শামিম শিকদার||
আট বছরের রামিসা আক্তার| পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির এক চিলতে আলো| আব্দুল হান্নান মোল্লা আর পারভীন আক্তারের বেঁচে থাকার পুরো আকাশটাই জুড়ে ছিল এই চপল মেয়েটি| যার সকালে ঘুম থেকে ওঠার বায়না ছিল, বাবার কাছে চিপস চেয়ে আবদার ছিল, আর ছিল এক বুক নিষ্পাপ হাসি| কিন্তু এক মেঘাচ্ছন্ন মঙ্গলবার সকালে সেই হাসিকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিল এই সমাজেরই বুকে হেঁটে বেড়ানো এক নরপিশাচ| মিরপুরের এক অন্ধকার ফ্ল্যাটে যা ঘটল, তা কেবল একটি শিশুর জীবন কেড়ে নেয়নি, তা মূলত খুন করেছে আমাদের তথাকথিত সভ্য সমাজের অবশিষ্ট মনুষ্যত্বকে|
যখন রামিসার মা পারভীন আক্তার পাশের ফ্ল্যাটের দরজায় দাঁড়িয়ে আকুল হয়ে ডাকছিলেন, “আমার রামিসা কি এখানে?”—ঠিক তখনই দরজার ওপাশে তাঁর কলিজার টুকরোটিকে ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছিল এক বিকৃত কামনার দানব| মায়ের কড়া নাড়ার শব্দের মাঝেই চলেছে এক নিষ্পাপ দেহকে টুকরো টুকরো করার বীভৎস উৎসব| ভাবলে শিউরে উঠতে হয়, কতটা অবশ হয়ে গেছে আমাদের চারপাশ, কতটা অন্ধ হয়ে গেছে আমাদের চারপাশের মানুষ যে, ঘরের গ্রিল কেটে খুনি পালিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা টেরই পাই না কী বিপুল অন্ধকার আমাদের গ্রাস করতে চলেছে|
বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও এক পিতার আকুল আর্তনাদ:
রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লার কান্না আজ কোনো সাধারণ বিলাপ নয়| এটি এই রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার মুখে এক প্রচণ্ড চপেটাঘাত| যখন তিনি বার বার মূর্ছা গিয়ে বলছেন—
“আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না| আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই… এটা বড়জোর ১৫ দিন চলবে, আবার কোনো ঘটনা ঘটবে| এরপর এটা ধামাচাপা পড়ে যাবে|” এই অবিশ্বাস, এই চরম ক্ষোভ আর হাহাকার কেবল এক নিঃ¯^ পিতার নয়; এটি বাংলাদেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের কণ্ঠ¯^র| আমরা এমন এক সমাজ ˆতরি করেছি, যেখানে খুনিরা বুক ফুলিয়ে ঘোরে, ফাঁক-ফোকর গলে বেরিয়ে যায় নরপিশাচরা, আর বুক খালি হওয়া বাবা-মাকে উল্টো সান্ত্বনা দিতে হয় ফাঁকা প্রতিশ্রুতির বুলি দিয়ে| ১৫ দিন পর যখন নতুন কোনো ঘটনা এসে এই নিষ্ঠুরতাকে আড়াল করে দেবে, আমরা কি সত্যিই ভুলে যাব রামিসার সেই রক্তমাখা ছোট্ট স্যান্ডেল জোড়ার কথা?
ইয়াবা, বিকৃত যৌনচার এবং আমাদের পচনশীল সমাজ:
খুনি সোহেল রানার ¯^ীকারোক্তি শুনলে রক্তের তাপমাত্রা হিমাঙ্কে নেমে আসে| প্রথমে ইয়াবা সেবন, তারপর এক প্রতিবেশীর শিশুকে জোর করে ঘরে তুলে এনে পাশবিক নির্যাতন, এবং পরিশেষে প্রমাণ লোপাটের জন্য ধারালো ছুরি দিয়ে মাথা বিচ্ছিন্ন করা—এই যেন কোনো হরর চলচ্চিত্রের গল্প| কিন্তু না, এটাই আমাদের রূঢ় বাস্তবতা|
নেশার নীল ছোবল আর বিকৃতির এই চরম আসক্তি আমাদের চারপাশকে এক নরককুণ্ডে পরিণত করেছে| যেখানে স্ত্রী নিজেই জানত তার ¯^ামী কতটা বিকৃত, কিন্তু এক অদ্ভুত নীরবতায় সেও হয়ে উঠেছে এই নির্মমতার ভাগীদার| আদালত চত্বরে দাঁড়িয়ে মানুষ যখন ‘ফাঁসি ফাঁসি’ বলে স্লোগান দেয়, তখন বুঝতে হবে এই জনরোষ আসলে দীর্ঘদিনের জমে থাকা কান্নার বহিঃপ্রকাশ| মানুষ আজ ক্লান্ত, মানুষ আজ তপ্ত|
কেবল কি ব্যবস্থার ফাঁক-ফোকর, নাকি হৃদয়েরও?
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা আসেন, মামলার ‘ফাঁক-ফোকর’ নিয়ে কথা বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুততম সময়ে খুনিকে ধরার কৃতিত্ব নেয়| হ্যাঁ, পুলিশ ৭ ঘণ্টার মধ্যে খুনিকে ধরেছে—প্রশংসা তাদের প্রাপ্য| কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে ফাঁক-ফোকরের চাদরে প্রতিনিয়ত অপরাধীরা ঢাকা পড়ে যায়, সেই চাদরটা ছিঁড়বে কে? আইন যদি তার নিজ¯^ গতিতে চলে রামিসার খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি তথা মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করতে না পারে, তবে আব্দুল হান্নান মোল্লার কথাই চিরন্তন সত্য হয়ে থাকবে|
রামিসা আর ফিরবে না| কোনো এক বিকেলে আর কোনো মিষ্টি মেয়ে তার বাবার ফোনে আবদার করে বলবে না, “বাবা, আসার সময় চিপস নিয়ে এসো|” এক শূন্য ঘরে একজোড়া স্যান্ডেল আর কিছু বইখাতা পড়ে থাকবে চিরকাল| কিন্তু এই রাষ্ট্র, এই সমাজ কি পারবে রামিসার মায়ের সেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ ভুলতে?
আজ যদি এই নির্মমতার দৃষ্টান্তমূলক, দ্রুততম এবং কঠোরতম শাস্তি না হয়, তবে মনে রাখতে হবে—পরের বার কোনো এক বন্ধ দরজার ওপাশে হয়তো আমার বা আপনার সন্তানই আর্তনাদ করবে, আর আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে কেবল নিয়তির পরিহাস দেখব| রামিসার রক্ত যেন আমাদের ঘুমন্ত বিবেককে অন্তত শেষবারের মতো জাগিয়ে দিয়ে যায়| (লেখক: গণমাধ্যমকর্মী)











































