স্টাফ রিপোর্টার।।
খুলনার মানুষের কাছে নব্বইয়ের দশকের এক সুপরিচিত নাম ছিল জেলার শিববাড়ি মোড়ে নির্মিত ‘জিয়া হল’। তবে এটি ম্লান হয়ে যায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হওয়ার পর। একাধিকবার পরিবর্তন করা হয় নাম। একটা পর্যায়ে হলটি ব্যবহারের অনুপযোগী দেখিয়ে ভেঙে ফেলে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি)। পরে সেখানে ‘আধুনিক সিটি সেন্টার’ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এখনো আলোর মুখ দেখেনি প্রতিষ্ঠানটি। নামকরণে আটকে আছে প্রকল্পের কাজ।
কেসিসি সূত্র ও নথিপত্র বিশ্লেষণ করে জানা যায়, ১৯৯২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া খুলনা নগরীর শিববাড়ি মোড়ে নির্মিত ‘জিয়া হল’ ভবনের উদ্বোধন করেন। পরবর্তী সময়ে ভবনটি জরাজীর্ণ ও ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ায় ২০১৩ সালের ১৩ মে বিভাগীয় কমিশনারকে আহ্বায়ক ও কেসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে সদস্যসচিব করে কনডেমনেশন কমিটি করে মন্ত্রণালয়। ২০১৪ সালের ৩ জুন ভবনের মূল্য নির্ধারণের জন্য আরেকটি কমিটি করে দেয় এই কমিটি। ২০১৫ সালের ২৫ মার্চ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।
২০১৯ সালের জুনে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয় প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৯ সালের ২৬ জুন হল নিলামের জন্য দরপত্র আহ্বান করে কেসিসি। মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৩৮ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। পরবর্তী সময়ে পাঁচ দফা নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। কিন্তু কোনো ঠিকাদারই নিলামে অংশ নেননি। ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর সৌরভ এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ৪৩ লাখ ৩১ হাজার টাকা দিয়ে জিয়া হলের ভগ্নাবশেষ কিনতে মেয়রের কাছে আবেদন করেন। এই আবেদন সাধারণ সভায় উত্থাপন হয়।

২০২১ সালের ২৩ ডিসেম্বর সৌরভ এন্টারপ্রাইজের নিলাম আবেদন অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর ভেঙে ফেলা হয় জিয়া হল। এরপর থেকে ওই স্থানে কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের প্রস্তুতি নেয় কেসিসি। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়। এবার ‘জিয়া হল কমপ্লেক্স’ ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয় কেসিসি।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রকল্পটির নামকরণের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। সেই সিদ্ধান্তের আলোকে খুলনা সিটি করপোরেশন ‘খুলনা জিয়া হল কমপ্লেক্স’ নাম অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানায়। তবে নামকরণের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত অনুমোদনের তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রায় এক মাস আগে ‘জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন’ বরাবর নামকরণের অনুমতি চেয়ে চিঠি লিখেছে কেসিসি।
সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে খুলনা সিটি করপোরেশনকে প্রকল্পের নামকরণ, প্রকল্পে ৩০ শতাংশ ম্যাচিং ফান্ড নিশ্চিত করা, প্রকল্পের বিভিন্ন অঙ্গের ব্যয় পুনরায় যাচাই-বাছাই করে যথাযথ প্রক্রিয়ায় নির্ধারণ করা, প্রকল্পভুক্ত অবকাঠামো ও কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পুনর্গঠনের নির্দেশ দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জিয়া হল ঘিরে খুলনার ঐতিহ্য রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে খুলনার মানুষের উপকার হবে। জেলার সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনা, সভা-সমাবেশ আয়োজন, সামাজিক মিলনস্থল সৃষ্টি এবং নগর অবকাঠামো ও নাগরিক সেবার উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হবে। প্রকল্পের আওতায় একটি ৯ তলাবিশিষ্ট কমপ্লেক্স নির্মাণ, অভ্যন্তরীণ রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণ, যানবাহন ক্রয়, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে।
নগরীর সোনাডাঙ্গার বাসিন্দা খান একরামুল হক বলেন, ‘আমরা ছোটবেলায় বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও দিবসে জিয়া হলে যেতাম। এখনো শিববাড়ির নাম উঠলে জিয়া হলের কথা মনে পড়ে। খুলনার মানুষের কাছে এটি খুবই পরিচিত। এটি একই নকশায় পুনর্নির্মাণ করা হলে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকবে।’

নগরীর শেখপাড়া এলাকার বাসিন্দা সাজেদুল হক প্রিন্স বলেন, ‘জিয়া হল’ ভেঙে ফেলা হয়েছে, তবে নাম তো মুছে যায়নি। নাম কখনো মুছে ফেলা যায় না। এখানে পুনরায় জিয়া হল নির্মাণ করা সময়ের দাবি।
‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ কমিটির খুলনা মহানগর শাখার সভাপতি সাকিব রেজা বলেন, জিয়া হল পুনরায় চালু হলে খুলনাবাসীর জন্য অনেক বাস্তব ও দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা তৈরি হবে।
তিনি বলেন, খুলনায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধার ভালোমানের কোনো সেমিনার হল বা কনভেনশন সেন্টার নেই। জিয়া হল কমপ্লেক্স হলে দেশের অন্যান্য বড় শহরের মতো খুলনাবাসীও একটি আধুনিক কনভেনশন ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র পাবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অনুষ্ঠান আয়োজনের সুযোগ তৈরি হবে।

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, “জিয়া হলের নাম একাধিকবার পরিবর্তন করা হয়েছে। একবার পাবলিক হল, একবার জিয়া হল করা হয়। এখানে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা লক্ষ্য করা যায়। হলটি ভেঙে না ফেলে সংরক্ষণ করা যেতো। একটু উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল কিন্তু তা করা হয়নি। এজন্য আমরা পুনরায় ‘জিয়া হল’ নির্মাণের দাবি জানাই।”
জানতে চাইলে খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবির উল জব্বার বলেন, প্রথম ধাপে নামকরণের অনুমতি চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। নামকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে বাকি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে মোট ব্যয়ের ৩০ শতাংশ খুলনা সিটি করপোরেশন বহন করবে। বাকি ব্যয় সরকার বহন করবে। প্রকল্পটির নামকরণ দ্রুত সম্পন্ন হলে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করা যাবে।










































