স্টাফ রিপোর্টার
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের প্রধান অধ্যাপক রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের সঙ্গে অশালীন আচরণ, যৌন হয়রানি ও অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী এক ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে লিখিত অভিযোগ করেন।
বুধবার (১৭ জুন) বিকালে অভিযোগটি তদন্তের জন্য যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ কেন্দ্রের ৭ সদস্যের কমিটি কাজ শুরু করেছে। নিরোধ কেন্দ্রের সভাপতি অধ্যাপক মোছা. তাসলিমা খাতুন এ কথা জানিয়েছেন।
গতকাল মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীরা ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেসেজ দিয়ে উত্ত্যক্ত করা মেসজসম্বলিত প্রমাণপত্রসহ যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ কেন্দ্রে লিখিত অভিযোগ করেন।
অভিযোগে ভুক্তভোগী উল্লেখ করেন, শুরুতে ওই শিক্ষক তার সঙ্গে ভালো আচরণ করলেও ধীরে ধীরে মেসেঞ্জারে ও হোয়াটসঅ্যাপে নানা ধরনের কুরুচিপূর্ণ ও অস্বস্তিকর বার্তা পাঠাতে শুরু করেন। উপর্যুক্ত প্রমাণসহ নথি পত্রে দেখা যায়, তোমার মতো মেয়ে বিয়ের আগে পাওয়া দরকার ছিল, আই লাভ ইউ মোর দ্যান আই ক্যান সে, লাভ ইন ইংলিশ দ্যা জান্নাহ, আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না, তাহলে আজ থেকে ভালোবাসা শুরু হোক, বন্ধুর সাথে হাগ করলে সব ডিপ্রেশন থাকেনা, তোমার মতো সুন্দরী মেয়ে দুনিয়ায় কম আছে, ডিসিপ্লিনে আমি শুধু মারি, আদর করে মারি কোনো মেয়েদের মারিনা কিন্তু তোমাকে মারতে হবে এমন সব বাক্য প্রদান করেন।
প্রতিবেদকের সাথে সরাসরি যোগাযোগে ভুক্তভোগী ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানান, ‘আমি ফেসবুকে তাকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠানোর পরদিনই তিনি তা গ্রহণ করেন এবং সঙ্গে সঙ্গে বার্তা পাঠানো শুরু করেন। বিষয়টি আমাকে বিস্মিত করেছিল। পরবর্তীতে তার পাঠানো বার্তাগুলো ক্রমেই অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে আমি বিষয়টি আর সহ্য করতে না পেরে সহপাঠী ও ডিসিপ্লিনের প্রতিনিধিদের জানাই। প্রথমদিকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না দেখলেও, পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।’
তিনি আরও বলেন, ‘একজন শিক্ষকের কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। শুরুতে প্রভাবশালী এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মুখ খুলতে ভয় পেলেও, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা প্রয়োজন মনে করেই আমি সামনে এসেছি। আমি চাই অন্য ভুক্তভোগীরাও সাহস করে কথা বলুক এবং এ ঘটনার এমন একটি দৃষ্টান্তমূলক বিচার হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো শিক্ষার্থীকে এই পরিস্থিতির শিকার হতে না হয়।’
একই ডিসিপ্লিনের আরেক ছাত্রী অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে অতীতে মৌখিক ও মানসিক হেনস্তার অভিযোগ তুলে বলেন, প্রায় এক যুগ আগে যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এতটা জনপ্রিয় ছিল না, তখনও ক্লাসের সবার সামনে কিংবা গভীর রাতে ফোন ও মেসেজে ছাত্রীদের (বিশেষ করে বিবাহিত ছাত্রীদের) নানা ধরনের আপত্তিকর ও অস্বস্তিকর প্রশ্ন করতেন এই শিক্ষক।
এদিকে, এই ঘটনা সামনে আসার পরে এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের বিভিন্ন ব্যাচের কয়েকজন শিক্ষার্থীদের সাথে প্রতিবেদক সরাসরি যোগাযোগ করে জানতে পারেন। একইভাবে আরও দুজন ভুক্তভোগী ছাত্রী হেনস্তার কথা জানান (যার প্রমাণপত্র এই প্রতিবেদকের হাতে সংরক্ষিত রয়েছে)। ওই শিক্ষকের কথায় সাই না দিলে শিক্ষার্থীরা তাঁর ব্যক্তিগত আক্রশের শিকার হয় বলে জানান ভুক্তভোগী ছাত্রীরা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক মো. রেজাউল ইসলাম দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন ও ষড়যন্ত্রমূলক।
তিনি বলেন, ‘গত ফেব্রুয়ারিতে আমার মোবাইল ফোনটি চুরি হয়ে যায়। এরপর থেকে আমি আমার ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট ডিলিট করে দিয়েছি। এই বিষয়ে থানায় জিডি করা হলেও এখনো ফোনটি উদ্ধার হয়নি। ডিসিপ্লিনের প্রধান হিসেবে আমি অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করেছি এবং শিক্ষার্থীদের কিছু নিয়মের বাইরে যেতে বাধা দিয়েছি। মূলত ঈর্ষা ও শত্রুতা থেকেই আমার বিরুদ্ধে এমন অপপ্রচার চালাচ্ছে একটি মহল।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ কেন্দ্রের সভাপতি তাসলিমা খাতুন অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন। বিষয়টি তদন্তের জন্য জরুরি সভা আহ্বান করা হয়েছে। সভার সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরবর্তী আইনগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হারুনর রশিদ খাঁন বলেন, ‘ডিনদের সঙ্গে বৈঠক করে অভিযুক্ত শিক্ষককে ডিসিপ্লিন প্রধানের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তাঁর স্থলে ড. মো. ইয়াসিন স্যারকে ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাকি পদক্ষেপ তদন্ত শেষ হলে কর্তৃপক্ষ নেবে বলে জানান তিনি।’










































