মিজানুর রহমান মিলটন||
প্রিয় পাঠক, আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরব আমার জীবনের সেই অবিনাশী অধ্যায়, যেখানে একদিকে ছিল ক্ষমতা আর অর্থের লোভী কিছু মানুষের পাতা নির্মম ফাঁদ, আর অন্যদিকে ছিল মেহনতি মানুষ ও সহযোদ্ধাদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। হাতকড়া পরে যখন আমি খাঁচায় বন্দি, তখন বাইরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জ্বলে উঠেছিল প্রতিবাদের এক দাবানল।
১০ জুন ২০১৯। আমার জীবনের সেই কালরাত্রির পর, খুলনাসহ ৪টি জেলায় আমার বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও মিথ্যা অভিযোগে একে একে ২৯টি গায়েবি মামলা ঠুকে দেওয়া হয়েছিল। এই পুরো নোংরা অধ্যায়ের নেপথ্যের মূল কারিগর ছিলেন তৎকালীন সিআইডি-র দুই কর্মকর্তা—এসআই অলোক চন্দ্র হালদার ও অনুপ কুমার দাশ। কিন্তু বন্দিত্বের সেই চরম গ্লানি আর অন্ধকারের মাঝেও আমার বেঁচে থাকার অক্সিজেন হয়ে এসেছিল রাজপথের উত্তাল স্লোগান।

শিকলভাঙার গান ও রাজপথের লড়াই: আমি কারাগারে যাওয়ার পর বাইরে আমার সহকর্মী, পেশাদার সাংবাদিক ভাই ও মেহনতি মানুষেরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে যেভাবে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, তা ভাবলে আজও কৃতজ্ঞতায় মন ভরে ওঠে। আমার মুক্তির দাবিতে ‘খুলনা প্রেসক্লাব’-এর ব্যানারে রাজপথে নেমে এসেছিলেন আমার সহযোদ্ধারা। প্রতিবাদের সেই আগুন শুধু খুলনা মহানগরেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তা ছড়িয়ে পড়েছিল পাইকগাছা, সাতক্ষীরা, শ্যামনগর, কপিলমুনি, শিরোমনি-এমনকি খুলনা জেলা সংবাদপত্র হকার্স শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ শ্রমজীবী ভাইদের মাঝেও। চারিদিকে আমার মুক্তির দাবিতে একের পর এক মানববন্ধন ও সমাবেশ হচ্ছিল।
কারাগারে বসে প্রতিদিনের এই আন্দোলনের খবর আমি নিয়মিত পেতাম। কারাগারে প্রতিদিন ঢাকা থেকে আসা দুটি জাতীয় পত্রিকা পড়ার সুযোগ হতো আমার। অবাধ্য চোখ দুটো দিয়ে পত্রিকার পাতা ওল্টাতাম আর দেখতাম—আমার মুক্তির দাবিতে আমার ভালোবাসার মানুষগুলো রাজপথে স্লোগান দিচ্ছে। তখন মনে হতো, শরীরটা খাঁচায় বন্দি থাকলেও ওরা আমার আদর্শ আর সত্যের কণ্ঠরোধ করতে পারেনি।
কারাগারের ভিন্নচিত্র: ‘ডিসি ফাইল’ ও ‘সুপার ফাইল’: কারাজীবনের দিনলিপিতে কিছু দিন ছিল একদম অন্যরকম। মাঝে মাঝেই কারাগারে ‘ডিসি ফাইল’, আবার কখনো ‘সুপার ফাইল’ অনুষ্ঠিত হতো। ফাইলের দিনগুলোর চিত্র সাধারণ দিনগুলোর চেয়ে পুরোপুরি ভিন্ন ও ভীষণ কড়া থাকত।
