Home Lead মাদকের গ্রাস ও আধিপত্যের লড়াইয়ে কাঁপছে খুলনা: পাঁচ মাসে ৩৫ খুন

মাদকের গ্রাস ও আধিপত্যের লড়াইয়ে কাঁপছে খুলনা: পাঁচ মাসে ৩৫ খুন

46


সৈয়দ হুমায়ুন কবীর রানা:


২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একসময় কেবল সন্ধ্যা নামলেই খুলনাঞ্চলে ˆতরি হতো খুনের আতঙ্ক| কিন্তু ২০২৬ সালের বিগত পাঁচ মাসের চিত্র আরও ভয়াবহ| এখন আর রাতের অন্ধকার নয়, ভরা দিবালোকেও প্রকাশ্য রাস্তায় গুলি ও কুপিয়ে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে শিল্পনগরী খুলনায়| গত পাঁচ মাসে খুলনা জেলা ও মহানগরী জুড়ে অন্তত ৩৫ জনকে গুলি করে এবং কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে| এর মধ্যে খুলনা মেট্রোপলিটন (কেএমপি) এলাকায় ১৫ জন এবং জেলা পুলিশের আওতাধীন বিভিন্ন উপজেলায় ২০ জন খুনের শিকার হয়েছেন


অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের পেছনেই মাদক কারবার, চাঁদাবাজি এবং এলাকাভিত্তিক রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের সংযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে| বিশেষ করে সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে কেবল খুলনা নগরীতেই ১০টি খুনের ঘটনা ঘটেছে| প্রায় প্রতি রাতেই জেলার কোথাও না কোথাও সন্ত্রাসী হামলা, অঙ্গচ্ছেদ বা গোলাগুলির খবর আসছে| এই পরিস্থিতিতে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও শঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন খুলনাবাসী|


প্রকাশ্য দিবালোকে খুনের মিশন; টার্গেট যখন রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী: পুলিশ ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা যায়, খুলনায় সম্প্রতি যে কয়েকটি বড় হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তার প্রতিটিতেই খুনিরা মোটরসাইকেলে এসে সুনির্দিষ্ট টার্গেট নিশ্চিত করে মুহূর্তের মধ্যে নির্বিঘ্নে পালিয়ে গেছে| ঢাকাইয়া রফিক হত্যাকাণ্ড: সর্বশেষ খুলনা মহানগরীর লবণচরা থানার বটিয়াঘাটার কাজিপাড়া মাথাভাঙা এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে দুপুর সাড়ে ১২টায় খুন হন বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম রফিক ওরফে ঢাকাইয়া রফিক| হেলমেট পরিহিত তিন অস্ত্রধারী দুর্বৃত্ত মোটরসাইকেলে এসে তাঁকে লক্ষ্য করে পেটে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে চলে যায়| যুবদল নেতা রাশু খুন: এর কিছুদিন আগে দৌলতপুর থানার কেডিএ মার্কেটে নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঢ়ুকে থানা যুবদল নেতা রাশিদুল ইসলাম রাশুকে ৪-৫ জনের একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী উপুর্যুপরি ৩-৪টি গুলি করে হত্যা করে| তাতীঁদল নেতা সোনা মিয়া ও শ্রমিকদল নেতা মাসুম বিল্লাহ হত্যা: খালিশপুর থানার নয়াবাটি এলাকায় কুপিয়ে খুন করা হয় তাতীঁদলের ওয়ার্ড সভাপতি ও মুদি দোকানদার সোনা মিয়াকে| এর আগে রোজার শেষ দিকে ঈদের মাত্র কয়েকদিন আগে ডাকবাংলা এলাকায় রূপসা উপজেলা শ্রমিকদল নেতা মাসুম বিল্লাহকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করে চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা| সাবেক যুবদল নেতা মাহবুব খুন: দৌলতপুরের সাবেক যুবদল নেতা মাহবুবুর রহমান মাহবুবকে তাঁর নিজ বাড়ির সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে ও গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়|


খুলনার বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের ধারাবাহিক এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে| নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক নেতা জানান, অধিকাংশ ঘটনারই সঠিক তদন্ত ও মূল অপরাধীদের বিচার না হওয়ায় তাঁরা চরম উদ্বিগ্ন|


খুবি ছাত্র হত্যা ও এক রাতে একাধিক রক্তক্ষয়ী হামলা: সন্ত্রাসীদের এই তাণ্ডবের শিকার হয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরাও| সম্প্রতি দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন খুলনা বিশ^বিদ্যালয়ের (খুবি) মেধাবী শিক্ষার্থী অর্ণব কুমার সরকার| এই হত্যাকাণ্ডের মাত্র ৯ ঘণ্টা আগে এক কৃষকদল নেতার দুই চোখ উপড়ে ফেলার চেষ্টা করে সন্ত্রাসীরা| একই রাতে নগরীর পৃথক তিনটি স্থানে রক্তক্ষয়ী হামলা চালানো হয়|

২১ ন¤^র ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক সহ-সভাপতি মানিক হাওলাদারকে খুন করা হয় এবং বয়রা শ্মশানঘাট এলাকায় সজীব শিকদার নামের এক যুবককে কুপিয়ে জখম করা হয়| সন্ত্রাসীদের বর্বরতা এতটাই রূপ নিয়েছে যে, হামলায় একজনের আঙুল এবং অন্য একজনের কবজি কেটে নিয়ে যাওয়া হয়| এছাড়া ২৭ ন¤^র ওয়ার্ড ¯ে^চ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহীনকে লক্ষ্য করে গুলি চালালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়|


