Home Lead ব্রিজ দুটিতে উঠতে হয় সাঁকো দিয়ে

ব্রিজ দুটিতে উঠতে হয় সাঁকো দিয়ে

4


স্টাফ রিপোর্টার।।
উন্নয়নের ডামাডোলের মাঝেও চরম দুর্ভোগের এক নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুটি অসমাপ্ত ব্রিজ। দীর্ঘ আট বছরেও শেষ হয়নি সংযোগ সড়কের কাজ। ফলে বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো দিয়ে পারাপার হতে হচ্ছে স্কুলগামী শিশু থেকে শুরু করে শতায়ু বৃদ্ধকে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার মোংলা উপজেলার চিলা ও সুন্দরবন ইউনিয়নের চিত্র এটি। এই দুই ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষের স্বপ্নের সারথি হওয়ার কথা ছিল ব্রিজ দুটির। কিন্তু স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) প্রকৌশলীর অবহেলা আর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বহীনতায় সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল করতে সুন্দরবন ইউনিয়নের বাঁশতলা বাজারসংলগ্ন এলাকায় মাত্র ১৫০ মিটারের ব্যবধানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজ নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। এর মধ্যে প্রথমটি পাখিমারা খালের ওপর ৯০ মিটারের ব্রিজ। ৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ের এই বৃহৎ প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালের ৬ জুন। চুক্তি অনুযায়ী ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই এটি চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার কথা ছিল। কিন্তু আট বছর পার হয়ে গেলেও আজও শেষ হয়নি সংযোগ সড়কের কাজ।

দ্বিতীয়টি পুটিমারী খালের ওপর ৪০ মিটারের ব্রিজ। ৫ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে এই ব্রিজের কাজ শুরু হয় ২০২১ সালে। ২০২৩ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে পুরো প্রকল্পের কাজ রহস্যজনক কারণে স্থবির হয়ে আছে। ১২ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের এই প্রকল্প দুটি এখন কেবলই কংক্রিটের কাঠামো হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে, যা কোনো কাজে আসছে না সাধারণ মানুষের।

মোংলা উপজেলার চিলা ও সুন্দরবন ইউনিয়নের মিলনস্থল হলো ঐতিহাসিক বাঁশতলা বাজার। প্রতিদিন এই বাজারে উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চার-পাঁচ হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। নদী ও ঘেরের মাছ, শাকসবজি কেনাবেচার অন্যতম কেন্দ্র এটি। ব্রিজ দুটি চালু না হওয়ায় এখানকার ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে উঠেছে। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না।

ব্যবসায়ীরা আক্ষেপ করে বলেন, ‘ব্রিজ হলে এলাকার চাকা ঘুরত, কিন্তু এখন আমরা নিজেরাই অচল হয়ে পড়েছি।’

যে খাল পার হতে ব্রিজের ওপর দিয়ে মাত্র কয়েক মিনিট লাগত, সেখানে এখন কয়েক কিলোমিটার পথ ঘুরে বা বিপজ্জনক সাঁকো পার হয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, যেখানে যেতে সময় লাগে ১০ মিনিট, সেখানে এখন দুই ঘণ্টা ব্যয় করতে হচ্ছে। আর জরুরি প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্স বা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। মুমূর্ষু রোগীকে ঘাড়ে বা খাটিয়ায় করে সাঁকো পার করতে হয়।

অভিযোগ উঠেছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের বরাদ্দের একটি বড় অংশ তুলে নিয়ে কাজ অসমাপ্ত রেখেই এলাকা থেকে লাপাত্তা হয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় কাজ বন্ধ থাকায় ব্রিজের লোহার রড ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী মরিচা ধরে নষ্ট হচ্ছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) কর্মকর্তাদের তদারকির অভাব এবং ঠিকাদারের সাথে গোপন আঁতাতের অভিযোগও তুলছেন স্থানীয়রা। তারা প্রশ্ন তুলছেন, বারবার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কেন ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না?

স্কুলগামী এক শিক্ষার্থী জানায়, ‘বর্ষাকালে সাঁকো পার হতে গিয়ে অনেক সময় বইখাতা নিয়ে পানিতে পড়ে যাই। আমরা ব্রিজ চাই, আমরা নিরাপত্তা চাই।’

এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠরা বলেন, ভোট আসে ভোট যায়, কিন্তু ব্রিজের কাজ শেষ হয় না। আমাদের এই কষ্ট দেখার কেউ নেই।

এই দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে জানতে চাইলে মোংলা উপজেলা প্রকৌশলী নাবিদুল হাসান জানান, প্রকল্প দুটির কাজ মাঝপথে আটকে থাকায় সাধারণ মানুষের কষ্টের বিষয়টি তারা অবগত আছেন।

তিনি বলেন, ‘পাখিমারা ও পুটিমারী ব্রিজের মূল অবকাঠামোর কাজ শেষ হলেও সংযোগ সড়ক বা অ্যাপ্রোচ রোডের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণে কিছু আইনি জটিলতা দেখা দিয়েছিল। এ ছাড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গড়িমসির কারণেও কাজ বিলম্বিত রয়েছে।’

উপজেলা প্রকৌশলী আরও বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত নোটিশ পাঠিয়েছি। জমি অধিগ্রহণের সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য জেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করা হচ্ছে। আশা করছি খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে নতুন করে কাজ শুরু করে ব্রিজের সংযোগ সড়ক চলাচলের উপযোগী করা সম্ভব হবে।’

মোংলার এই অবহেলিত জনপদের মানুষের এখন একটাই দাবি, আর কোনো টালবাহানা নয়, অবিলম্বে সংযোগ সড়কসহ ব্রিজের কাজ সম্পন্ন করে জনদুর্ভোগ লাঘব করা হোক।