সেই দিনগুলোতে সকাল থেকেই পুরো ওয়ার্ডে সাজ সাজ রব পড়ে যেত। বন্দিদের সব বিছানা নিখুঁতভাবে গুছিয়ে ঘরের একপাশে স্তূপ করে রাখা হতো। এরপর হাজতী ও কয়েদিদের নির্দিষ্ট নিয়মে রুমের চারিপাশে সারিবদ্ধভাবে বসিয়ে দেওয়া হতো—নড়াচড়া করার কোনো উপায় থাকত না। সবার হাতে শক্ত করে ধরা থাকত নিজ নিজ ‘কেস টিকিট’। ডিসি বা সুপার যখন ফাইলে আসতেন, তখন বন্দিরা তাঁদের দিকে তাকিয়ে কারাগারের অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যা, খাবারের কষ্ট কিংবা আইনি জটিলতার কথা তুলে ধরতেন। সেই মুহূর্তগুলো ছিল বন্দিদের জন্য জেলার বা ডিসি সাহেবের সরাসরি মুখোমুখি হওয়ার একমাত্র সুযোগ।
বিবেকের দংশন নাকি নতুন ফাঁদ? কারাগারের সেই দুর্বিষহ নরকযন্ত্রণা ভোগ করার পর, মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে যখন আমি জামিনে বের হয়ে এলাম, তখন এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল। সেই তদন্ত কর্মকর্তা অনুপ কুমার দাশ নিজেই আমার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে শুরু করলেন। হয়তো পাপবোধ থেকে বিবেকের তাড়নায়, কিংবা নতুন কোনো ফন্দি আঁটতে—তিনি একদিন আমার সামনে উগরে দিলেন ভেতরের আসল সত্য।
অনুপ কুমার দাশ প্রায়শই আফসোসের সুরে আমাকে বলতেন, “মিলটন ভাই, বিশ্বাস করেন—আপনার বিরুদ্ধে এসব করার পেছনে আমাদের নিজেদের কোনো হাত ছিল না, আমাদের কিছুই করার ছিল না। সব হয়েছে উপরমহলের নির্দেশে, তৎকালীন এসপি সাহেবের সরাসরি আদেশে। আর খুলনার কয়েকজন সাংবাদিক নিয়মিত সিআইডি-র ডিআইজি মোল্লা নজরুলের সাথে যোগাযোগ রেখে আপনার বিরুদ্ধে এই পুরো নীল নকশা বাস্তবায়ন করিয়েছে।”
নিজের ডিপার্টমেন্টের ভেতরের এমন কুৎসিত সত্য যখন খোদ তদন্ত কর্মকর্তার মুখ থেকেই শুনছিলাম, তখন একজন ভুক্তভোগী হিসেবে আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছিল। রাষ্ট্রের যে আইন আমাদের রক্ষা করার কথা, সেই আইনকেই কয়েকজন স্বার্থান্বেষী মানুষ নিজেদের পকেটবন্দি করে একজন নিরপরাধ মানুষকে বলির পাঁঠা বানিয়েছে!
আশ্বাসের আড়ালে ৫ লাখ টাকার বাণিজ্য: ২৯টি মিথ্যা মামলার বোঝা মাথায় নিয়ে যখন আমি দিশেহারা, প্রতিনিয়ত কোর্টের বারান্দায় বারান্দায় হাজিরা দিতে দিতে যখন আমার জীবন ও জীবিকা প্রায় ধ্বংসের মুখে, তখন একদিন নিরুপায় হয়ে অনুপকে জিজ্ঞেস করেছিলাম- “অনুপ ভাই, এখন আমি কী করব? এই মিথ্যা মামলা আর জঘন্য হয়রানিমূলক হাজিরা থেকে আমি কীভাবে বাঁচব?”
