Home সম্পাদকীয় শব্দদূষণে ঢাকায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি: কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই

শব্দদূষণে ঢাকায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি: কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই

30

আমাদের প্রাণ-প্রকৃতি এবং পরিবেশ নানাভাবে মারাত্মক দূষণের শিকার হচ্ছে। কিন্তু যারা এগুলোর দেখাশোনার দায়িত্বে রয়েছেন, তাদের এ নিয়ে তেমন কোনো উদ্বেগ আছে বলে মনে হয় না।
ন্যূনতম পরিবেশজ্ঞান যাদের রয়েছে, তাদের সবার জানা- শব্দদূষণ একটি নীরব ঘাতক। অথচ আমাদের রাজধানী শহরে শব্দদূষণ দিন দিন বাড়ছে বৈ কমছে না। বেসরকারি এক গবেষণার তথ্য-উপাত্ত বলছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে শব্দের তীব্রতা মানমাত্রা ছাড়িয়েছে। স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) ওই গবেষণায় উঠে এসেছে, আগে রাজধানীতে গড়ে ১২ ঘণ্টা সময় ধরে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি মাত্রায় শব্দদূষণ হতো। এখন ১৪ ঘণ্টা ছাড়িয়ে গেছে। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে দেখাশোনাকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিবেশ অধিদফতরও ঢাকার দূষণের বিস্তৃতি বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি জানে। তবু এর নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ তেমন নেই।
শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬ অনুযায়ী, ঢাকার জন্য দিনের বেলায় শব্দের আদর্শ মান (সর্বোচ্চ সীমা) ৬০ ডেসিবেল। গবেষণার উপাত্ত বলছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে শব্দের তীব্রতা মানমাত্রা ছাড়িয়েছে নগরের বিভিন্ন স্থানে সাধারণভাবে শব্দের গ্রহণযোগ্য মানমাত্রার থেকে প্রায় ১ দশমিক ৩ থেকে ২ গুণ বেশি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় শব্দের গড় মাত্রা পাওয়া গেছে ৭৬ দশমিক ৮০ ডেসিবেল। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে শব্দের গড় মাত্রা পাওয়া গেছে ৮০ দশমিক ৫৬ ডেসিবেল। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ঢাকার শব্দদূষণের সময়ের বিস্তৃতি বেড়ে যাওয়া।
চিকিৎসকদের মতে-শব্দদূষণের ফলে শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া, বধিরতা, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, কম ঘুম হওয়া, হৃদরোগ, শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা বিঘ্ন হওয়াসহ নানা রকম সমস্যা দেখা দেয়। স্বল্পমেয়াদি শব্দদূষণ মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। আর দীর্ঘমেয়াদি শব্দদূষণ শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত করে। শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ায় বিরক্তি, নেতিবাচকতা, রাগ, ক্লান্তি, চাপা উত্তেজনা, মানসিক চাপ, বিষণ্নতা, সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিহার, ব্যক্তিগত ঝুঁকি বাড়ায় এবং স্মৃতিশক্তি ও নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা হ্রাস পায়। অন্যদিকে উচ্চ শব্দ শিশু, গর্ভবতী মা, হৃদরোগীর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। শব্দদূষণে শিশুদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, আকস্মিক উচ্চ শব্দ মানবদেহের রক্তচাপ ও হৃৎকম্পন বাড়িয়ে দেয়, মাংসপেশীর সঙ্কোচন করে, পরিপাকে বিঘ্ন ঘটায়, শিরা ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর প্রচণ্ড চাপ দেয়।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারি দফতরগুলোর মধ্যে কাজ করছে পরিবেশ অধিদফতর। প্রতিষ্ঠানটি ‘শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও অংশীদারিত্বমূলক প্রকল্প’ নামের একটি প্রকল্প পরিচালনা করছে। ঢাকা নগরের শব্দদূষণে প্রধান উৎস যানবাহন। এর তদারকির কাজে আছে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। বায়ুদূষণ বা শব্দদূষণ রোধে ধারাবাহিক তৎপরতা থাকতে হবে।
রাজধানীতে শব্দদূষণের কারণে স্বাস্থ্য সমস্যা প্রকট হয়ে উঠছে। এ জন্য ঢাকাবাসী জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। ২০১৯ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরের ট্রাফিক পুলিশের ২০ শতাংশ মারাত্মক বধিরতার সমস্যায় ভুগছেন। ঢাকার চারটি এলাকায় দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের ১০০ সদস্যের ওপর পরিচালিত গবেষণায় যারা বধিরতার সমস্যায় ভুগছেন তাদের হৃদরোগের ঝুঁকিও রয়েছে বলে ওই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকার শব্দদূষণের উৎসগুলো কী তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পরিষ্কার। ঢাকায় শব্দদূষণের ক্ষেত্রে যেসব উৎসের কথা বলা হয়েছে সেগুলো হলো সাধারণত যানবাহন চলাচলের শব্দ; যথা- হর্ন, ইঞ্জিন, চাকার ঘর্ষণ ও কম্পনের শব্দ, নির্মাণকাজ যেমন ইট ও পাথর ভাঙার মেশিন ও টাইলস কাটার মেশিন থেকে শব্দ, ভবন ভাঙার শব্দ, কলকারখানার শব্দ, জেনারেটরের আওয়াজ, সামাজিক নানা অনুষ্ঠানের মাইকিংয়ের বিকট শব্দ।
আমরা মনে করি, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিবেশ অধিদফতর রাজধানীর শব্দদূষণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নগরবাসীর প্রত্যাশা, যত দ্রুত সম্ভব, তা যেন নেয়া হয়। তা না হলে এই শব্দদূষণের কারণে ঢাকাবাসীর জনস্বাস্থ্যে নেমে আসতে পারে বিপর্যয়।