অপরাধের নেপথ্যে ৩ কারণ: কী বলছে পুলিশ? হত্যাকাণ্ডগুলোর রহস্য উদঘাটন নিয়ে কেএমপির মিডিয়া সেলের সহকারী কমিশনার মো: আব্দুর রাজ্জাক জানান, পুলিশ মূলত তিনটি সম্ভাব্য কারণকে সামনে রেখে তদন্ত করছে—মাদক বেচাকেনা ও এর ভাগবাটোয়ারা, স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার এবং দলীয় কোন্দল| কেএমপির এডিশনাল পুলিশ কমিশনার রাশিদুল ইসলাম জানান, নগরীতে মূলত ৪-৫টি সন্ত্রাসী গ্রুপ এই কিলিং মিশনে সক্রিয় রয়েছে| তাদের অনেক সদস্যকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠানো হলেও তারা কিছুদিন পর জামিনে বের হয়ে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে|


অন্যদিকে, খুলনা জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার আবির হোসেন শুভ জানান, জেলার উপজেলাগুলোতে সংঘটিত অধিকাংশ খুনের নেপথ্যে স্থানীয় ও পারিবারিক দ্বন্দ্ব, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ এবং আধিপত্য বিস্তার কাজ করেছে|


পুলিশ এই পাঁচ মাসে মহানগরী থেকে দেশী-বিদেশী প্রায় ১৫টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে এবং সন্দেহভাজন প্রায় ৩০ জনকে গ্রেফতার করেছে| তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ের দু-একজন ধরা পড়লেও হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা ও অর্থদাতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে|


মেট্রোপলিটন ও জেলার খুনের খতিয়ান: খুলনা মহানগরীর সদর থানায় ৩টি, লবণচরা থানায় ৩টি, দৌলতপুর থানায় ৩টি, খালিশপুর থানায় ২টি, সোনাডাঙ্গা থানায় ১টি, হরিণটানা থানায় ১টি, খানজাহান আলী থানায় ১টি ও আড়ংঘাটা থানায় ১টিসহ মহানগরীতে মোট ১৫টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে| অন্যদিকে, খুলনা জেলার রূপসা থানায় ৭টি, দিঘলিয়া থানায় ৩টি, কয়রা থানায় ৩টি, তেরখাদা থানায় ২টি, ডুমুরিয়া থানায় ২টি, পাইকগাছা থানায় ২টি, ফুলতলা থানায় ১টি ও বটিয়াঘাটা থানায় ১টিসহ জেলায় মোট ২০টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে|


কেএমপির তথ্য: ১৫টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ৮টি গুলি করে, ৪টি পারিবারিক কলহে এবং ৩টি আধিপত্যের জেরে কুপিয়ে করা হয়েছে| এর মধ্যে ১৩টি মামলার রহস্য উদঘাটিত হয়েছে| ১২টি মামলা কেএমপি পুলিশ, ১টি পিবিআই এবং ১টি নৌ-পুলিশ তদন্ত করছে| জেলা পুলিশের তথ্য: ২০টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ৬টি কুপিয়ে, ৩টি গুলি করে, ২টি শ^াসরোধে, ৪টি পারিবারিক কলহে, ২টি আধিপত্য বিস্তারে এবং ১টি মাদককাণ্ডে ঘটেছে| এর মধ্যে ১৫টির রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে এবং ১৬টি জেলা পুলিশ, ১টি সিআইডি ও ৩টি মামলা পিবিআই তদন্ত করছে|


“খুলনা এখন মাদকে ভাসছে”: গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের মনোবল ভেঙে পড়ার সুযোগে পুরনো সন্ত্রাসী এবং কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হওয়া মাদক কারবারিরা এলাকায় ফিরে এসে নতুন করে সংঘাতে জড়াচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা| তাছাড়া বেশিরভাগ থানায় নতুন পুলিশ কর্মকর্তা যোগদান করায় স্থানীয় অপরাধীদের চিনে নিতে কিছুটা সময় লাগছে|


খুলনার নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব বাবুল হাওলাদার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ কাজে লাগিয়ে সন্ত্রাসীরা অস্ত্রের মহড়া দিচ্ছে| খুলনার ৮টি থানা এলাকায় মাদকের চরম বিস্তার ঘটেছে| এক কথায় খুলনা এখন মাদকে ভাসছে| মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় সর্বস্তরের মানুষ চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে| আমরা দ্রুত এ থেকে পরিত্রাণ চাই|”


দমনে বিশেষ তৎপরতা ও পুরস্কার ঘোষণা: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কেএমপি কমিশনার জাহিদুর রহমান বলেন,”গত ২০২৫ সালে নগরীতে ৩৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল| আর চলতি বছরের পাঁচ মাসে ১৫টি খুনের বেশিরভাগই মাদক ও আধিপত্যের জেরে| পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমরা ১২ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা ˆতরি করে তাদের গ্রেফতারের জন্য বিশেষ পুরস্কার ঘোষণা করেছি, যার মধ্যে চারজনকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে| বাকিদের ধরতেও একাধিক সংস্থা কাজ করছে|”


খুলনা জেলা পুলিশ সুপার তাজুল ইসলাম জানান, জেলার ২০টি হত্যাকাণ্ডের অধিকাংশই তাঁর যোগদানের পূর্বের ঘটনা| তবে এর বেশির ভাগেরই রহস্য উন্মোচন করা হয়েছে এবং আসামীদের গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে| বাকি আসামীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ তৎপর রয়েছে|