Home সম্পাদকীয় প্রযুক্তির কল্যাণে মঙ্গা নামের ভূত পরাস্ত!

প্রযুক্তির কল্যাণে মঙ্গা নামের ভূত পরাস্ত!

153

 

২০৩০ সালের মধ্যে কৃষিতে এসডিজি অর্জনে একই জমিতে বেশি করে ফসল ফলানোর বিকল্প নেই। এসডিজি অর্জনে বর্তমানের চেয়ে ২০৩০ সারের মধ্যে একই জমিতে দ্বিগুণ খাদ্য উৎপাদন করতে হবে। খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করতে হলে এক ফসলি জমিকে দুই ফসলি, দুই ফসলি জমিকে তিন ফসলি এবং তিন ফসলি জমিকে চার ফসলি জমিতে পরিণত করতে হবে। আর এ জন্য আমন মৌসুমে স্বল্প মেয়াদী (সর্বোচ্চ জীবনকাল ১২০ দিন) ধানের জাত চাষের বিকল্প নেই।

 

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বেশ কিছু স্বল্প মেয়াদী উচ্চ ফলনশীল যুগান্তকারী আমন ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। মঙ্গা মূলত আঞ্চলিক শব্দ, মঙ্গার আরেক নাম আকাল। এর দ্বারা দুর্ভিক্ষ বোঝানো হয়ে থাকে। এক সময়  মঙ্গা  উত্তরাঞ্চলের মূলত-রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা এই এলাকা গুলোতে প্রকোপ আকার ধারণ করেছিলো।

আগে উত্তরাঞ্চলে প্রতি বছরই অক্টোবর মাসের দিকে বা বাংলা কার্তিক মাসে মঙ্গা দেখা দিতো। মূলত সেই সময় মানুষের হতে কোন কাজ থাকতো না। ঐ সময়টাতে ক্ষেতের ধানও পাকতো না। ফলে গ্রামের মানুষ কাজ না পেয়ে কাজের সন্ধানে শহরে চলে আসতো। এছাড়াও বাঁচার তাগিদে গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি বিক্রি করে পেটের ভাত জোগাতো আবার অনেকে জমি-জমা বন্ধক রাখতো। এই অবস্থাটা থাকতো ধান কাটার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত।

সেই সময় ছোট খাটো দুর্ভিক্ষের মত অবস্থা হতো ওই অঞ্চলগুলোতে। যা আমাদের কাছে মঙ্গা নামে পরিচিত। উত্তরবঙ্গকে একসময় মানুষ চিনত-জানত মঙ্গাপীড়িত এলাকা হিসেবে। না খেয়ে থাকতে থাকতে একসময় অপুষ্টিতে ভুগত। আর সে সুযোগে চড়া সুদে ঋণ বিতরণ করত মহাজনরা। পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম মানুষটি দিশাহারা হয়ে যখন কাজের খোঁজে অন্য জেলায় চলে যেত, ঠিক তখনি ঘরে রেখে যাওয়া স্ত্রী, শিশুদের নিয়ে ঘটত নানা অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা, তবে দিন পাল্টেছে। উত্তরাঞ্চলের মানুষের এখন আর না খেয়ে থাকতে হয় না।

কাজের সন্ধানে অন্য জেলায়ও তেমন  যেতে হয় না। নিজের ঘরের পাশেই কাজ করে টাকা উপার্জন করছে তারা। এক সময় ওই অঞ্চলের ৯৬ শতাংশ খানায় ছিল খাদ্যের অনিশ্চয়তা। অর্থাৎ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর এই সময়ে ৯৬ শতাংশ খানায় বসবাসরত মানুষের খাদ্যের নিশ্চয়তা থাকত না। আর বাকি মাত্র ৪ শতাংশ মানুষের খাদ্যের নিশ্চয়তা ছিল।

ওই সময় উত্তরাঞ্চলের পাঁচটি জেলায় সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় ছিল মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন ধানের জাত উদ্ভাবন, কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ এবং  যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিকায়নের কারণে উত্তরাঞ্চলে মঙ্গা দূর করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

