Home Lead আকাশে মেঘ জমলেই বুক কাঁপে উপকূলের মানুষের: শত কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভাঙনঝুঁকিতে!

আকাশে মেঘ জমলেই বুক কাঁপে উপকূলের মানুষের: শত কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভাঙনঝুঁকিতে!

4


স্টাফ রিপোর্টার।।
বর্ষা মৌসুম শুরু হতেই আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের চিরচেনা আতঙ্ক ‘বেড়িবাঁধ ভাঙন’। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় নদ-নদীর তীব্র স্রোত, অস্বাভাবিক জোয়ারের চাপ এবং ঢেউয়ের আঘাতে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে শতাধিক কিলোমিটার ওয়াপদা বেড়িবাঁধ। কোথাও দেখা দিয়েছে বিশাল ফাটল, কোথাও আবার নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বাঁধের মূল অংশ। যেকোনো মুহূর্তে বাঁধ ভেঙে লবণাক্ত পানিতে বিস্তীর্ণ জনপদ প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কায় চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে নদীপাড়ের লাখো মানুষের।


ভিটেমাটি হারানোর উপক্রম ও স্থানীয়দের দীর্ঘশ্বাস: খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী ইউনিয়নের ঝপঝপিয়া নদীর তীরে এখন আতঙ্কই যেন সাধারণ মানুষের নিত্যসঙ্গী। নদীর পাড় ঘেঁষে প্রতিনিয়ত ভাঙছে বেড়িবাঁধ। বাঁধের পাশে দাঁড়িয়ে আক্ষেপের সুরে কথা বলেন স্থানীয় বাসিন্দা রোকেয়া বেগম। গত পাঁচ বছরে তিন দফা নদীভাঙনে নিজের বসতভিটা হারিয়েছেন তিনি। নতুন করে ভাঙন শুরু হওয়ায় আবারও অনিশ্চয়তার মুখে তাঁর পরিবার। রোকেয়া বেগম বলেন, “আগের ভাঙনে সব হারাইছি। অনেক কষ্টে আবার ঘর তুলছি। এখন আবার বাঁধ ভাঙতেছে। রাত হলেই ভয় লাগে, কখন কী হয়।”


শুধু পানখালী নয়, দাকোপ উপজেলার জাবেরের খেয়াঘাট, লক্ষ্মীখোলা ও নলডাঙ্গাসহ অন্তত ১০টি পয়েন্টে অব্যাহত রয়েছে ভাঙন। এ ছাড়া পাইকগাছার দেলুটি ও লতা ইউনিয়ন এবং কয়রার মহেশ্বরীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় নদীর পাড় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল গফুর বলেন, “জোয়ারের সময় ঘুম আসে না। বাঁধ ভেঙে গেলে ঘের, জমি, বাড়িঘর সব শেষ হয়ে যাবে। তাই প্রায়ই রাত জেগে আমাদের বাঁধের অবস্থা পাহারা দিতে হয়।” আকাশে মেঘ দেখলেই আইলা ও আম্পানের সেই নারকীয় স্মৃতির কথা মনে করে আঁতকে ওঠেন পানখালীর রহিমা খাতুন।


স্থায়ী সমাধানের অভাব ও শত কোটি টাকার অপচয়: উপকূলবাসীর অভিযোগ, বছরের পর বছর একই স্থানে ভাঙন দেখা দিলেও স্থায়ী কোনো সমাধান হচ্ছে না। সাময়িক বালুর বস্তা (জিও ব্যাগ) ফেলে মেরামতের পর কিছুদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও পরবর্তী বর্ষায় আবারও দেখা দেয় একই সমস্যা। ফলে প্রতিটি বর্ষা মৌসুমই তাদের কাছে নতুন দুর্যোগের বার্তা নিয়ে আসে।


খুলনার পাশাপাশি বাগেরহাটের শরণখোলা এবং সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নেও তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র খুলনা জেলাতেই প্রায় ৪০ কিলোমিটার বাঁধ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আর বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় আরও ৬০ কিলোমিটারের বেশি বেড়িবাঁধ চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তিন জেলা মিলিয়ে পাউবোর প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার বেড়িবাঁধের একটি বড় অংশই নিয়মিত সংস্কারহীনতায় জরাজীর্ণ।


বিশেষজ্ঞদের মতামত ও টেকসই পরিকল্পনার তাগিদ: দেশের খ্যাতনামা জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত মনে করেন, উপকূলীয় এলাকার বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সঠিক নকশা প্রণয়ন না করায় অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। তাই উপকূল সুরক্ষায় জোড়াতালির মেরামত বন্ধ করে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।”


পানি উন্নয়ন বোর্ডের আশ্বাসের বাণী: তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় মাঠ পর্যায়ে কাজ চলছে বলে দাবি করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জহির মাজহার বলেন, “ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে আপদকালীন সংস্কার ও মেরামত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি দক্ষিণ উপকূলকে সুরক্ষিত করতে টেকসই ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণে কয়েকটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”


প্রতি বছর উপকূল রক্ষায় নতুন নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়, সরকারের শত শত কোটি টাকা ব্যয়ও হয়। কিন্তু নদীপাড়ের মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন- ‘এই বর্ষায় বাঁধ টিকবে তো?’ কারণ বাঁধ ভেঙে গেলে শুধু মাটির কাঠামো ভাঙে না, ভেঙে পড়ে মানুষের স্বপ্ন, জীবিকা আর বেঁচে থাকার নিরাপত্তাবোধও। তাই সাময়িক সংস্কারের গণ্ডি পেরিয়ে উপকূলের মানুষের এখন একটাই দাবি- দীর্ঘস্থায়ী ও ব্লক দিয়ে বাঁধানো টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ।