ঢাকা অফিস।।
আগামী অর্থবছরের বাজেটকে লক্ষ্যহীন এবং ঋণনির্ভর আখ্যা দিয়ে জামায়াতে ইসলামী প্রশ্ন তুলেছে, বিশাল বাস্তবায়নে সরকার আয়ের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, সেই টাকা কোথা থেকে আসবে? দলটির অভিযোগ, সরকার করজাল ও ভ্যাটে আওতা বিস্তৃত করে সাধারণ মানুষের ওপর বোঝা চাপাচ্ছে। এতে মূল্যস্ফীতিতে পড়বে জনগণ।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর মগবাজারে দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে সেক্রেটারি মিয়া গোলাম পরওয়ার জামায়াতের এসব বক্তব্য তুলে ধরে বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট ঋণনির্ভর, উচ্চাভিলাষী, বাস্তবায়ন অযোগ্য ও লুটপাটের।
চলতি অর্থবছরে বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা, যা পরে কমিয়ে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে তা পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এই তথ্য তুলে গোলাম পরওয়ার বলেন, আগামী অর্থবছরে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার আয়ের কথা বলা হয়েছে, তা কীভাবে আদায় হবে তা স্পষ্ট করা হয়নি বাজেটে। আয়ের যেসব উৎস দেখানো হচ্ছে, তা বাস্তবায়নে কর কাঠামোর সংস্কার, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন প্রয়োজন–সেগুলোর উল্লেখ নেই।
সংসদে প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়নে প্রধান তিন বাধা রয়েছে দাবি করে গোলাম পরওয়ার বলেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম ক্রমাগত বৃদ্ধিতে
উৎপাদন খরচ বেড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। সরকার মূল্যস্ফীতি ১০ থেকে কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও বাস্তবে তা আরও বৃদ্ধি পাবে। আন্তর্জাতিক ও ভূরাজনৈতিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার নেতিবাচক প্রভাব বাজেটকে আরও ঝুঁকিতে ফেলবে।
ৎসংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, এই বাজেটে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা হয়নি। গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার ভ্যাটের বিস্তৃতি করতে চাইছে, তাতে করের বোঝা মূলত সাধারণ নাগরিকদের ওপর চাপানো হয়েছে। অন্যদিকে ধনীদের জন্য বিশেষ সুবিধা তৈরি করা হয়েছে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, বাজেটের প্রায় ৭০ শতাংশ সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধেই চলে যাবে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো প্রচণ্ডভাবে উপেক্ষিত হয়েছে।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) খাতে ৩ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দের সমালোচনা করেছে জামায়াত। গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করে বলেন, সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ছাড়া তা করা হয়েছে, যা কেবল দুর্নীতি ও সরকারি দলের নেতাকর্মীদের লুটপাটের নতুন সুযোগ তৈরি করবে। মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, ঘাটতি মেটাতে সরকারকে ব্যাংক থেকে আরও বেশি ঋণ নিতে হবে। তাতে বেসরকারি খাত ঋণ পাবে না। ফলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমবে।
জামায়াতের ছায়া বাজেটের সঙ্গে প্রস্তাবি বাজেটের তুলনামূলক আলোচনা তুলে ধরে সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার বলেন, কর প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র কাঠামো নিয়ে কার্যকর সংস্কারের প্রতিফলন বাজেটে দেখা যায়নি। দুর্নীতি, অপচয় এবং লুটপাটের ঝুঁকি বাড়বে।
প্রস্তাবিত বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হয়েছে। একে উচ্চাভিলাষী বলে আখ্যা দিয়ে জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল বলেছেন, আইএমএফ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাস আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ৫ শতাংশের নিচে থাকতে পারে। সরকার কীভাবে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে তা বোধগম্য নয় এবং বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
অতীত স্মরণ করিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকারও অতিমাত্রায় ঋণনির্ভর উচ্চাভিলাষী বাজেট দিত। এতে দেশীয় উৎস, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণের ফলে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে, যা এখন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে বড় বাধা।
প্রস্তাবিত বাজেটের সমালোচনা করে গোলাম পরওয়ার বলেন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিল্প খাতের বিভিন্ন কাঁচামালের ওপর ব্যয় ও কর বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে শিল্প উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাঁচামালের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি রপ্তানি খাতকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। এই গণবিরোধী বাজেটের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, আশা করি, সরকার বাজেট সংশোধন করবে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে যে নৈরাজ্য ও অনিয়মের লক্ষণ ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে, তা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা কাঠামো পরিবর্তনের যে প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যাদের শেয়ার অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তাদের
শেয়ার যে মূল্যে নেওয়া হয়েছে, সেই মূল্যে ফেরত দেওয়া হোক। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধ করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, আবদুল হালিম, নির্বাহী পরিষদ সদস্য ড. রেজাউল করিম প্রমুখ।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণার পর এটিকে ‘গণবিরোধী ও লুটপাটের’ আখ্যা দিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করে জামায়াতে ইসলামী। এদিন সন্ধ্যায় বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সমাবেশ করেন জামায়াত নেতারা। অন্যদিকে একে ইতিহাসের বৃহৎ ঘাটতি বাজেট হিসেবে অভিহিত করেন জামায়াতের জোট সঙ্গী জাতীয়
নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছায়া বাজেট কমিটির প্রধান ড. আতিক মুজাহিদ। তিনি প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘উচ্চাভিলাষী ও বাস্তবতাবিবর্জিত’ বলে আখ্যা দেন।









































