Home আঞ্চলিক লোহার শিকের ওপারে অমানবিকতা ও পত্রিকার ওপর আঘাত

লোহার শিকের ওপারে অমানবিকতা ও পত্রিকার ওপর আঘাত

23



মিজানুর রহমান মিলটন||


কিশোর ওয়ার্ডে থিতু হওয়ার আগেই নিয়মমাফিক আমার হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো একটা সিলভারের প্লেট আর গ্লাস-যা এখন থেকে আমার নিত্যদিনের সঙ্গী| এরপর নিয়ে যাওয়া হলো কারা হাসপাতালে, তথাকথিত ‘মেডিকেল’ করার জন্য| সবচেয়ে বেশি বুকটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল যখন একটা কাঠের পাটায় (সিলেট) চক দিয়ে আমার হাজতী নম্বর লিখে সেটা বুকের সামনে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো| অপরাধী হিসেবে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে যখন ফ্ল্যাশটা জ্বলে উঠল, মনে হলো আমার এত বছরের সততা, পেশা আর আত্মসম্মানকে এক নিমেষে কেউ খণ্ড খণ্ড করে দিল|


কারাগারের সেই দিনগুলোর কথা মনে হলে আজও শিউরে উঠি: (১). সেই অখাদ্য গ্রাস আর বেঁচে থাকার লড়াই: সকাল হতেই আমাদের দেওয়া হতো রুটি আর একটুখানি গুড়| দুপুরে ভাতের সাথে আসত ‘বকম’ নামের এক অদ্ভুত সবজি, আর রাতে সামান্য একটুখানি ডাল আর এক টুকরো মাছ| কোনো সুস্থ রুচিসম্পন্ন মানুষ ওই খাবার মুখে তুলতে পারবে না| ক্ষুধার তাড়নায় পেট চুইচুই করলেও গলার ভেতর দিয়ে সেই অন্ন গলতে চাইত না| বাধ্য হয়ে কোনোমতে দুধ আর কলা জোগাড় করে দিন কাটাতে হতো আমাকে|

(২). বন্দিদের ওপর চরম দাসত্ব ও অবিচার: কারাগারে বন্দিদের মানুষ হিসেবে গণ্য করা হয় না, যেন তারা স্রেফ সস্তার শ্রমিক| চোখের সামনে দেখতাম-ড্রেন পরিষ্কার করা, মাঠের শক্ত মাটি কোপানো থেকে শুরু করে জ্যান্ত মানুষের ঘাড়ে জোয়াল তুলে দিয়ে ক্ষেতে মই দেওয়ানো হতো! এই মধ্যযুগীয় বর্বরতা আর অমানবিকতা দেখে চোখ ফেটে জল আসত, কিন্তু লোহার শিকের ওপারে কারও কাছে কোনো বিচার চাওয়ার সুযোগ ছিল না|

(৩). হাতকড়া আর ডান্ডাবেড়ির সেই চরম গ্লানি: নড়াইল, যশোর, খুলনা আর গোপালগঞ্জ জুড়ে আমার নামে একের পর এক মিথ্যা মামলা সাজিয়েছিল সিআইডি-র দুই কর্মকর্তা অনুপ কুমার দাশ এবং অলোক চন্দ্র হালদার| যখনই আদালতের হাজিরা দিতে নিয়ে যাওয়া হতো, আমার দু-হাতে পরানো হতো লোহার হাতকড়া, আর পায়ে ভারী ডান্ডাবেড়ি| ঝনঝন শব্দে যখন অপরাধীদের গাড়িতে গিয়ে উঠতাম, চারপাশের মানুষের চাউনি দেখে মনে হতো-আমি বুঝি এই দেশের সবচেয়ে বড় কোনো সন্ত্রাসী বা রাষ্ট্রদ্রোহী! এই গ্লানি যে কতটা জঘন্য, তা শুধু ভুক্তভোগীই জানে|


বাইরে যখন জ্বলছিল প্রতিহিংসার আগুন: পরের দিন কারাগারের সেই লোহার জালের ওপার থেকে যখন আমার পরিবার আর প্রিয় সহকর্মীদের মুখগুলো দেখলাম, বুকটা কান্নায় ভেঙে গেল| কিন্তু বাইরে তখন আমার বিরুদ্ধে চলছে এক চরম ˆনরাজ্য আর কোটি টাকার বাণিজ্য|


সিআইডি-র এসআই অনুপ কুমার দাশ এবং অলোক চন্দ্র হালদার আমাকে ভেতরে বন্দি করেই ক্ষান্ত হয়নি; তাদের মূল নজর ছিল আমার প্রাণের চেয়েও প্রিয় পত্রিকার ওপর| পত্রিকাটির প্রকাশনা যেন চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়, সেজন্য আমার অফিসে কর্মরত বিশ্বস্ত সহকর্মী কৌশিক, পপলু এবং শাহ আলমকে তারা প্রতিনিয়ত বিভিন্নভাবে হুমকি দিতে শুরু করে|

শাসাতে থাকে-যদি পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ না করা হয়, তবে তাদেরও এই মিথ্যা মামলায় আসামী করে জেলে পোরা হবে! “একটি পত্রিকার কণ্ঠরোধ করতে, সত্যকে আড়াল করতে এক চরম সিন্ডিকেট ˆতরি হয়েছিল বাইরে| সেই এনজিওর যাকে পাচ্ছিল, তাকেই মামলার ভয় দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য মেতে উঠেছিল তারা| আর এই অন্ধকারের নিয়মিত ভাগ চলে যেত তৎকালীন এসপি মোল্লা নজরুল ইসলামের পকেটে|”

ভেতরে আমি হাতকড়া আর ডান্ডাবেড়ির শিকল পরে ধুঁকছিলাম, আর বাইরে আমার তিল তিল করে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করার এক পৈশাচিক খেলায় মেতেছিল ক্ষমতার অপব্যবহারকারীরা| একদিকে বন্দি জীবনের তীব্র কষ্ট, অন্যদিকে সহকর্মীদের নিরাপত্তা আর পত্রিকার ভবিষ্যৎ নিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তা-সব মিলিয়ে সেই দিনগুলো ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ আর অন্ধকারতম এক অধ্যায়|-(চলবে)