-মোঃ আতিকুর রহমান মুফতি
দোর্দন্ড প্রতাপশালী মানুষ আফতাব চৌধুরী। ছোট সাহেব বললে এ অঞ্চলের লোকেরা এক নামেই তাঁকে চেনে। তার পিতামহ জমিদার মাহতাব চৌধুরী ছিলেন যেমন দাপুটে, তার চেয়ে বেশি সাহসী। সুন্দরবনে গিয়ে তার শিকার করা দুটি বাঘের চামড়া আজও বাড়ির বড়ঘরে দেয়ালজুড়ে শোভা পায়। করিন্থিয়-গ্রিক শৈলী অনুকরণে তৈরি প্রাসাদোপম বাড়িটি পিতামহ মাহতাবের উচ্চরুচির পরিচয় তুলে ধরে। আফতাবের পিতামহ মারাযান আশির দশকে, আর বাবাকে হারিয়েছেন পনের বছর হলো। বেশ কয়েক বছর পরে আজ বাড়িতে উৎসবের আমেজ। ছোট সাহেবের হাঁকডাক, আত্মীয়-স্বজনের উপস্থিতি আর কর্মচারিদের ব্যতিব্যস্ততার শেষ নেই। ছোট সাহবের ছেলে তথা চৌধুরী বাড়ির একমাত্র ছেলে ব্যরিস্টার সেলিমের বিয়ে হচ্ছে শিল্পপতি আনোয়ার ভুঁইয়ার একমাত্র মেয়ের সাথে।
আগামীকাল দুপুরের জমকালো ও নিখুঁত অনুষ্ঠান আয়োজনে ব্যস্ত সবাই। ১৯০৯ সালে তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের লক্ষ্ণৌয়ের দক্ষ কারিগরের তৈরি বিশেষ একটি শাড়ি পরে নতুন বউ এ বাড়িতে আসবে। ওই শাড়িটি পরেই আফতাব চৌধুরীর মা এবং দাদি এ বাড়িতে প্রথম এসেছিলেন। ছেলে ব্যরিস্টার সেলিমের জন্য কেনা পাঞ্জাবি-শেরোয়ানির সাথেই শাড়িটি যত্নকরে একসাথে রাখা আছে। আয়োজনে হঠাৎ কিছুটা ছেদ পড়লো! মাত্রই জানা গেলো বাইরে রাখা শাড়ি- পাঞ্জাবিগুলো ইঁদুরে কেটে নষ্ট করে ফেলেছে। সবটা শুনে অনেকটাই হতাশ হলেন ছোট সাহেব। মা-দাদির স্মৃতিতো নষ্ট হলোই, উপরন্তু পাকাকথার দিন হবু বউমাকে বিশেষ শাড়িটি পরার যে অনুরোধ করেছিলেন তাও এখন বড্ড বেমানান হলো। এই ইঁদুরের কারণেই গেল বছর শীতে বড়মাঠে হওয়া গমগুলোর পুরোটা ঘরে তোলা সম্ভব হয়নি। তার আগের বছর ওই মাঠ থেকেই প্রায় দেড় হাজার মন গম পাওয়া গিয়েছিলো। এবছর বর্গা দেওয়া সবজির ক্ষেতেও নাকি ইঁদুরের বেশ উপদ্রপ হচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে।
যাই হোক না কেন, রাতের মধ্যে নতুনকরে শাড়ি-শেরোয়ানি কেনা হলো। ধুমধামের সাথে বিয়ের দিনগুলো কাটলো। লক্ষী বউমা পেয়েছেন ছোট সাহেব। বাড়িময় বউমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ সবাই। যেমন তার গুন, তেমন তার বিদ্যা-বুদ্ধি। দেশের পড়ালেখা শেষ করে অক্সফোর্ড থেকে এগ্রিকালচারাল এনটোমোলজির ওপর পিএইচডি করেছে সে। এক সন্ধ্যায় চিন্তিত শ্বশুরকে বাইরের ঘরে মনমরা হয়ে বসে থাকতে দেখে বউমা কাছে এসে বসলো। শ্বশুরের দুশ্চিন্তার কারণ শুনে একটু হেসে বলতে শুরু করলো সে।
বাংলাদেশের কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্যমতে, দেশে প্রতিবছর প্রায় ১০ শতাংশ ধান ও চার থেকে ১২ শতাংশ গম ইঁদুরের কারণে নষ্ট হয়, যার মূল্য টাকার অংকে প্রায় পাঁচশত কোটি। আমন ধানের শতকরা পাঁচ থেকে সাত ভাগ, গম ফসলের চার থেকে বারো ভাগ, গোল আলুতে পাঁচ থেকে সাত ভাগ এবং আনারস ছয় থেকে নয় ভাগ নষ্টের পেছনেও রয়েছে প্রাণিটি। ইঁদুর প্রতিদিন তার দেহের ওজনের দশভাগের একভাগ পরিমাণ খাবার গ্রহণ করে, আর নষ্ট করে তার কয়েকগুন। ইঁদুরের কারণে কেবল বাংলাদেশেই ৫০-৫৪ লাখ লোকের এক বছরের খাবার নষ্ট হয়।
