Home জাতীয় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র : স্বপ্ন হলো সত্যি

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র : স্বপ্ন হলো সত্যি

0

খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
পাবনার রূপপুর-একসময়ে ছিল এক নিভৃত গ্রাম| সেখানেই দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দু| রাশিয়ার সহায়তায় নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিতে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়ামের ব্যবহার শুরু হয়েছে| এর মধ্য দিয়ে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় বিশ্বের ৩৩তম দেশের মর্যাদায় আসীন হলো বাংলাদেশ|
দীর্ঘ প্রায় ছয় দশকের পরিকল্পনা, প্রতিবন্ধকতা আর নানা বাধা পেরিয়ে বাস্তব রূপ পেয়েছে ¯^প্নের এই মেগাপ্রকল্প| এটি শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়; বরং বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এক অনন্য প্রতীক|
রূপপুর প্রকল্পের ইতিহাসের শুরু ১৯৬০-এর দশকে| ১৯৬১ সালে তখনকার পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়| সম্ভাব্য স্থান হিসেবে নির্বাচন করা হয় রূপপুরকে| তবে ১৯৬৯ সালে সেই পরিকল্পনা বাতিল করে আইয়ুব খান সরকার|
১৯৭১ সালে ¯^াধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের সময়ে প্রকল্পটি আবার আলোচনায় আসে| এ ব্যাপারে সহায়তার জন্য তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়ন সরকারের সঙ্গে প্রাথমিক যোগাযোগও হয়| তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি|
পরের কয়েক দশকে বিভিন্ন সরকার প্রকল্পটি পুনর্বিবেচনা করলেও অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি|
২০০০-এর দশকে দেশে বিদ্যুৎ সংকট তীব্র আকার ধারণ করলে পারমাণবিক শক্তির বিষয়টি আবার গুরুত্ব পায়| এর ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে অগ্রাধিকার দেয় রূপপুর প্রকল্পে|
পারমাণবিক এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ২০০৯ সালে ঢাকায় এবং ২০১০ সালে মস্কোতে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে কাঠামোগত চুক্তি সই হয়|

এরপর ২০১১ সালের ২ নভে¤^র ঢাকায় পারমাণবিক শক্তি কমিশন রোসাটমের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সইয়ের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক কাঠামো দাঁড়ায়|
এর আওতায় রোসাটম রূপপুরে মোট ২৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের দায়িত্ব পায়| চুক্তিতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জ্বালানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ উন্নয়নের কথাও উল্লেখ রয়েছে|
সমঝোতা স্মারকে সই করেন তখনকার বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি কমিশনের মহাপরিচালক এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী সের্গেই কিরিয়েংকো|
২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে প্রকল্পের নকশা, প্রযুক্তি নির্বাচন এবং ব্যয় কাঠামো চূড়ান্ত করা হয়| একই সময়ে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় ঋণের মাধ্যমে প্রকল্প অর্থায়নের বিষয়টি নির্ধারিত হয়| চূড়ান্ত প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) থেকেও অনুমোদন পায়|
২০১৬ সালে রূপপুর এলাকায় শুরু হয় মূল নির্মাণকাজ| ২০১৭ সালে প্রথম ইউনিটে ‘ফার্স্ট কংক্রিট’ ঢালাইয়ের মাধ্যমে বাস্তব নির্মাণ পর্ব শুরু হয়| এটি এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত|
২০১৮ সালে দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণকাজ শুরু হয়| দুটি ইউনিটের প্রতিটির উৎপাদনক্ষমতা ১২০০ মেগাওয়াট করে নির্ধারণ করা হয়|
২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রকল্প এলাকায় রিঅ্যাক্টর ভবন, টারবাইন হল, কুলিং সিস্টেমসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হয়| একই সময়ে ভারী যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রযুক্তি সংযোজনের কাজ চলে|

২০২৩ সালে রাশিয়া থেকে প্রথম পারমাণবিক জ্বালানি (নিউক্লিয়ার ফুয়েল) দেশে আসে| ওই বছরের ২৮ সেপ্টে¤^র আকাশপথে রাশিয়া থেকে ঢাকায় পৌঁছায় পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালান| এরপর আসে আরও কয়েকটি চালান| বিশেষ নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সড়কপথে অক্টোবরে সেগুলো নিয়ে যাওয়া হয় রূপপুরে|
২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প এলাকায় পারমাণবিক জ্বালানি পৌঁছানোর পরই পারমাণবিক স্থাপনা হিসেবে ¯^ীকৃতি পায় রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র| ওই বছরের ৫ অক্টোবর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের (আরএনপিপি) সনদ ও প্রতীকী জ্বালানি হস্তান্তর অনুষ্ঠান হয়| এতে ভার্চুয়ালি যোগ দেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ&লাদিমির পুতিন| রাশিয়ার ‘ফ্রেশ নিউক্লিয়ার ফুয়েল’ হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে ইউরেনিয়াম জ্বালানির যুগে প্রবেশ করে বাংলাদেশ|
২০২৪ থেকে ২০২৫ সময়কালে ইউনিটগুলোতে কমিশনিং ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়| সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এই কেন্দ্র থেকে ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ যোগ হবে জাতীয় গ্রিডে| দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ শতাংশ আসবে রুপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে|
রূপপুরের দুই ইউনিট পূর্ণমাত্রায় চালু হলে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে| এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যাবে, যা ২ কোটি মানুষের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করবে|
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী ১৫ থেকে ২১ আগস্টের মধ্যে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হবে| এরপর দুই মাসের মধ্যে এটি ৫০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হবে| আর ডিসে¤^রের শেষ বা ২০২৭ সালের জানুয়ারির শুরুতে ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা করছে কর্তৃপক্ষ |
রূপপুর প্রকল্পের ইতিহাস এক দীর্ঘ পথচলা| ছয় দশকের ¯^প্ন এখন বাস্তব| এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে সূচিত হয়েছে এক নতুন অধ্যায়|