শামিম শিকদার।।
কখনও কখনও একটি স্থিরচিত্র হাজারো শব্দের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আজকের এই ছবিটি শুধু দুটি অতি পরিচিত চেনা মুখের অবয়ব মাত্র নয়; এটি আসলে বুকের ভেতর পাথর চাপা দিয়ে রাখা শত কোটি দীর্ঘশ্বাস, সীমাহীন রক্তক্ষরণ এবং অবশেষে এক ঐতিহাসিক বিজয়ের জীবন্ত ও জ্বলজ্বলে দলিল। ছবিতে আমরা যাদের দেখছি, তারা আজ অশ্রুসজল। একজন খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি ও নবনিযুক্ত খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ)-এর চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এস এম শফিকুল আলম মনা এবং অন্যজন তাঁর দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ছায়াসঙ্গী-মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও বিসিবি পরিচালক শফিকুল আলম তুহিন।
আজ ১৬ জুন, ২০২৬। খুলনাবাসীর জন্য এক অবিস্মরণীয় মাহেন্দ্রক্ষণ। আজ যখন এড. শফিকুল আলম মনা কেডিএ-র সর্বোচ্চ মর্যাদার চেয়ারটিতে বসতে যাচ্ছেন, ঠিক তার আগের এই মুহূর্তটিতে দুই নেতার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুবিন্দু দেখে যে কেউ থমকে দাঁড়াবেন। এই অশ্রু কিসের? কষ্টের, নাকি পরম আনন্দের? বিষাদের, নাকি বহু কাঙ্ক্ষিত মুক্তির?
এই অশ্রুর প্রকৃত কারণ ও গভীরতা বুঝতে হলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে, হাঁটতে হবে বিগত দেড় দশকের সেই রক্তাক্ত ও পিচ্ছিল রাজপথে। এই অশ্রু আসলে সেই কালরাত্রির, যখন স্বৈরাচারের লেলিয়ে দেওয়া পেটুয়া বাহিনী আর চাটুকার প্রশাসনের বুটের তলায় পিষ্ট হয়েছিল মানুষের নূন্যতম অধিকার। এই দুই নেতার জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে শত শত মিথ্যা মামলা, হুলিয়া আর কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠের অমানবিক নির্যাতন।
এক যুগ ধরে তাদের প্রতিটি দিন কেটেছে আদালতের বারান্দায় আর প্রতিটি রাত কেটেছে গ্রেফতারের আতঙ্কে। এই অশ্রু সেই বুক ফাটানো কান্নার, যখন রাজপথে নিজের ভাইকে, নিজের সহযোদ্ধাকে পাশে না পেয়েও, স্বজন হারানোর তীব্র বেদনাকে বুকে চেপে দলের পতাকাটা শক্ত হাতে উঁচিয়ে ধরে রাখতে হয়েছিল। বহুবার ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে তাদের ভাঙার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু তারা ছিলেন আপসহীন। তাই আজ যখন সমস্ত অন্যায় আর জুলুমের প্রাচীর ভেঙে সত্যের জয় হয়েছে, তখন চোখের এই জল আসলে এক বুক হালকা করা আনন্দের, পরম প্রাপ্তির এবং বুক চিরে দীর্ঘ সময় পর বেরিয়ে আসা এক পরম স্বস্তির নিঃশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ।
রাজনীতিতে ক্ষমতার দাপট দেখানো কিংবা রাজকীয় মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেওয়া খুব সহজ, কিন্তু চরম প্রতিকূল সময়ে মানুষের হৃদয়ে খাঁটি ভালোবাসা আর আস্থা তৈরি করা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। এই দুই নেতা সেই কঠিন ও অসম্ভব কাজটাই করে দেখিয়েছেন রাজপথে বুক চিতিয়ে লড়াই করার মাধ্যমে।
আমাদের মনে পড়ে ২০২১ সালের ৯ ডিসেম্বরের কথা। চারপাশ তখন ফ্যাসিবাদের ঘন কালো মেঘে ঢাকা। ঠিকঠাক একটা মিছিল করার সুযোগ পর্যন্ত ছিল না। সেই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে শফিকুল আলম মনা ও শফিকুল আলম তুহিন যখন যথাক্রমে খুলনা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবের গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, তখন অনেকেই হয়তো ভাবেননি যে তারা এই ভাঙা তরীকে তীরে ভেড়াতে পারবেন। কিন্তু সমস্ত জল্পনা-কল্পনাকে ভুল প্রমাণ করে তারা দমে যাননি, ঘরে বসে থাকেননি।
তারা মহানগরীর প্রতিটি কোনায় ছুটে গেছেন। ৩১টি ওয়ার্ড, ৩টি ইউনিয়ন এবং ৫টি থানায় প্রতিটি সাধারণ কর্মীর দোরগোড়ায় গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। কোনো ড্রয়িংরুম পলিটিক্স বা পকেট কমিটি নয়; বরং সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক উপায়ে সরাসরি মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ভোটের মাধ্যমে প্রতিটি স্তরে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেন। তাদের এই সাহসী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ সে সময় সমগ্র বাংলাদেশের রাজনীতিতে তুমুল প্রশংসা কুড়িয়েছিল এবং দলের ভেতরে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছিল।