একই সাথে সারাবিশ্বেই প্রাণিটির উৎপাত রয়েছে। ২০২১ সালের মধ্য-মার্চে অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসে বিগত এক যুগের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ইঁদুরের আক্রমণকে সেখানকার কর্তৃপক্ষ ‘অর্থনৈতিক ও জনস্বাস্থ্য সংকট’ হিসেবে অভিহিত করে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য পঞ্চাশ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। এসময় ইঁদুরের আক্রমনে কৃষকের শতভাগ ফসলহানি ছাড়াও স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। এমনকি অতিষ্ঠ হোটেল মালিকরা তাদের ব্যবসাও বন্ধ করে দেন। আবার বছর কয়েক আগে নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদু বুহারি লন্ডনে কয়েক মাস চিকিৎসাধীন থাকাকালে রাজধানী আবুজাতে তার সরকারি দপ্তরটির বিভিন্ন আসবাবপত্র ইঁদুর এমনভাবে তছনছ ও ক্ষতিগ্রস্ত করেছিলো যে, দেশে ফিরে তিনি কিছুকাল বাড়ি থেকে অফিস করতে বাধ্য হন।
অবিরত কাটাকুটি ছাড়াও ক্রমাগত বিষ্ঠা ত্যাগ করে ইঁদুর মাঠ ও গুদামজাত ফসল, গৃহস্থালি সামগ্রী, বাণিজ্যিক স্থাপনা, কৃষি খামার, কলকারখানা, গবাদিপশুর খামার ইত্যাদিতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে আনে। ইঁদুরের দ্বারা মানুষ ও পশুপাখির দেহে লেপ্টোস্পাইরোসিস, প্লেগ, স্ক্রাব ও মিউরিন টাইফাসসহ ৩০ প্রকারের বেশি প্রাণঘাতী রোগ ছড়ায়। উপযুক্ত পরিবেশে একজোড়া ইঁদুর থেকে এক বছরে বংশবৃদ্ধি পেয়ে দুই হাজার থেকে তিন হাজার ইঁদুরের জন্ম হতে পারে। একটি স্ত্রী ইঁদুরের বয়স তিনমাস পূর্ণ হলে বাচ্চা দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করে এবং বাচ্চা প্রসবের দুইদিন পরেই আবার গর্ভধারণ করতে পারে। প্রাণিটি যেখানেই থাকবে সেখানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতি বয়ে আনবে। তাই ইঁদুর দমনের বিকল্প নেই। এর দমন ব্যবস্থাপনাকে প্রধানত দুইভাবে ভাগ করা যায়। অরাসায়নিক বা পরিবেশসম্মত দমন এবং বিষ প্রয়োগ বা রাসায়নিক দমন। চাষের জমি তৈরির সময় ন্যূনতম ১৮ ইঞ্চি গভীর করে চাষ দিয়ে, আইল ছেঁটে ছোট বা চিকন রেখে, আইলের সংখ্যা কমিয়ে, নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার করে, ইঁদুর-সৃষ্ট গর্ত দূর করে প্রাণিটি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। কৃষকেরা নিজস্ব উদ্ভাবনী কায়দায় বাঁশ, কাঠ, টিন ও লোহার তৈরি ফাঁদ কিংবা বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন ফাঁদ ব্যবহার করে কার্যকরভাবে ইঁদুর দমন করেন। এ সমস্ত ফাঁদে টোপ হিসেবে শুঁটকি মাছ, নারিকেলের