খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলায় পদ্মা নদীর পুরোনো ফেরিঘাট ও বাগগাড়ী পুল এলাকায় নির্বিচারে বালু তোলা হচ্ছে। দুই জায়গায় প্রতিদিন কমপক্ষে এক হাজার ট্রাক বালু তোলা হচ্ছে। এসব বালুর দাম অন্তত ২৭ লাখ টাকা। স্থানীয় প্রশাসন জানায়, বালু তোলায় সরকারের কোনো অনুমতি নেই। আইশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানেও বালু উত্তোলন থামছে না।
এলাকার লোকজন বলছেন, কুষ্টিয়া-২ আসনে বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর অনুসারী নেতাকর্মীরা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও বালু তোলার ক্ষেত্রে এখন মিলেমিশে কাজ করছেন।
গত ২৪ মে উপজেলার পুরোনো পদ্মা নদীর ফেরিঘাট এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দা, বালু পরিবহনে নিয়োজিত ট্রাকচালক ও চা দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যে জায়গায় বালু তোলা হচ্ছে, সেটি বাহিরচর ইউনিয়নের মধ্যে পড়েছে। ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি জহুরুল ইসলাম বিজলি মালিথা বালুর অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করেন। তাঁর সঙ্গে আছেন উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব শাজাহান আলী, স্থানীয় সংরক্ষিত সংসদ সদস্যের (এমপি) ভাই নজরুল ইসলাম নজুসহ বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের অন্তত ছয় নেতা। প্রতিদিন প্রায় ৫০০ ট্রাক বালু বিক্রি করছেন তারা। ট্রাকপ্রতি বালুর জন্য নেওয়া হচ্ছে কমপক্ষে আড়াই হাজার টাকা। সে হিসাবে দিনে সাড়ে ১২ লাখ টাকার বালু বিক্রি করা হচ্ছে।
পুরোনো ফেরিঘাট এলাকায় বালু তোলার জায়গার উত্তরে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পশ্চিমে হার্ডিঞ্জ রেল ও লালন শাহ সেতু এবং দক্ষিণে ৪৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র। নদী থেকে বালু বিক্রির পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের মূল ক্যানেলের পারসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় বালু স্তূপ করে রাখা হয়েছে।
উপজেলার মোকারিমপুর ইউনিয়নের বাগগাড়ী পুল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীর প্রবেশমুখে কুঁড়েঘর। সেখানে একদল লোক। বালুর ট্রাক বের হলেই তারা টাকা আদায় করছেন। স্থানীয়রা জানান, এখানে বিএনপি-জামায়াত এক জোট হয়ে মাটি ও বালু বিক্রি করছে।
এখানে কথা হয় শহীদুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে। তিনি নেতাদের পক্ষে সবকিছু দেখভাল করেন। শহীদুল বলেন, ‘আমরা মূলত মাটি ও বালু বিক্রি করি। দিনে কিছুটা সমস্যা হলেও রাতে অসুবিধা হয় না।’ তিনি জানান, উপজেলা জামায়াতের যুগ্ম সম্পাদক তারিক আহমেদ, জামায়াতকর্মী গোলাম মোস্তফা রুবেল, নজরুল ইসলাম নজুসহ দল দুটির আরও ডজনখানেক নেতাকর্মী বালু বিক্রির টাকা নেন।
শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘এসিল্যান্ড অফিস, থানার সামনেসহ বিভিন্ন জায়গায় আমাদের লোকজন থাকে। এতে অভিযান হলে আমরা আগেভাগেই খবর পাই। দৈনিক ৫০০ ট্রাক বালু বিক্রি হয়। প্রতি ট্রাক বালুর দাম তিন হাজার টাকা। প্রতি ট্রাকে জামায়াতের গোলাম মোস্তফা রুবেল, বিএনপির শাজাহানসহ অন্যরা এক হাজার টাকা করে নেন।’
এলাকায় রুবেলের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভেড়ামারায় ‘রুবেল অটো’ নামে তাঁর একটি প্রতিষ্ঠান আছে। রুবেলের স্বজন আগে আওয়ামী লীগ ও জাসদের রাজনীতি করতেন। রুবেল রাজনীতি করতেন না। গত নির্বাচনের আগে তিনি জামায়াতে ইসলামীকে সমর্থন দেন। নির্বাচনে আব্দুল গফুর জামায়াত থেকে এমপি নির্বাচিত হন। এর পর জামায়াতের ‘ইনসাফ ট্রেডার্স’ নামে একটি ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানের নামে পদ্মায় তড়িয়া মহাল ইজারা নেওয়ার জন্য দরপত্র ক্রয় ও দাখিল করা হয়। শেষ পর্যন্ত তারা ইজারা পাননি।
জানতে চাইলে গোলাম মোস্তফা রুবেল বলেন, ‘আমরা ব্যবসা করার জন্য এমপির পরমার্শ নিয়ে ফার্ম করেছি। বিএনপি-জামায়াতের নেতারা আছে আমাদের সঙ্গে। তড়িয়া মহল নিয়ে ঝামেলা চলায় আমরা বাগগাড়ী থেকে মাটি ও বালু বিক্রি করছি।’
উপজেলা জামায়াতের যুগ্ম সম্পাদক তারিক আহমেদ বলেন, ‘রুবেলের সঙ্গে আমার ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে।’ তিনি দাবি করেন, তড়িয়া মহল ইজারা নেওয়া হয়েছে।
বিএনপির সাবেক এমপি শহীদুল ইসলাম সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে অবৈধ বালু ও মাটি উত্তোলনের সঙ্গে জামায়াত-বিএনপির নেতাকর্মীরা জড়িত বলে অভিযোগ করেন।
জানতে চাইলে জহুরুল ইসলাম বিজলি মালিথা বলেন, ‘সামনে আমি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন করব। এ কারণে আমার প্রতিপক্ষরা এসব প্রচার চালাচ্ছে।’
উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব শাজাহান আলী বলেন, ‘ভেড়ামারায় একাধিক জায়গায় অবৈধভাবে মাটি ও বালু বিক্রি হচ্ছে। জামায়াত-বিএনপির অনেকেই জড়িত।’
উপজেলা জামায়াতের নেতা জসিম উদ্দিন বলেন, ‘অবৈধ মাটি ও বালু উত্তোলনের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।’ রুবেলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি জামায়াতের কোনো পদে নেই। তবে দলের সমর্থক।
জামায়াতের এমপি আব্দুল গফুর বলেন, ‘তারা ব্যবসা করবে এমনটি আমাকে জানিয়েছিল। তবে আমি বলেছি, বৈধ ব্যবসার বাইরে কোনো অবৈধ ব্যবসা হলে আমার কোনো সহযোগিতা ও সমর্থন থাকবে না। মাটি ও বালু উত্তোলনের বিষয়ে জানার পর প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে বলেছি।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমিরুল আরাফাত বলেন, ‘অবৈধ বালু ও মাটি উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি।’
কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, ‘পদ্মায় আমাদের কোনো বালুমহাল নেই। যারা মাটি ও বালু বিক্রি করছেন, তারা অবৈধভাবে করছেন। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’









