তখন অনুপ কুমার দাশ আমাকে অভয় দিয়ে বলেছিলেন, “মিলটন ভাই, এসব সাজানো মামলায় আপনার কিচ্ছু হবে না। এমনকি আপনার বিরুদ্ধে যে মানিলন্ডারিং মামলা দেওয়া হয়েছে, সেই মামলার চার্জশিট থেকেও আপনার নাম সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে দেব—আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি।” কিন্তু এই প্রতিশ্রুতির আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক চরম অর্থলিপ্সা। তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, চার্জশিট থেকে নাম বাদ দিতে হলে ৫ লাখ টাকা দিতে হবে।
মিথ্যা মামলার অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে, নিজের সম্মান আর পরিবারকে বাঁচাতে আমি তখন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। নিরুপায় হয়ে চারদিক থেকে ধারকর্জ করে, আমি অনুপের চাহিদামতো সেই ৫ লাখ টাকা জোগাড় করি। বিশ্বাসের সেই চরম মূল্যের টাকা তারা নিল অত্যন্ত চতুরতার সাথে। টাকার একটি অংশ নগরীর শান্তিধাম মোড় থেকে বুঝে নিলেন অনুপের ভাই উত্তম কুমার দাশ, আর বাকি অংশ দৌলতপুর বাসস্ট্যান্ডে বসে স্বয়ং অনুপ কুমার দাশ নিজের হাতে আমার কাছ থেকে গ্রহণ করলেন।
নড়াইলের মায়া এবং মুক্তির অনন্ত প্রতীক্ষা: দেখতে দেখতে লোহার খাঁচায় কেটে গেল দীর্ঘ ৪ মাস ১৪টি দিন-১৩৪টি রক্তক্ষরণ ও বিনিদ্র রাত! এই দীর্ঘ সময়ে প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত আমি চাতক পাখির মতো পথ চেয়ে বসে থাকতাম। প্রতিদিন সকালে যখন নতুন সূর্য উঠত, আমি হররোজ অধীর অপেক্ষায় থাকতাম—আজ কি খুলনা থেকে আমার কোনো আপনজন, আমার কোনো সহকর্মী বা পরিবারের কেউ আমার সাথে ‘সাক্ষাতে’ আসবে? জেলগেটের সেই ছোট্ট জালের ওপারে চেনা কোনো মুখ দেখার জন্য বুকটা প্রতিনিয়ত হাহাকার করত।
কারাগার মানুষকে নিঃসঙ্গ করে দেয় ঠিকই, কিন্তু একই সাথে কিছু খাঁটি মানুষের সাথেও পরিচয় করিয়ে দেয়। নড়াইল কারাগারের বন্দিজীবনে এমন অনেক মানুষের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল, যারা অপরাধের দুনিয়ার মানুষ হলেও তাদের ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক অদ্ভুত মায়া। নড়াইলের সেইসব সাধারণ মানুষ ও সহবন্দিদের ভালোবাসা আমি কোনোদিন ভুলব না।
অথচ আজ পেছনে ফিরে তাকালে বুকের ভেতরটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। যে টাকা আমি ধারকর্জ করে এনেছিলাম একটু শান্তির আশায়, আইনি হয়রানি থেকে মুক্তির আশায়—তা ছিল আসলে এক চরম প্রতারণার ফাঁদ। টাকাও গেল, কিন্তু মিথ্যা মামলার বেড়াজাল থেকে মুক্তি মিলল না। আইনের রক্ষক যখন ভক্ষক হয়ে টাকার বাণিজ্য করে, আর তথাকথিত কলম সৈনিকরা যখন পর্দার আড়ালে বসে সেই বাণিজ্যের দালালি করে, তখন আমার মতো একজন সাধারণ ও নির্দোষ মানুষের কান্নায় কেবল খোদার আরশই কাঁপে, এই সমাজের পাষাণ দেয়ালগুলো একটুও গলে না।
আজ আমি মুক্ত আকাশের নিচে, কিন্তু কারাগারের সেই কঠিন দিনগুলোতে তৈরি হওয়া মায়ার বাঁধন আজও আলগা হয়নি। আজও নড়াইলের অনেকের সাথেই আমার নিয়মিত কথা হয়, সুখ-দুঃখের খোঁজ নেওয়া হয়। ৪ মাস ১৪ দিনের সেই বন্দিত্ব আমার শরীরকে হয়তো ক্ষতবিক্ষত করেছিল, কিন্তু আমার সহকর্মীদের রাজপথের লড়াই আর সাধারণ মানুষের সেই মায়া আমাকে শিখিয়েছে—দিনশেষে সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী। (চলবে…)










































