Home আঞ্চলিক সত্যের বলিদান: এক ষড়যন্ত্রের নেপথ্য কাহিনী

সত্যের বলিদান: এক ষড়যন্ত্রের নেপথ্য কাহিনী

68


মিজানুর রহমান মিলটন।


প্রিয় পাঠক, আজ যে সত্য আপনাদের সামনে উন্মোচন করতে যাচ্ছি, তা শুনলে আপনাদের শরীরের লোম খাড়া হয়ে যাবে। আইনের সেবক আর সমাজের দর্পণ বলে পরিচিত কিছু মানুষের ভেতরের কুৎসিত চেহারাটা কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে, তা আমি নিজের জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছি। অনেকেই হয়তো ভেবেছেন, আমি সত্যিই কোনো অপরাধের সাথে যুক্ত ছিলাম। কিন্তু না! কেন আমি আসামী হলাম, কেন আমাকে এই নরককুণ্ডে টেনে আনা হলোÑতার পেছনের মূল রহস্যটা উন্মোচিত হয়েছিল নড়াইল কারাগারের সেই চার দেওয়ালের ভেতরেই।


সেখানেই আমার সাথে দেখা হয়েছিল ওই এনজিওর চেয়ারম্যান খবিরুজ্জামান ও নির্বাহী পরিচালক সরোয়ার হোসাইনের। তাদের মুখ থেকে যখন আমি আসল কাহিনী শুনলাম, তখন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। ক্ষমতার লোভ আর প্রতিহিংসা মানুষকে কতটা নিচে নামাতে পারে, এটা তার এক জীবন্ত দলিল।


কারাগারের অন্ধকার কক্ষে বোনা ষড়যন্ত্রের জাল: ঘটনাটি ২০১৯ সালের। সাধারণ মানুষের টাকা তছরুপের অভিযোগে খবিরুজ্জামান ও সরোয়ার হোসাইন যখন খুলনা জেলা কারাগারে বন্দি হন, তখন তাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিতে এগিয়ে আসে একদল লোলুপ মানুষ। তৎকালীন খুলনা প্রেসক্লাবের সভাপতির নেতৃত্বে ৬ সদস্যের একটি সাংবাদিক প্রতিনিধি দল খুলনা জেলা কারাগারে তাদের সাথে দেখা করতে যান। তৎকালীন জেলার জান্নাতুল ফরহাদের কক্ষে বসেই মূলত আমাকে জীবন্ত কবর দেওয়ার এই নীল নকশা আঁকা হয়েছিল।


জেলারের সেই কক্ষেই খবির ও সরোয়ারের সামনে এক চরম অন্যায় প্রস্তাব রাখা হয়। তৎকালীন প্রেসক্লাবের ওই প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দ দাবি করেন, খুলনা নতুন জেলখানার পাশে থাকা এনজিওর মূল্যবান ঘেরটি তাদের নামে লিখে দিতে হবে। আর তা করলেই নাকি তারা খবির ও সরোয়ারকে কারামুক্ত করার ব্যবস্থা করে দেবেন!


তখন নিরুপায় খবির ও সরোয়ার প্রশ্ন করেছিলেন, “আমরা যদি ঘের লিখে দিই, তাহলে সাধারণ জনগণের আমানতের টাকা কীভাবে পরিশোধ করব?”
তখন সেই তথাকথিত সাংবাদিক নেতারা (যাদের নাম আমি আগামীতে প্রকাশ করব) অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় কুৎসিত এক বুদ্ধি বাতলে দেন। তারা বলেন, জিরোপয়েন্টের বিল্ডিংটি বিক্রি করে জনগণের টাকা শোধ করা হবে। কিন্তু সমস্যা বাঁধল অন্য জায়গায়। খবির ও সরোয়ার জানালেন, সেই বিল্ডিংয়ের দ্বিতীয় তলার ১৪৪০ স্কয়ার ফিট তো অলরেডি মিলটনের (আমার) কাছে বিক্রি করা, তাহলে সেটা কীভাবে বিক্রি করবেন? ঠিক তখনই হিংস্র হায়েনার মতো গর্জে ওঠে সেই চক্রান্তকারীরা। তারা খবির ও সরোয়ারকে সোজা বলে দেন: “আপনারা সিআইডি-কে বলবেন, মিলটন জোরপূর্বক ভয় দেখিয়ে ও জোরাজুরি করে ওই জায়গা লিখে নিয়েছে। মিলটনকে একবার জেলে ঢোকাতে পারলেই সব সমস্যার সমাধান!”


সাজানো ১৬৪ ধারা এবং লোলুপতার জয়: যেই পরামর্শ, সেই কাজ। এরপর নড়াগাতি থানার একটি মামলায় সরোয়ার ও খবিরকে যখন রিমান্ডে নেওয়া হয়, তখন খুলনার ওই সাংবাদিকদের শিখিয়ে দেওয়া ছক অনুযায়ী তারা সিআইডির কাছে মিথ্যা জবানবন্দি দেন এবং পরবর্তীতে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি করতে বাধ্য হন।


তবে সত্যের আলো কখনো না কখনো প্রকাশ পায়। ওই মামলার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা পুরো বিষয়টি নিয়ে আমার সাথে মুঠোফোনে কথা বলেছিলেন। আমি যখন তাকে দলিলপত্রসহ সব সত্য খুলে বললাম, তিনি একজন বিবেকবান মানুষের মতো আমার সরলতা ও নির্দোষিতা বুঝতে পারলেন। আর সেই কারণে তিনি আমাকে ওই মামলার আসামী করেননি।


কিন্তু তাতেও দমে যায়নি বাইরে ওৎ পেতে থাকা সেই লোলুপ সাংবাদিক নামধারী শকুনের দল। তারা দেখল আইনি পথে আমাকে জড়ানো যাচ্ছে না। তখন তারা সরাসরি সিআইডির উচ্চ মহলের সাথে যোগাযোগ করে অর্থের বিনিময়ে হোক কিংবা প্রভাব খাটিয়ে-আমাকে খুলনা থেকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করায়। ক্ষমতার অপব্যবহার আর কলম বিক্রি করা কিছু মানুষের মিলিত হিংস্রতায়, একজন নির্দোষ মানুষকে টেনে হিঁচড়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। আমার একমাত্র অপরাধ ছিল-আমি তাদের অন্যায়ের সহযোগী হইনি এবং সত্যের পথে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলাম। আর সেই সত্যের বলিরূপেই আজ আমি হাতকড়া পরা এক বন্দি। (চলবে…)