টুকরা, কলা, বিস্কুট, রুটি, আম, আলু, চালভাজা ইত্যাদির সাথে কার্বন ডাইসালফাইড মিশ্রিত করে ব্যবহার করলে দ্রুত ভালো ফল পাওয়া যায়। পানির উৎস সহজ হলে ইঁদুরের গর্তে পানি ঢেলে শ্বাসরোধ করে বা পিটিয়ে ইঁদুর নিধন বেশ কার্যকরী। ফসল কর্তনের পর মাঠে বা ক্ষেতের আইলের গর্তের মাটি খুঁড়ে ইঁদুর নিধন করা যায়। দালানকোঠা, ঘরবাড়ি ও খাদ্যগুদামে দরজা-জানালা, গ্রিল, পাইপের খোলা মুখ ও অন্যান্য ইঁদুর প্রবেশ উপযোগীস্থানের ফাঁক-ফোকরে ধাতবপাত বা তারজালি লাগিয়ে ইঁদুর প্রবেশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে হবে। এর উপদ্রব থেকে রেহাই পেতে নারিকেল, সুপারিসহ অন্যান্য ফলদ বৃক্ষে মাটি থেকে দুই-তিন মিটার উপরে গাছে খাঁড়া কারে চারদিকে ৪৫-৬০ সেমি চওড়া টিনের মসৃণ পাত শক্ত করে আটকাতে হবে যাতে ইঁদুর উপরে উঠতে না পারে। পরভোজী প্রাণির মধ্যে দিবাচর শিকারি পাখি যেমন- ঈগল, তিলা বাজ, হেরিয়াল চিল; নিশাচর শিকারি পাখি যেমন- লক্ষী পেঁচা, ব্রাউন হক আওল ; স্তন্যপায়ী প্রাণী যেমন- বনবিড়াল, মেছো বিড়াল, পাতি শিয়াল, খেঁকশিয়াল, বাগডাস, বেজি; সরীসৃপ যেমন- সাপ, গুইসাপ ইত্যাদি দৈনিক উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইঁদুর শিকার করে ইঁদুরের আধিক্য কমায়। আমাদের নিজেদের স্বার্থে এসব ইঁদুরভূক উপকারী প্রাণিকুলের নির্বিচার নিধনবন্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ইঁদুর নিধনে রাসায়নিক পদ্ধতি যেমন:তীব্র বা তাৎক্ষণিক বিষ, দীর্ঘমেয়াদি বিষ, ট্র্যাকিং পাউডার, ধূম্রবিষ/গ্যাস বড়ি, বিকর্ষক বা বিতাড়ক দ্রব্যের ব্যবহার, রাসায়নিক বন্ধ্যাকারক বা প্রজনন নিবারকের ব্যবহার করে ইঁদুরের ক্ষতি থেকে বাঁচা সম্ভব।
ছোট সাহেবের নতুন বউমা আরও জানায় যে, দক্ষিণ এশিয়ার কৃষিতে ইঁদুরের ক্ষতিকর প্রভাব ও এর থেকে প্রতিকারের উপায় বিষয়েই তার পিএইচডির গবেষণা ছিলো। প্রাণিটি দমনের পদ্ধতিগুলো বাস্তবে প্রয়োগেরক্ষেত্রে সে আরও পরামর্শ দিতে পারবে। ছোট সাহেব বুঝলেন ইঁদুর দমনে একক ভাবে নয় বরং এলাকার সকলকে নিয়ে কাজ করতে হবে। তাই আগামী শুক্রবার বিকেলে অঞ্চলের সকল কৃষককে নিয়ে হাইস্কুল মাঠে একটি মিটিং করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। সেখানে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা ও ইঁদুর দমনে সফল ব্যাক্তিরা পরামর্শ দেবেন ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করবেন। বিশেষজ্ঞ হিসেবে বউমাও সেখানে থাকতে পারে। এভাবে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ইঁদুরের ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবে কৃষকের ফসলসহ মানুষের প্রয়োজনীয় অনেক কিছু।
লেখক: মোঃ আতিকুর রহমান মুফতি, সহকারী তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, খুলনা।/ পিআইডি ফিচার









































