমের মানবতা ও মুক্তির সেই চিৎকার: এবার আর বাসে নয়, একটি থ্রি-হুইলারে করে আমাকে নড়াইলে ফিরিয়ে আনা হচ্ছিল। এই যাত্রায় যারা আমাকে গোপালগঞ্জ থেকে নিয়ে আসছিলেন, তাদের মধ্যে জসিম নামে একজন অদ্ভুত দয়ালু পুলিশ সদস্য ছিলেন। আমার ডান্ডাবেড়ি পরা রক্তাক্ত পা আর মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে উনার বুকের ভেতরটা হয়তো কেঁদে উঠেছিল। তিনি গোপনে উনার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনটি আমার হাতে তুলে দিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “ভাই, সারা রাস্তা আপনার যাকে ইচ্ছে ফোন করুন, কথা বলুন।”
সেদিন জসিমের সেই ফোনটি ছিল মরুভূমিতে এক ফোঁটা জলের মতো। আমি অনেকের সাথে কথা বলেছিলাম, আমার পরিবার ও প্রিয়জনদের কণ্ঠ শুনেছিলাম। বাইরে আমার দুই ছোট ভাই তখন আমার মামলার তদ্বির করতে করতে দিন-রাত এক করে ফেলছিল। তারা এক এক করে আমার বিরুদ্ধে দেওয়া ২৯টি মিথ্যা মামলারই জামিন করাল। দীর্ঘ ৪ মাস ১৪ দিন-অর্থাৎ ১৩৪টি রক্তক্ষয়ী রাতের পর যখন অবশেষে আমার মুক্তির পারওয়ানা এলো, কারাগারের লোহার গেটটি যখন আমার সামনে খুলে গেল, তখন ইচ্ছে করছিল মনের সমস্ত শক্তি দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা চিৎকার দিই এবং রাজপথ ধরে পাগলের মতো দৌড়াতে থাকি!
ফ্রিজ অ্যাকাউন্ট ও ছাপাখানায় ৭টি তালার নির্মমতা: কারাগার থেকে বের হয়ে আমি এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করিনি। বুক ভরা আশা নিয়ে আবারো আমার প্রাণের প্রতিষ্ঠান, আমার পত্রিকা অফিসে গিয়ে বসলাম। কিন্তু হায়েনাদের হিংস্রতা তখনও শেষ হয়নি। আমি কারাগারে থাকা অবস্থাতেই সিআইডি-র দুই এসআই অনুপ কুমার দাশ ও অলোক চন্দ্র হালদার আমার ও আমার স্ত্রীর ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ (স্থগিত) করে রেখেছিল, যা আজ দীর্ঘ ৭ বছর ধরে এখনো ফ্রিজ অবস্থাতেই আছে।
শুধু তাই নয়, আমি কারাগারে থাকাকালীন তারা আমার পত্রিকায় কর্মরত বন্ধু কৌশিক দে ও মোস্তফা জামাল পপলুকে গ্রেফতারের হুমকি দিয়ে পত্রিকা প্রকাশে বাধা সৃষ্টি করেছিল। একপর্যায়ে আমার ভগ্নিপতি শাহ আলমকে চরম ভয়ভীতি দেখিয়ে অফিসে তালা দিতে বাধ্য করে এবং নিয়মিত প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়।
কারাগার থেকে ফিরে আমি যখন বুক বেঁধে আবারো পত্রিকা ছাপানোর কাজ শুরু করলাম এবং নিয়মিত পাঠকের দরজায় ‘খুলনাঞ্চল’ পৌঁছাতে লাগল, ঠিক তখনই ঘটল সেই চূড়ান্ত আঘাত। হঠাৎ একদিন এসআই অনুপ কুমার দাশ হাতে ৭টি বড় বড় তালা নিয়ে আমার অফিসে হাজির হলেন। কোনো আইনি নোটিশ ছাড়াই তিনি আমাকে গায়ের জোরে অফিস থেকে বের করে দিলেন এবং আমার অফিস ও প্রেসের মূল ফটকে সেই ৭টি তালা ঝুলিয়ে দিলেন।
ধুলো আর অন্ধকারের নিচে চাপা পড়ে আছে আমার সাংবাদিকতার স্বপ্ন : আজ দীর্ঘ ৭টি বছর ধরে আমার সেই প্রাণের প্রতিষ্ঠান, আমার ছাপাখানা সম্পূর্ণ তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। আমার রক্ত জল করা টাকায় কেনা ১০টি কম্পিউটার, আসবাবপত্র, দামি প্রিন্টার আর আধুনিক ছাপাখানাটি ভেতরে কী অবস্থায় আছে-তা আমি জানি না। ধুলো আর অন্ধকারের নিচে চাপা পড়ে আছে আমার সাংবাদিকতার স্বপ্ন।
তবে আমি বিশ্বাস হারাইনি। সত্যের আলো যেমন ডান্ডাবেড়ি দিয়ে আটকে রাখা যায়নি, তেমনি এই অন্যায় তালাও বেশিদিন টিকবে না। আশা করছি খুব শীঘ্রই আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে আমি আমার প্রিয় অফিসের তালা খুলতে সক্ষম হব। কিন্তু দীর্ঘ ৭টি বছর বন্ধ থাকা এই প্রতিষ্ঠানের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা হয়তো অফিসটি খুললেই হাড়ে হাড়ে টের পাব। ক্ষমতার অপব্যবহার করে যারা একটি জীবন্ত সংবাদপত্র ও ছাপাখানাকে গলা টিপে হত্যা করেছে, প্রকৃতির আদালতে তাদের বিচার একদিন হবেই-এই বিশ্বাস নিয়েই আমি আজও বেঁচে আছি। (চলবে)











































