Home খেলাধুলা অবিশ্বাস্য- নাটকীয় ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার ১ উইকেটের জয়

অবিশ্বাস্য- নাটকীয় ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার ১ উইকেটের জয়

1

স্পোর্টস ডেস্ক।।

কুপার কনোলির ব্যাটে তখন ঝড় বইছে। ৪৫তম ওভারে তাসকিন আহমেদের ওপর চড়াও হয়ে টানা তিন ছক্কা হাঁকান এই অস্ট্রেলিয়ান ওপেনার।

ওই ওভার থেকেই আসে ২১ রান। তাতেই ম্যাচটা অস্ট্রেলিয়ার মুঠোয় চলে যায়। শেষ ৫ ওভারে তাদের প্রয়োজন ছিল মাত্র ৯ রান। মাত্র ৯ রান তুলতে গিয়ে ৪ উইকেট হারিয়ে বসে অস্ট্রেলিয়া। শেষ ৫ ওভারে জমিয়ে তোলা ম্যাচ বাংলাদেশ হেরে যায় ১ উইকেটে। ৪৫তম ওভারে জয়ের সমীকরণ সহজ হয়ে গেলেও অস্ট্রেলিয়াকে শেষ পর্যন্ত স্বস্তিতে জিততে দেয়নি বাংলাদেশের বোলাররা।

শরিফুল ইসলামের আগুনঝরা স্পেলে হঠাৎ করেই ম্যাচে ফিরে আসে স্বাগতিকরা। একের পর এক উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় অজিরা। তাসকিন ম্যাচটা সহজ করে দিলেও শরিফুল ও মোস্তাফিজুর রহমান লড়াই নিয়ে যান একেবারে শেষ ওভার পর্যন্ত।

বাংলাদেশের সামনে তখন একটাই আশা দেওয়াল হয়ে দাঁড়ানো কনোলিকে ফিরিয়ে দেওয়া। সেই কাজটিই করেন মোস্তাফিজ। ১৪৯ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলে সাজঘরে ফেরেন অস্ট্রেলিয়ার এই ওপেনার। ঘণ্টায় ১১১.৩ কিলোমিটার গতির বলটি অফ স্টাম্পের অনেক বাইরে ফেলেছিলেন তিনি। প্রচণ্ড গরম ও দীর্ঘ ইনিংসের ক্লান্তিতে কাবু কনোলি ক্রিজের ভেতরে দাঁড়িয়ে কভারের ওপর দিয়ে শট খেলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বল ব্যাটের ভেতরের কানায় লেগে সরাসরি আঘাত হানে স্টাম্পে। সঙ্গে সঙ্গে উড়ে যায় বেলস।

তার বিদায়ে ম্যাচে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশের জন্য ম্যাচ জেতার ক্ষীণ আশাটাও তখন জ্বলজ্বল করে ওঠে। কিন্তু শরিফুলের ওভারের কোটা আগেই শেষ। আসতে হয় তাসকিনকেই। তিনি এসে প্রথম দুটি বল দারুণভাবেই শেষ করেন। কিন্তু ক্লোজ ফিল্ডিংয়ের সুযোগ নিয়ে মাত্র ৪ রানের লক্ষ্যটা ছুঁয়ে ফেলে অস্ট্রেলিয়া। শেষ ৫ ওভারে দারুণ লড়াই করেও হার এড়াতে পারেনি বাংলাদেশ। তবে ম্যাচের শেষ কয়েক ওভারের রোমাঞ্চ উপভোগ করেছেন মিরপুরে উপস্থিত দর্শকরা। আর অস্ট্রেলিয়া পেয়েছে সিরিজের সান্ত্বনার জয়।

আগের দুই ম্যাচের তুলনায় আজকের উইকেটে ব্যাটিং কিছুটা সহজ ছিল। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশের ২৭৪ রানের সংগ্রহটা হয়তো ২০-২৫ রান কমই ছিল। সেই সুযোগটা পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। সঙ্গে বাংলাদেশের কিছু আলগা বোলিং ও কয়েকটি মিস ফিল্ডিংও ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। তবে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ হিসেবে একাই লড়াই করে গেছেন কনোলি। অস্ট্রেলিয়ার এই ব্যাটারকে ভবিষ্যতের তারকা হিসেবে ভাবা হয়। অজি তারকা শন মার্শের ব্যাটিংয়ের কার্বন কপি হিসেবেও ধরা হয় কনোলিকে।

তবে হুট করেই তিনি জাতীয় দলে চলে এসেছেন, তা নয়। ২০২০ সালে অস্ট্রেলিয়া অনূর্ধ্ব-১৯ দলের অংশ ছিলেন তিনি। সেখান থেকে ঘরোয়া ক্রিকেট, বিগ ব্যাশের মঞ্চ পেরিয়ে কনোলি এখন অজিদের মূল দলে। অস্ট্রেলিয়ার টিম ম্যানেজমেন্ট একটা জুয়া খেলেছে বটে। তবে এই জুয়ার ফলাফল এত দ্রুত ধরা দেবে, হয়তো কেউই ভাবেননি। নিজের ১২তম ওয়ানডে খেলতে নেমেই পেলেন সেঞ্চুরির দেখা। শুধু সেঞ্চুরিই নয়, অস্ট্রেলিয়ার করা ২৭৭ রানের মধ্যে কনোলি একাই করেছেন ১৪৯ রান। ১৩৪ বলে ১৩ চার ও ৬ ছক্কায় নিজের ইনিংসটি সাজান ২২ বছর বয়সী এই তরুণ ব্যাটিং অলরাউন্ডার।

সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে নাহিদ রানাকে বিশ্রাম দেওয়া হয়। তার বদলে একাদশে সুযোগ পান শরিফুল ইসলাম। গত কিছুদিন ধরে নাহিদের বিকল্প হিসেবেই খেলছেন বাঁহাতি এই পেসার। নিজের প্রথম ওভারেই জশ ইংলিসকে ফিরিয়ে দারুণ শুরু করেন। এরপর একে একে তুলে নেন আরও ৫ উইকেট। নিজের শেষ স্পেলে তো ছিলেন ভয়ঙ্কর। ৪৬তম ওভারে মাত্র ১ রান খরচায় ২ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশকে জয়ের স্বপ্ন দেখানোর পাশাপাশি প্রথমবারের মতো ওয়ানডেতে ৫ উইকেট শিকারের কীর্তি গড়েন। পরের ওভারে তুলে নেন আরও একটি উইকেট।

বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৭ উইকেট নেওয়ার কৃতিত্বটাও নিজের করে নিতে পারতেন তিনি, যদি না তানজিদ হাসান তামিম একটি সহজ ক্যাচ ছেড়ে দিতেন। শেষ পর্যন্ত মাশরাফি বিন মুর্তজা, রিশাদ হোসেন, রুবেল হোসেন ও মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে যৌথভাবে ৬ উইকেট নেওয়ার কীর্তিতে নাম লেখান শরিফুল। ১০ ওভারে ৪৮ রান খরচ করেন তিনি।

এদিন অন্য বোলারদের মধ্যে কিছুটা এলোমেলো ছিলেন তাসকিন আহমেদ। ৭.৩ ওভার বল করে ৫৯ রান খরচায় তার শিকার ১ উইকেট। এছাড়া মোস্তাফিজুর রহমান ও শেখ মেহেদী হাসান একটি করে উইকেট শিকার করেন।

রোববার (১৪ জুন) মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেতে টস জিতে আগে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। বাংলাদেশের শুরুটা ছিল হতাশাজনক। ইনিংসের মাত্র চতুর্থ বলেই সাজঘরের পথ ধরেন সৌম্য সরকার। হাভিয়ের বার্টলেটের বলে বোল্ড হওয়ার আগে ৪ বলে করেন মাত্র ২ রান। এরপর নাজমুল হোসেন শান্ত ও তানজিদ হাসান তামিম কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুললেও বড় ইনিংস খেলতে পারেননি কেউই।

দ্বিতীয় উইকেটে দুজন মিলে ৫১ রান যোগ করেন। শান্ত ৫০ বলে ২৪ রান করে আউট হন ম্যাট রেনশোর বলে। কিছুক্ষণ পর একই বোলারের শিকার হন তামিমও। তার ব্যাট থেকে আসে ২০ বলে ১৯ রান। ৬১ রানে তৃতীয় উইকেট হারিয়ে তখন বিপাকে বাংলাদেশ।

এমন পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল ব্যাটিং করেন হৃদয় ও লিটন। দুজন মিলে চতুর্থ উইকেটে ৯২ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে ইনিংসকে শক্তিশালী করেন। ব্যক্তিগত ৪৮ রানে পৌঁছে পায়ে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন লিটন। এরপর ক্রিজে এসে হৃদয়ের সঙ্গে আরেকটি দারুণ জুটি গড়েন মোসাদ্দেক হোসেন।

পঞ্চম উইকেটে হৃদয় ও মোসাদ্দেকের ব্যাটে যোগ হয় ৯৩ রান। এই জুটির ওপর ভর করেই বড় সংগ্রহের ভিত্তি পায় বাংলাদেশ। ব্যক্তিগত সেঞ্চুরির সম্ভাবনা জাগিয়েও শেষ পর্যন্ত তা পূরণ করতে পারেননি হৃদয়। বেন দারউইশের বলে অ্যালেক্স ক্যারির হাতে ক্যাচ দেওয়ার আগে ৮৮ বলে ৮টি চার মেরে ৮৩ রানের চমৎকার ইনিংস খেলেন তিনি।

হৃদয়ের বিদায়ের পর শেখ মাহেদী হাসান বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। মাত্র ৩ রান করে ফেরেন তিনি। ইনিংসের ৪৯তম ওভারে শেখ মেহেদী হাসান আউট হওয়ার পর আবার ব্যাটিংয়ে ফেরার সুযোগ পান লিটন। বেন ডোয়ারশুইসের বলে দুই রান নিয়ে অবশেষে মিরপুরে নিজের প্রথম ওয়ানডে হাফ সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ৭৮ বলে ৪ চার ও ২ ছক্কায় ৫৮ রানে অপরাজিত থাকেন লিটন।

২০১৫ সালের ১৮ জুন ভারতের বিপক্ষে মিরপুরেই ওয়ানডে অভিষেক হয়েছিল লিটনের। প্রায় এক যুগের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ওয়ানডেতে একাধিক সেঞ্চুরি ও হাফ সেঞ্চুরি করলেও মিরপুরে কখনোই পঞ্চাশের দেখা পাননি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ইনিংসটি খেলে অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটালেন তিনি। এছাড়া ৫১ বলে ৫টি চার ও একটি ছক্কায় ৫৬ রান করে অপরাজিত থাকেন মোসাদ্দেক। তিন ব্যাটারের ফিফটি এবং হৃদয়ের অনবদ্য ইনিংসের সুবাদে বাংলাদেশ ২৭৪ রানের লড়াকু সংগ্রহ করে।