যশোর অফিস।।
যশোরের অভয়নগরে দুটি গ্রামীণ সড়ক পাকা করার কাজ শেষ না করেই ঠিকাদারের বিরুদ্ধে জামানতের টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ৬ কোটি ৪৫ লাখ ৪২ হাজার ৯৭৬ টাকা ব্যয়ে সড়ক দুটি পাকা করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। সড়ক দুটি হলো উপজেলার প্রেমবাগ ইউপি-মাগুরা জিসি রোড এবং চেঙ্গুটিয়া বাজার-শ্রীধরপুর ইউপি অফিস রোড। ঠিকাদার-এলজিইডির টানাপোড়েনে সড়ক দুটির কাজ শেষ না হওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় লোকজন।
রাজশাহীর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স প্যারাডাইস ট্রেডার্স এ কাজ পেয়েছে। দরপত্রের মাধ্যমে কাজ পাওয়ার পর সড়ক দুটির কাজ শুরুও করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু কয়েক মাস কিছু কাজ করার পর আর কাজ এগোয়নি। এ অবস্থায় কাজের সময়সীমা পার হয়ে যায়। তবে কাজ না করলেও ঠিকাদার সড়ক দুটির কাজের জামানতের প্রায় ৩২ লাখ ২৭ হাজার ১৪৮ টাকা তুলে নিয়েছেন। তবে দরপত্রের নিয়মানুযায়ী, জামানতের এই টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা।
অভয়নগর এলজিইডি সূত্র জানায়, এলজিইডি যশোর অঞ্চল গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (জেআরআরআইডিপি) আওতায় এ দুটি সড়ক পাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ৪ কোটি ৩৮ লাখ ৫৫ হাজার ২৬৬ টাকা ব্যয়ে প্রেমবাগ ইউপি-মাগুরা জিসি রোডের ৪ কিলোমিটার ৩০৫ মিটার এবং ২ কোটি ৬ লাখ ৮৭ হাজার ৭১০ টাকা ব্যয়ে চেঙ্গুটিয়া বাজার-শ্রীধরপুর ইউপি অফিস রোডের ২ কিলোমিটার ৩৭০ মিটার পাকা হচ্ছে।
এলজিইডির যশোর কার্যালয় সূত্র জানায়, নিয়মানুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না করতে পারলে ঠিকাদার কাজের সময়সীমা বাড়ানোর জন্য আবেদন করেন। সে অনুযায়ী একটি যৌক্তিক সময়সীমা বাড়ানো হয়। কিন্তু কাজের সময়সীমা বাড়ানোর আগে ঠিকাদারের জামানতের মেয়াদ বাড়াতে হয়। সড়ক দুটির কার্য সম্পাদন জামানতের মেয়াদ ছিল ২০২১ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এ সময়ে ঠিকাদার সড়ক দুটির মাত্র ৫ শতাংশ কাজ করেছেন। তিনি সড়ক দুটির কাজের সময়সীমা বাড়ানোর কোনো আবেদন করেননি। তাঁকে সম্পাদিত কাজের কোনো বিল দেওয়া হয়নি।
সড়ক দুটির কাজের জামানত ছিল ৩২ লাখ ২৭ হাজার ১৪৮ টাকা। ঠিকাদার সড়ক দুটির কার্য সম্পাদন জামানতের বিপরীতে ব্যাংক গ্যারান্টি দিয়েছিলেন মধুমতি ব্যাংক পাবনা শাখা থেকে।
সূত্র জানায়, জামানতের বিপরীতে দেওয়া ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়ন করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার লক্ষ্যে গত ১৯ ও ৩০ অক্টোবর মধুমতি ব্যাংক পাবনা শাখার ব্যবস্থাপককে চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু ব্যাংক থেকে চিঠি দিয়ে জানানো হয়, সড়ক দুটির কার্য সম্পাদন জামানতের সময়সীমা শেষ হওয়ায় ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়নের কোনো সুযোগ নেই। সর্বশেষ গত ১০ নভেম্বর তিন কার্যদিবসের মধ্যে ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়নের জন্য বলা হয়। কিন্তু ব্যাংক কার্য সম্পাদন জামানতের বিরুদ্ধে দেওয়া ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়ন করেনি। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স প্যারাডাইস ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী তাজুল ইসলাম বলেন, ‘এলজিইডি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জামানতের বিপরীতে দেওয়া গ্যারান্টি নগদায়ন করেনি। এ জন্য তা তামাদি হয়ে যায়। এই অবস্থায় ব্যাংক আর এলজিইডিকে টাকা দেয়নি। জামানতের ব্যাংক গ্যারান্টি তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নগদায়ন হয়ে আমার নির্ধারিত অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে। এ ব্যাপারে আমার কোনো দায় নেই।’ তবে এলজিইডির যশোর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী এ কে এম আনিসুজ্জামান বলেন, ‘অফিস রিলিজ না করলে কার্য সম্পাদন জামানতের ব্যাংক গ্যারান্টির টাকা তোলা যায় না। ওই টাকা ঠিকাদার তুলতে পারেননি। টাকা ব্যাংকে আছে। আমরা ব্যাংক গ্যারান্টির টাকা নগদায়নের জন্য ব্যাংকে চিঠি দিয়েছি। কিন্তু ব্যাংক নগদায়ন করছে না। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংককে জানানো হবে।’ এলজিইডির কোনো অবহেলা ছিল না দাবি করে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি জানতে পেরে আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিয়েছি।’
এদিকে মধুমতি ব্যাংক পাবনা শাখার ব্যবস্থাপক আবদুল্লাহ আল মাহামুদ বলেন, ‘জামানতের একটা মেয়াদ থাকে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি না করলে জামানতের ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়ন হয়ে পার্টির অ্যাকাউন্টে চলে যায়। যশোর এলজিইডি অফিস জামানতের টাকা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি করেনি। এ জন্য ওই টাকা পার্টির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে চলে গেছে। এর তিন মাস পর যশোর এলজিইডি অফিস জামানতের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আমাদের চিঠি দিয়েছে। বিষয়টি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে জানানো হয়েছে।’
জনগণের দুর্ভোগ: এদিকে ঠিকাদার-এলজিইডির এই টানাপোড়েনে সড়ক দুটির কাজ শেষ না হওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় লোকজন। সম্প্রতি সড়ক দুটি সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, প্রেমবাগ ইউপি-মাগুরা সড়কটির বেশির ভাগ অংশ এবড়োখেবড়ো হয়ে আছে। উঁচু-নিচু সড়কটি ভরে আছে ধুলা-বালুতে। জায়গায় জায়গায় ছোট-বড় খানাখন্দে। সড়কের কিছু অংশে ইট বিছানো ছিল। ইট উঠে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কোথাও কোথাও কোনো ইট নেই। সড়কের বিভিন্ন জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে ছোট ছোট ছয়-সাতটি কালভার্ট। বনগ্রাম গ্রামের কৃষক আবদুল হাকিম সরদার বলেন, ‘শুনেছি দুই বছর আগে রোডটি পাস হয়েছে। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। বর্ষার সময় কাদায় রাস্তা দিয়ে চলাচল করা যায়নি। এখনো রাস্তা দিয়ে চলাচলের মতো অবস্থা নেই।’ চেঙ্গুটিয়া বাজার-শ্রীধরপুর ইউপি অফিস সড়কে গিয়ে দেখা গেছে, সড়কটির রাঙ্গার হাটের পশ্চিম পাশ থেকে মথুরাপুর মোড়লপাড়া পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার খুঁড়ে ইটের খোয়া ও বালু দিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে। সড়কের ওই অংশ সমান করা হয়নি। সড়কের অবশিষ্ট অংশ উঁচুনিচু হয়ে আছে। সড়কের কোথাও কোথাও ছোটবড় গর্ত হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে আছে।









