তৃণমূলকে সুসংগঠিত করার সেই কঠোর পরিশ্রমের ফসল হিসেবেই রচিত হয়েছিল ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারির সেই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। দীর্ঘ ৪৭ বছরের ইতিহাস ভেঙে, খুলনা সার্কিট হাউজ মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছিল খুলনা মহানগর বিএনপির ঐতিহাসিক সম্মেলন। সেই দিনটির কথা মনে হলে আজও প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের বুক গর্বে ভরে ওঠে। লাখো মানুষের সেই জনসমুদ্রে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন আমাদের প্রিয় নেতা, দলের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বর্তমান দূরদর্শী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সার্কিট হাউজের সেই মাঠ পেরিয়ে জেলা স্টেডিয়ামের কাউন্সিলর অধিবেশনে যা ঘটেছিল, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কোনো চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত বা সিলেকশন নয়, বরং সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ৫০৫ জন তৃণমূল কাউন্সিলরের পবিত্র ও মূল্যবান ভোটের মাধ্যমে মনা-তুহিন জুটি বিপুল ব্যবধানে নির্বাচিত হন। তৃণমূলের কর্মীরা তাদের ত্যাগ, সততা আর ভালোবাসার যোগ্য প্রতিদান দিয়েছিলেন ব্যালট পেপারের মাধ্যমে। সেদিনই প্রমাণিত হয়েছিল, মনা-তুহিন জোড়া কেবল পদের নেতা নন, তারা খুলনার মাটির প্রতিটি ধূলিকণার সাথে মিশে থাকা নেতা।
১৯৯৮ সালের পর থেকে দীর্ঘ প্রায় তিনটি দশক ধরে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ)-এর শীর্ষ নেতৃত্বে ছিলেন সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাবৃন্দ বা আমলাতান্ত্রিক ব্যক্তিত্বরা। ফলে সাধারণ মানুষের সাথে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের একটি বড় ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। দীর্ঘ ২৮ বছর পর সেই ধারার অবসান ঘটিয়ে একজন খাঁটি বেসামরিক, রাজনৈতিক ও জনমানুষের প্রতিনিধি হিসেবে এড. শফিকুল আলম মনা আজ এই প্রতিষ্ঠানের হাল ধরছেন।
আজকের এই অশ্রুসজল মুহূর্তটি তাই শুধু একটি ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং দীর্ঘ ও বন্ধুর পথের শেষ প্রান্তে এসে খুলনাবাসীর এক পরম প্রাপ্তি। আজ যখন তিনি কেডিএ-র চেয়ারম্যানের দায়িত্বভার বুঝে নিচ্ছেন, তখন তাঁর চোখের কোণে জমে থাকা জল কণাগুলো যেন প্রিয় নেতার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা এবং খুলনাবাসীর প্রতি এক অসীম দায়বদ্ধতার কথাই নীরবে জানান দিচ্ছে।
বর্তমান যুগের রাজনীতিতে যেখানে পদের জন্য ভাই ভাইয়ের রক্ত চোষে, পিঠে ছুরি মারে-সেখানে শফিকুল আলম মনা ও শফিকুল আলম তুহিনের এই অশ্রুভেজা কোলাকুলি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা এক বিরল দৃষ্টান্ত। তাদের এই সুখ-দুঃখের মেলবন্ধন এতটাই নিবিড়, নিখাদ ও অবিচ্ছেদ্য যে তা যে কোনো রাজনৈতিক কর্মীর জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।
এই ছবি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, তারা ক্ষমতার মোহে অন্ধ বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের কোনো দূরবর্তী শাসক নন; তারা মাটির মানুষ, দুঃখী মানুষের আপনজন এবং কর্মীদের অতি আদরের ভাই। রাজপথের প্রতিটি মিছিলে, টিয়ারশেল আর লাঠিচার্জের মুখে তারা যেভাবে একে অপরকে আগলে রেখেছিলেন, আজ সাফল্যের চূড়ায় দাঁড়িয়েও তারা ঠিক একইভাবে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন।
খুলনার আকাশ-বাতাস আজ এই দুই বীর নেতার জন্য আনন্দাশ্রু ঝরাচ্ছে। গোটা খুলনা শহর আজ তাদের এই ঐতিহাসিক ক্ষণকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। বর্ষা এলেই এই শহর জলাবদ্ধতায় ডুবে যায়, অপরিকল্পিত নগরায়ণে শ্বাস রুদ্ধ হয় নাগরিকদের। খুলনাবাসী বিশ্বাস করে, রাজপথের এই দীর্ঘ ত্যাগ, সততা এবং মাটির মানুষের সাথে থাকা এই গভীর অনুভূতির আলো দিয়েই এবার কেডিএ-র দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটবে।
টাকা কিংবা ক্ষমতার অহংকার নয়, বরং মানুষের ভালোবাসাকে পুঁজি করে তিল তিল করে গড়ে উঠবে আমাদের স্বপ্নের তিলোত্তমা ও আধুনিক খুলনা। প্রিয় দুই নেতার এই আবেগঘন, অশ্রুসজল মুহূর্তটি ইতিহাসের পাতায় আজীবন অম্লান ও ভাস্বর হয়ে থাকবে এবং আগামী প্রজন্মকে শেখাবে-কীভাবে সমস্ত ঝড়-তুফান মোকাবিলা করে সততার সাথে বিজয়ের বন্দরে পৌঁছাতে হয়।











































