খুলনাঞ্চল রিপোর্ট
মুষলধারে বৃষ্টি আর বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে দিনভর ঠাসা কর্মসূচিতে কঙ্বাজার সফর করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরকালে তিনি তাঁর পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক ‘পাতলী খাল’ পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করেন, চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের বীর শহীদ মোহাম্মদ ওয়াসিমের কবর জিয়ারত করে তাঁর মায়ের হাতে ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র তুলে দেন এবং সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে সাথে নিয়ে দেশের প্রথম সাফারি পার্ক পরিদর্শন করেন। শনিবার (১৩ জুন) সকালে বিমানযোগে কঙ্বাজার পৌঁছানোর পর থেকে দুপুর পর্যন্ত এই ঐতিহাসিক সফরকে কেন্দ্র করে পুরো কঙ্বাজার জুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
বাবার স্মৃতিবিজড়িত ‘পাতলী খাল’ পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন: বেলা পৌনে ১১টার দিকে কঙ্বাজার সদর উপজেলার পিএমখালী ইউনিয়নে পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঐতিহাসিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘পাতলী খাল’ পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করেন। উল্লেখ্য, প্রায় ৫০ বছর আগে ১৯৭৯ সালের নভেম্বর মাসে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজের হাতে কোদাল দিয়ে এই খাল খননকাজের সূচনা করেছিলেন।
দীর্ঘ ৪৮ বছর পর বাবার সেই স্মৃতিবিজড়িত খালের পাড়ে তীব্র বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করেই সমবেত হন হাজারো মানুষ। প্রধানমন্ত্রী বিমানবন্দর থেকে নেমে নিজেই গাড়ি চালিয়ে পিএমখালীতে আসেন এবং বৃষ্টির মধ্যেই নিজের হাতে কোদাল তুলে নিয়ে পুনঃখনন কাজের সূচনা করেন। পরে খালের পাড়ে একটি খেজুরগাছের চারা রোপণ করেন তিনি। স্থানীয় প্রকৌশলীরা জানান, এই খাল পুনঃখননের ফলে এলাকার সাড়ে ৮ হাজার কৃষক সরাসরি সেচ সুবিধা পাবেন, ১২০০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ বাড়বে এবং প্রায় ৪০ হাজার মানুষ উপকৃত হবেন।
“মদ-সিগারেটের দাম বাড়ানোর পরও বিরোধী দলের বাজেট পছন্দ নয়”: খাল খনন শেষে পিএমখালীতে আয়োজিত এক সংক্ষিপ্ত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রস্তাবিত বাজেটের সমালোচনা করায় বিরোধী দলের তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, “আপনাদের কাছে আমি প্রশ্ন রেখে যেতে চাই, যেই বাজেটে ট্যাঙ্ কমানো হয়, সেই বাজেটও বিরোধী দল মানে না। যেই বাজেটে মদের দাম বাড়ানো হয়, যেই বাজেটে সিগারেটের দাম বাড়ানো হয়, সেই বাজেটও বিরোধী দলের পছন্দ নয়। তাহলে এবার বিরোধী দলের আসল উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছেন? তাদের উদ্দেশ্য দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানো নয়, তাদের একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে দেশের মধ্যে অস্থিতিশীলতা ও অশান্তি তৈরি করা, মানুষকে বিভ্রান্ত করা।”
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, “চাল, ডাল, তেল, নুনসহ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে বর্তমান সরকার দুই দিন আগের বাজেটে ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর থেকে ট্যাঙ্ তুলে নিয়েছে। অন্যদিকে, দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে এবং সন্তানদের কর্মসংস্থান বাড়াতে বিদেশি পণ্যের ওপর ট্যাঙ্ বাড়ানো হয়েছে। বিএনপির সকল ক্ষমতার উৎস হচ্ছে জনগণ এবং আমরা মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে চাই।”
কৃষকদের কল্যাণে সরকার আগামী এক বছরের মধ্যে প্রতি উপজেলায় ৮ থেকে ১০ হাজার কৃষকের কাছে ‘কৃষক কার্ড’ পৌঁছে দেবে এবং আগামী ৫ বছরে দেশব্যাপী ২৩ হাজার খাল খনন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
শহীদ ওয়াসিমের কবর জিয়ারত ও মায়ের হাতে ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র: পিএমখালীর কর্মসূচি শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরাসরি ছুটে যান কঙ্বাজারের পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ মেহেরনামা গ্রামের মোরারপাড়া কবরস্থানে। সেখানে তিনি ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের বীর শহীদ ও চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মোহাম্মদ ওয়াসিমের কবর জিয়ারত করেন। তিনি মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করেন। কবর জিয়ারত শেষে প্রধানমন্ত্রী শহীদ ওয়াসিমের ধাত্রী জননী ও পরিবারের সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তিনি ওয়াসিমের বাবা-মায়ের খোঁজখবর নেন এবং গভীর সমবেদনা জানান। পরে প্রধানমন্ত্রী নিজ হাতে শহীদ ওয়াসিমের মা জোসনা বেগমের হাতে ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র অনুদান হিসেবে তুলে দেন। এ সময় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
ডা. জুবাইদা রহমানকে সাথে নিয়ে ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক পরিদর্শন: দুপুরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে সাথে নিয়ে চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক পরিদর্শনে যান। পিএমখালী থেকে চকরিয়া যাওয়ার পথে প্রধানমন্ত্রী নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করেন এবং তাঁর পাশের আসনে বসান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে। পুরো রাস্তাজুড়ে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ও দলীয় নেতা-কর্মী ফুল ছিটিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। দেশের প্রথম এই সাফারি পার্কে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সহধর্মিণীকে স্বাগত জানান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু এবং প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। প্রধানমন্ত্রী ও ডা. জুবাইদা রহমান বন্য প্রাণীর এই উন্মুক্ত উদ্যানের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন এবং পার্কের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। পরিদর্শন শেষে পার্কের মূল ফটকের সামনে একটি ‘নাগলিঙ্গম’ গাছের চারা রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী এবং উভয়েই সাফারি পার্কের স্মারক বইয়ে স্বাক্ষর করেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই গুরুত্বপূর্ণ সফরকালে তাঁর সাথে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কঙ্বাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, স্থানীয় সরকার ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শরীফুল আলম, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামছুল ইসলাম, কঙ্বাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল ও চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমানসহ সরকারের উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ। জনসভায় সভাপতিত্ব করেন কঙ্বাজার সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল মাবুদ।









































