Home আঞ্চলিক মালাই চা ও পোড়া রুটির স্বাদ নিতে ভিড়

মালাই চা ও পোড়া রুটির স্বাদ নিতে ভিড়

214


নিজস্ব প্রতিনিধি
কুষ্টিয়া সদর উপজেলার লাহিনি ব্রিজ সংলগ্ন জাফর মামার বিখ্যাত মালাই চা ও পোড়া রুটির দোকান। বেশ কয়েকটি বড় হাঁড়িতে মণ মণ দুধ জ্বাল দেওয়া হচ্ছে চা প্রস্তুত করার জন্য। একপাশে পাউরুটিতে মধু ও চিনির রস মাখিয়ে আগুনে পুড়িয়ে পোড়া রুটি তৈরি করতে ব্যস্ত আছেন জাফর মামা। জিকে ক্যানেল সংলগ্ন রাস্তার পাশে বসার জন্য সারিবদ্ধভাবে সাজানো হয়েছে চেয়ার টেবিল। দোকানে সবসময় লোকজনের ভিড় লেগে থাকে। এই এক কাপ স্পেশাল চা বানাতে সময়ও লেগে যায় প্রায় পাঁচ থেকে সাত মিনিট করে। খুব যত্ন করে এখানে চা বানানো হয়। ফলে এই দোকানের চায়ের স্বাদও অন্যান্য যেকোনো দোকানের চেয়ে আলাদা। তাছাড়া এই দোকানের পোড়া রুটির যে স্বাদ তা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। দুধ চা ও চিনি দিয়ে কিংবা মধু দিয়ে পোড়ানো পাউরুটি দেদারছে বিক্রি করেন জাফর মামা। তার দোকানে বিশেষ ধরনের চা ও পাউরুটি বিক্রির খবর দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। দিন-রাত চা ও পাউরুটি খেতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আসেন জেলা-উপজেলা শহর থেকে। কুষ্টিয়া বাস টার্মিনাল থেকে ইজিবাইক করে ১০ টাকা ভাড়া দিয়ে প্রথমে লাহিনি নামক স্থানে আসতে হবে। এরপর ইজিবাইক থেকে নেমে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই জাফর মামার সর চা ও পোড়া রুটির দোকান দেখিয়ে দেবে। আবার লাহিনিতে নেমে ২ মিনিট হাঁটলেই ব্রিজ দেখতে পাবেন। আর এই ব্রিজের সঙ্গেই অবস্থিত মালাই চা ও পোড়া রুটির দোকান। আশেপাশে বেশ কিছু মালাই চা ও পোড়া রুটির দোকান গড়ে উঠেছে। তবে জাফর মামার দোকানের সর চা ও পোড়া রুটির যেন স্বাদই আলাদা। ভেড়ামারার আ. রাজ্জাক বলেন, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে চা খেতে এসেছি। দোকানে খুব ভিড়। প্রায় আধা ঘণ্টা আগে সিরিয়াল দিয়ে চা হাতে পেয়েছি কিছুক্ষণ হলো। মানুষের মুখে শুনে এখানে এসেছি। আজকে ভালো লাগলে আগামীতে বন্ধুরা দলবেঁধে চা খেতে আসব। পাবনা থেকে আসা মামুনুজ্জামন মামুন বলেন, শুনেছি জাফর মামার চায়ের স্বাদ অস্বাভাবিক। তাই চা খেতে ছুটে এসেছি। তবে সত্যিই অন্য চায়ের চেয়ে এই চা অনেক অনেক গুণে বেশি ভালো। দেখা গেছে প্রতিদিন বিকেলে আশেপাশের এলাকার মানুষ দলবেঁধে এখানে চা খেতে আসেন। চায়ের ব্যবসা করে সফল ও সচ্ছল হয়েছেন জাফর মামা।

