স্টাফ রিপোর্টার
খুলনা নগরের দৌলতপুরের পশ্চিম কাশীপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র জামে মসজিদে ফজরের নামাজের পর মুসল্লিদের লক্ষ্য করে গুলির ঘটনায় একাধিক দিক সামনে রেখে তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছে পুলিশ। রোববার বিকেল পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। কাউকে আটকও করা যায়নি।
পুলিশের একাধিক সূত্র বলছে, ঘটনাটির পেছনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে। পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, ডিজিটাল তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি এলাকায় চোরাই তেল কারবার-সংক্রান্ত কোনো বিরোধ বা চরমপন্থী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা আছে কি না, তাুও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
এ সম্পর্কে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাশিদুল ইসলাম খান বলেন, ‘গুলির ঘটনার বিষয়টি তদন্তাধীন। এ মুহূর্তে বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে বেশ কিছু তথ্য আমরা পেয়েছি, যা যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে চারটি গুলির খোসা ও একটি অব্যবহৃত গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।’
তদন্তুসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, গুলিবিদ্ধ লোকমান হাকিমের সঙ্গে কোনো চরমপন্থী গোষ্ঠীর যোগাযোগ ছিল কি না, সে বিষয়েও তদন্তকারীরা তথ্য যাচাই করছেন। হামলার পেছনে এসব বিষয় থেকে সৃষ্ট কোনো বিরোধের যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
রবিবার ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে নগরের দৌলতপুর থানার পশ্চিম কাশীপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র জামে মসজিদে ওই হামলার ঘটনা ঘটে। গুলিবিদ্ধ হন মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি লোকমান হাকিম (৪৫) ও ব্যবসায়ী আলম শেখ (৫৫)। তাঁদের মধ্যে লোকমান হাকিমের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। আলম শেখকে দুপুরে ঢাকায় নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া ঢাকায় বেসরকারি হাসপাতালে গুরুতর আহত লোকমান হাকিমের পেট থেকে তিনটি গুলি বের করা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহত ব্যক্তির দেহে আরো একাধিক গুলি রয়েছে। তিনি এখনও শঙ্কামুক্ত নয়। চিকিৎসকরা যথাসাধ্য চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন।
নগরীতে মসজিদের ভেতরে এমন দুর্বৃত্তদের হামলার ঘটনায় স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। একাধিক ব্যক্তিদের তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
নাম উল্লেখ না করার শর্তে তারা বলেন, কেএমপি পুলিশ প্রায় এক সপ্তাহ ধরে নগরীতে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, মাদক কারবারীসহ অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছেন। এমন অবস্থায় প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, গুলি ও হত্যার ঘটনা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মানুষ শুধু বাসায়ই নয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নিরাপদ নয়। এ অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন প্রয়োজন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ফজরের নামাজ শেষে মসজিদের ভেতরে বসে ছিলেন লোকমান হাকিম। একই সময়ে মসজিদের বারান্দায় বসে জিকির করছিলেন আলম শেখ। এ সময় সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা আকস্মিকভাবে মসজিদে ঢুকে লোকমান হাকিমকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। গুলিতে আলম শেখও আহত হন। রক্তাক্ত অবস্থায় দুজন মসজিদের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। পরে দুর্বৃত্তরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় লোকমান হাকিম মুঠোফোনে স্বজনদের বিষয়টি জানান বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে। হাতে আসা একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, রোববার ভোর ৫টা ২৭ মিনিটের দিকে মসজিদের সামনে দিয়ে লাল রঙের একটি মোটরসাইকেলে দুই ব্যক্তিকে যেতে দেখা যায়। তাঁদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশ বলছে, ঘটনাস্থলের একেবারে কাছের সিসিটিভি ফুটেজ এখনো পাওয়া যায়নি। তবে আশপাশের ফুটেজে মোটরসাইকেলে দুই ব্যক্তিকে এবং অন্য একটি ফুটেজে আরও একজনকে রেকি করতে দেখা গেছে। আরও ফুটেজ বিশ্লেষণের কাজ চলছে। ওই মসজিদের ইমাম আমানত উল্লাহ বলেন, ‘ফজরের নামাজের পর কিছু সময় লোকমান হাকিম আমার সঙ্গে কোরআন শরিফ পড়েন। এরপর আমি বাসায় চলে যাই। তখনো তিনি কোরআন তিলাওয়াত করছিলেন এবং আলম শেখ বারান্দায় বসে জিকির করছিলেন। আধা ঘণ্টা পর গোলাগুলির খবর পাই।’ মুসল্লি আলম শেখ কাপড়ের ব্যবসায়ী বলেন জানান তিনি।
আমানত উল্লাহ আরও বলেন, ‘২৬ বছর ধরে আমি এই মসজিদে খেদমত করছি। এই সময়জুড়েই লোকমান হাকিমকে মসজিদ কমিটির সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করতে দেখেছি। তিনি পরোপকারী মানুষ।’
মসজিদের এক নিয়মিত মুসল্লি বলেন, ‘লোকমান সাহেব প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এই মসজিদেই আদায় করতেন। এশা ও ফজরের নামাজের পর প্রায় এক ঘণ্টা করে কোরআন তিলাওয়াত করতেন। মসজিদের ভেতরে এমন ঘটনা ঘটবে, তা আমরা কখনো ভাবিনি। আমরা আতঙ্কিত ও মর্মাহত। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। আমরা সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের বিচার চাই।’
খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) উপুপুলিশ কমিশনার (উত্তর) সুদর্শন কুমার রায় বলেন, ঘটনার তদন্তে কয়েকটি টিম কাজ করছে। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পাশাপাশি কিছু ডিজিটাল তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব হবে।
সুদর্শন কুমার আরও বলেন, গুলিবিদ্ধ লোকমান হাকিম তেলের ডিপোর একটি কোম্পানির এজেন্ট হিসেবে কাজ করতেন। একই সঙ্গে তিনি ওজোপাডিকোর ঠিকাদারও ছিলেন। ব্যবসায়িক কিংবা পারিবারিক কোনো বিরোধ ছিল কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। তাঁর কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী তিনি একজন ব্যবসায়ী।










































