খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতীক হয়ে ওঠা রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে হত্যার মামলায় দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২; পুলিশের তিন কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন সাজা|
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ বৃহস্পতিবার এ রায় ঘোষণা করে| ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর|
মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত দুজন হলেন—এএসআই (সশস্ত্র) আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়| তারা দুজনই গ্রেপ্তার রয়েছেন|
আর যাবজ্জীবন সাজা পাওয়া তিনজন হলেন-তখনকার সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন ও এসআই বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব| পৃথক ধারায় এ তিনজনের ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে| এ মামলায় ৩০ আসামির সবাই দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন| বাকি ২৫ আসামির মধ্যে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে ৫ জনের, পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে ৮ জনের এবং ১১ জনের হয়েছে ৩ বছরের সাজা| অপর একজনের হাজতবাসের সময়কে দণ্ড হিসেবে গণ্য করা হয়েছে|
দণ্ডিতদের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে ছয়জন কারাগারে আছেন| রায় ঘোষণার সময় তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়| এ মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে মোট ২৫ জনের জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়| এর মধ্যে প্রত্যক্ষদর্শী, বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক, চিকিৎসক এবং পুলিশ সদস্য রয়েছেন|
আবু সাঈদের সঙ্গে গুলিবিদ্ধ হওয়া ব্যক্তিরা এবং পটভূমির সাক্ষী হিসেবে বর্তমান সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ আদালতে সাক্ষ্য দেন| এছাড়া ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ভিডিও ও টেলিভিশনের লাইভ সম্প্রচারের ভিডিও প্রমাণ হিসেবে দাখিল করা হয়|
রায় ঘোষণার পর ব্রিফিংয়ে প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম বলেন, “আমি প্রথমেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই আমাদের এনটিভির সেই সাংবাদিক…মঈনুল হক| আমি কৃতজ্ঞতার সাথে তার কাছে আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই| তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তার ক্যামেরাম্যানসহ এই ভিডিও ধারণ করার কারণেই এই নির্মম হত্যাকাণ্ডটি সারা দুনিয়ার মানুষ, সারা পৃথিবী দেখতে পেয়েছিল|
“আমি সকল সাংবাদিক বন্ধুদের কাছে আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই—এই জুলাই বিপ্লবের সময় আপনাদের জীবন বাজি রেখে বিভিন্ন গণমাধ্যম আপনারা যেভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আপনারা বিভিন্ন ফুটেজ ধারণ করেছেন এবং সেই ফুটেজগুলো আমাদেরকে দিয়ে যেভাবে সহযোগিতা করেছেন|”
এক সাংবাদিক জানতে চান, রায় নিয়ে প্রসিকিউশন সন্তুষ্ট কি না| জবাবে আমিনুল বলেন, “ওখানে আসলে ধরেন দুজনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, তিনজনের যাবজ্জীবন হয়েছে| আর আমাদের যে ধরনের চার্জ ছিল তাদের ভূমিকা অনুযায়ী সেই সাজাগুলো হয়েছে বলে মনে হয়|
“তারপরও আমরা পূর্ণাঙ্গ জাজমেন্ট পাওয়ার পরে সেটা পর্যালোচনা করে যদি আমাদের কাছে মনে হয় যে, যেসব চার্জ থেকে তাদেরকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ থাকবে| সেগুলো পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি পাওয়া সাপেক্ষে আমরা সিদ্ধান্ত নেব|”
তিনি বলেন, “আমরা সন্তুষ্ট বলতে আমরা তো ৩০ জনকে আসামি করেছিলাম| ৩০ জনকেই দণ্ডিত করা হয়েছে| কেউ কিন্তু এ মামলায় খালাস পায়নি| কোয়ান্টাম অব সেন্টেন্স হয়তো কম, কোনোটা বেশি মনে হতে পারে, সেটি বিচার্য বিষয়|
“এবং সেখানে আমাদের ট্রাইব্যুনালের মাননীয় বিচারপতিগণ তারা সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে হয়ত সেই সেন্টেন্সটা দিয়েছেন| আমরা যদি কোনো সেন্টেন্স মনে করি যে যেসব কাউন্ট থেকে তাদেরকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, সেই জায়গাতে আমরা যদি মনে করি যে সেখানেও শাস্তি হতে পারত, সেটা আমরা পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পরে সিদ্ধান্ত নেবুআপিল করব কি না|”
এক প্রশ্নের জবাবে প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল বলেন, “এখানে সুপিরিয়র কমান্ড রেসপন্সিবিলিটির জায়গা থেকে আগেই আমাদের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ¯^রাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল, পুলিশের আইজিপি তাদের কিন্তু আরেকটি মামলায় শাস্তি হয়েছে| এই কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি কিন্তু সারা বাংলাদেশের সব ক্ষেত্রেই কিন্তু এই কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি কাজ করেছে|
“সেকেন্ডলি হচ্ছে, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ঘটনাটা ঘটেছে, সেখানে যারা সুপিরিয়র অফিসার ছিলেন তাদেরকেও কিন্তু এই মামলায় দণ্ডিত করা হয়েছে| অতএব আমরা কোনোটাই কোনো চার্জই আমরা প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছি বলে মনে করি না|”
ব্রিফিংয়ে উপস্থিত আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেনের কাছে জানতে চাওয়া হয়, রায় নিয়ে তারা সন্তুষ্ট কি না?