দিনাজপুর থেকে আসা শিক্ষক আমিরুল ইসলাম বলেন, নদীর পাশে বসে দুধ চা আর পোড়া পাউরুটি খাওয়ার অনুভূতি আসলে বলে বোঝানো যাবে না। চায়ের স্বাদ আর প্রাকৃতিক পরিবেশ খুবই ভালো লাগে। চিনি দিয়ে পাউরুটি পুড়িয়ে চায়ের সঙ্গে পরিবেশন করেন তিনি। তার এই খাবারের পদটি এত জনপ্রিয় হয়েছে যে, খাবারের স্বাদ নিতে ভোজন রসিকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতেও রাজি। তাই বন্ধুদের সঙ্গে এখানে চা খেতে এসেছি।
জাফর ইসলাম (৩৫) কুষ্টিয়া পৌরসভার ২১ নম্বর ওয়ার্ডের লাহিনি পশ্চিমাপাড়ার মৃত খবির উদ্দিনের ছেলে। অভাবের সংসার ছিল তাদের। অর্থকষ্টে চতুর্থ শ্রেণির গণ্ডি পার হতে পারেননি। সংসারে সচ্ছলতা আনতে ছোট্ট বয়সেই ট্রাকের হেলপারের কাজ শুরু করতে হয়। কিন্তু সংসারে অভাব কোনোভাবেই দূর হচ্ছিল না। একপর্যায়ে চা বিক্রি শুরু করেন তিনি। এই চা তার ভাগ্য বদল করে দিয়েছে। খুলনা থেকে আসা আব্দুর সাত্তার বলেন, নদীর পাশে সুন্দর পরিবেশে দুধ চা ও পোড়া পাউরুটি খেতে খুবই ভালো লাগল। আমরা মাঝে মধ্যেই এখানে আসব। ব্যস্ততম এই চায়ের দোকানে গিয়ে দেখা যায়, জাফর মামা চা তৈরি ও পাউরুটি পোড়ানোর কাজে ব্যস্ত। চুলার পাশে তাকে ঘিরে রেখেছেন ক্রেতারা। তারা কেউ পাউরুটি, কেউ চা, কেউ কাচের কাপ, কেউ নারকেলের মালাই চায়ের অর্ডার দিচ্ছেন। দোকানে একজন কর্মচারী ও জাফর। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষার পরে চা-পাউরুটি হাতে পেয়ে কেউ চুমুক দিচ্ছেন, কেউ সেলফি তুলছেন। চা বিক্রেতা জাফর ইসলাম বলেন, আমার জন্মেরও আগে থেকেই বাবা লাল চা বিক্রি করতেন। বাড়ির সামনে ছোট্ট একটা চায়ের দোকান ছিল। বাবার উপার্জনের অর্থে আমাদের সংসার ভালো চলত না। অভাব-অনটনের কারণে চতুর্থ শ্রেণির পরে আর পড়ালেখা করা হয়নি। ১২ বছর বয়সে ট্রাকের চালক আপন মেজভাইয়ের সঙ্গে হেলপার হিসেবে কাজ শুরু করি। ২০০৭ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ট্রাকের হেলপারি করেছি। এরপর ২০১০ সালে আব্বা স্ট্রোক করে মারা যান। এর ২ মাস পরে পরিবারের সিদ্ধান্তে বাবার ছোট্ট দোকানে চা বিক্রি শুরু করি। ২০১৩ সালে অল্প-অল্প করে দুধ চা বিক্রি শুরু করি। সেই সময় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ২ হাজার টাকার মতো বিক্রি হতো। প্রতিদিন ৩০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা লাভ হতো। ২০২০ সাল পর্যন্ত বাড়ির সামনেই চা বিক্রি করতাম। এরপর লাহিনি জিকে ক্যানাল পাড়ে এই চায়ের দোকান দিয়েছি। এই ব্যবসার খবর ফেসবুক, বিভিন্ন চ্যানেল ও নানা পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ায় আমি ভাইরাল হয়ে গেছি। আল্লাহর রহমতে এখন ভালোই চলছে ব্যবসা। তিনি আরো বলেন, ক্যানাল পাড়ে গত চার বছর আগে চায়ের দোকান দিয়ে সংসার চালাচ্ছি। নিজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে চিনি দিয়ে পাউরুটি পোড়ানো ও চা তৈরি করি। প্রতিদিন প্রায় ৩০ কেজি দুধ দিয়ে চা তৈরি করি। আশেপাশের ও দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আমার দোকানে চা খেতে আসেন। বিকেল থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত চা-প্রেমীদের ভিড় থাকে। তবে ছুটির দিনে চায়ের চাহিদা বেড়ে যায়। পরিমাণ ভেদে প্রতি কাপ চা ২৫ টাকা থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হয়। প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার টাকার বিক্রি হয়। স্ত্রী আর এক ছেলে সন্তানকে নিয়ে আমাদের সংসার এখন সুখে-শান্তিতে চলছে। কুষ্টিয়ার সৌন্দর্যের মাঝে এক কাপ ঘন সর চায়ের সঙ্গে একটি পোড়া পাউরুটি আপনার মনের প্রশান্তিকে পুনরায় জাগিয়ে তুলতে সহায়তা করবে। তাই আপনিও আপনার পরিবার-পরিজন নিয়ে চলে আসতে পারেন জাফর মামার চা খেতে। সেই সঙ্গে কুষ্টিয়ার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।