প্রচলিতভাবে অগ্রহায়ন মাসে নবান্নের মাধ্যমে ধান কাটা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এ বছর অগ্রহায়নের পূর্বেই ২০-২৫ শতাংশ ধান কর্তন হয়েছে।বিগত কয়েক বছর ধরেই এ ধারা অব্যাহত থাকলেও এ বছর অধিক ধান কর্তন হয়েছে।ব্রিধান-৭৫,৮৭ বিনাধান-১৬,১৭,২৩ ব্রি হাইব্রিড ৪,৬ অত্যন্ত উচ্চ ফলনশীল স্বল্প জীবনকালীন আমন ধান যাদের জীবনকাল ১১০-১১৫ দিন। এসব জাতের গড় ফলন (বিঘা প্রতি ১৮-২০ মন) জাতীয় গড় ফলনের প্রায় ২০ শতাংশ বেশী।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুধু কৃষির ওপর নির্ভরশীল না থেকে বিকল্প কর্মে যুক্ত হওয়ায় এ অঞ্চলের মানুষ মঙ্গার অভিশাপ থেকে মুক্তি পায়। ঘুরে দাঁড়িয়েছে এ অঞ্চলের মানুষ। তারা এ অঞ্চলের বাইরে গিয়ে পোশাক শিল্প, ইটভাটা, মানুষের বাসাবাড়ি, হোটেল-রেস্টুরেন্টে কাজ করে। অনেকে ঢাকাসহ বিভিন্ন বড় শহরে গিয়ে রিকশাভ্যান চালায়।

বিপুলসংখ্যক নারী দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত থাকে। সরকার ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর পাশাপাশি নিজেদের চেষ্টায় মঙ্গাকে জয় করে। ফলে গত কয়েক বছরে মঙ্গা শব্দটাই তাদের মন থেকে মুছে যায়।

বর্তমানে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে।  গ্রামের মানুষ এখন সকালে উঠেই দোকানে গিয়ে চা খায়। আগে যেখানে এক কাপ খেত, এখন দুই কাপ খায়। লাঙল দিয়ে জমি চাষ, মই দেয়া, কৃষাণ দিয়ে ফসল কাটা ও মাড়াইসহ সবকিছুই করতে হত কৃষাণ-কৃষাণীদের। গরুর হাল, গরুরগাড়ি, লাঙ্গল, জোয়াল, মই, ঢেকি ইত্যাদি ছিল কৃষকদের প্রধান সম্বল। ধান, গমসহ বিভিন্ন ফসল কাটার জন্য কাস্তেই ছিল প্রধান হাতিয়ার। কিন্তু এখন আর তা নেই, পাল্টে গেছে সেই দৃশ্যপট। গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে বেড়ালেও গরুর গাড়ি, লাঙ্গল-জোয়াল, মই চোখে পড়বে না। ঢেকি তো অনেক আগেই হারিয়ে গেছে।

 

এসব যান ও যন্ত্রের পরিবর্তে এখন কমবেশি সব কৃষকের বাড়িতেই দেখা যায় পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, হারভেস্টার, মিনি রাইস মিলসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি। সকল কাজেই এখন কৃষকরা আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করে এগিয়ে যাচ্ছে এ অঞ্চলের কৃষকরা। বীজতলা থেকে থেকে শুরু করে ফসল তোলা পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়েই ব্যবহার হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি। সব মিলে প্রায় ২০ থেকে ২৫ প্রকারের আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হচ্ছে কৃষিকাজে। জমি চাষ ও নিড়ানি থেকে শুরু করে জমিতে সার, কীটনাশক দেয়া, ধান কাটা-মাড়াই ও শুকানোর কাজসহ চাল তৈরির প্রক্রিয়ায় এখন যোগ হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি।