জবাবে আবু হোসেন বলেন, “আমাদের অসন্তুষ্টির জায়গা হচ্ছে- পুলিশের যারা গুলি করল, তারা একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে করছে| যারা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিল, তাদের কারো ফাঁসি হয়নি| এক্ষেত্রে আমাদের অসন্তুষ্টি আছে| আমরা অবশ্যই আপিল করব এটার জন্য|”
মামলার বাদী, নিহতের বড় ভাই রমজান আলী বলেন, “আমরা মনে করি এবং দেশের সকল মানুষই মনে করে যে আজকে আমরা যে বিচার পেয়েছি, তাতে মোটামুটি আলহামদুলিল্লাহ| কিন্তু পুলিশের যারা রংপুরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, তাদের সাজা কম হয়েছেুএটা আমাদের মনে হয়| এবং ছাত্রলীগ সভাপতি যে পোমেল বড়ুয়া, তার ফাঁসি হওয়া দরকার ছিল|
“আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে তার ফাঁসির দাবি| আক্রমণাত্মক আকারে আবু সাঈদকে অনেক মারপিট করছে এবং অনেক ধমক দিছে এবং পিটাইছে| আসলেই তার বিচারটা আমাদের সঠিক মনে হল না| আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে পোমেল বড়ুয়ার বিচারে অসন্তোষ প্রকাশ করছি|”
তাদের মধ্যে গ্রেপ্তার ছয়জন হলেন-এএসআই আমির হোসেন, সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী, সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল ও প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ|
মামলা বৃত্তান্ত
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ নিহত হন| সেদিন দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদকে পুলিশের গুলি করার ভিডিও সংবাদ মাধ্যমে প্রচার হলে ছাত্র-জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে| আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে| পরদিন থেকে সারা দেশে ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করা হয়| এরপর বিক্ষোভে দমন-পীড়ন আর সহিংসতার মধ্যে ১৯ জুলাই কারফিউ দিয়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি শেখ হাসিনা সরকার|
তুমুল গণ-আন্দোলনের মধ্যে ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগের টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে| শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান|
অন্তর্বর&তী সরকার জুলাই অভ্যুত্থানে দমন-পীড়নকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের উদ্যোগ নেয়| এরপর আবু সাঈদের মামলাও ট্রাইব্যুনালে আসে|
ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনে আবু সাঈদ হত্যার সঙ্গে ৩০ জনের সম্পৃক্ততার বিষয় উঠে আসে| ২০২৫ সালের ২৪ জুন ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলির কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা|
এরপর ৩০ জুন অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল| একইসঙ্গে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়| পলাতক থাকা ২৪ আসামির জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চারজন আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়|
ওই বছরের ৬ অগাস্ট ৩০ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এই মামলার বিচারকাজ শুরু করে ট্রাইব্যুনাল-২| গত ২১ জানুয়ারি থেকে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রসিকিউশন এবং ২৭ জানুয়ারি আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়| এরপর গত ৫ মার্চ রায়ের দিন ঠিক করেছিল ট্রাইব্যুনাল|











