সেচ কাজে ব্যবহার হচ্ছে শ্যালো মেশিন কিংবা বৈদ্যুতিক পাম্প,সাব মার্সিবল পাম্প, গভীর নলকূপ ইত্যাদি। বীজ বপনের কাজে ব্যবহার হচ্ছে ড্রাম সিডার, মাড়াইয়ের কাজে পাওয়ার থ্রেসার (পায়ে চালিত মাড়াই যন্ত্র), গ্রেডিং মেশিন। এর ফলে চাষাবাদের খরচ, সময় ও শ্রমিক কম লাগছে, উৎপাদন বহুগুণ বেড়ে গেছে। কম্বাইন হারভেস্টার নামে আরেকটি যন্ত্র আরো সহজ করে দিয়েছে কৃষকের কাজকে।

এই যন্ত্রটি রংপুর সহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে কৃষকের হাতে পৌঁছে গেছে।আধুনিক যন্ত্রপাতি কৃষিকাজের গতি অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। আগে ৬০ শতক জমির ধান কাটা, মাড়াই করতে খরচ হতো তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা। এখন কম্বাইন হারভেস্টার মেশিনের মাধ্যমে খরচ হচ্ছে মাত্র ৬শ’ থেকে ৭শ’ টাকা। আগে ধান বেচতে গেলে গরুর গাড়ি নিয়ে ফজরের নামাজ পড়ে হাটে যাওয়ার জন্য রওয়ানা দিতে হতো, ধান বেচে ফিরে আসতো এশার নামাজের পর,প্রায় সারাদিন যেত।

আর এখন পিকাপ কিংবা পাওয়ার টিলারে করে ধান নিয়ে আধাঘণ্টা থেকে ১ ঘণ্টার মধ্যে হাটে গিয়ে বিক্রি করে বাড়িতে এসে অন্যান্য কাজ সেরে যোহরের নামাজ পড়া যায়।কৃষানীর দিন শুরু হত কাক ডাকা ভোরে আর শেষ হতো সন্ধ্যাবেলার পাখির কিচিরমিচির শব্দে।

মাড়াই করা ধান গভীর রাত পর্যন্ত সিদ্ধ করে পরদিন রোদে শুকিয়ে ঢেকির মাধ্যমে চাল তৈরি করত। ১০/১৫ বছর আগেও অনেক পিছিয়ে ছিল তারা। গরুর হালের ওপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় ছিল না। বীজ বপন, চারা রোপণ এবং ফসল কেটে ঘরে তুলে মাড়াই পর্যন্ত বেশ সংকটে পড়তে হত। প্রতিটি মওসুমে কৃষি শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যেত। দ্বিগুণ মজুরি দিয়েও কৃষি শ্রমিক পাওয়া যেত না। এতে অনেক সময় বিলম্বে বীজ বপন, চারা রোপণের কারণে ফলন কম হত।

পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ বৃদ্ধি পেত। এখন আধুনিক যন্ত্রপাতি কৃষকের কাজ সহজ করে দিয়েছে এবং খুব কম সময়ের মধ্যে হচ্ছে। কৃষিবিদদের মতে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারিগর হলো কৃষক। কৃষি খাতে সমৃদ্ধি মানে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত।

সবুজ মাঠ এখন সোনালি রঙের পাকা ধানে ভরপুর। মাঠে মাঠে চলছে ধান কাটার মহোৎসব। কৃষকের উঠোনে সোনা রাঙা ধানে শোভা পাচ্ছে। বাড়ির আঙিনায় নতুন ধান ঘরে তুলতে মহা ব্যস্ত দিন পার করছেন কৃষাণ-কৃষাণীরা। এক দিকে ধান কাটা আর অন্য দিকে ধান  মাড়াইয়ের কাজ নিয়ে মাঠে কাজ করছেন শ্রমিক ও কৃষকেরা।

ধান মাড়াই করে শুকিয়ে নিচ্ছেন কৃষাণীরা।  ফলন ভাল দেখে কৃষকদের চোখেমুখে ফুটে উঠেছে আনন্দের ঝিলিক। সর্বত্রই সোনালী নতুন ধানের মৌ মৌ সুগন্ধ বয়ে যাচ্ছে। গ্রামে গ্রামে  এখন ধান ঘরে তুলতে কৃষাণ-কৃষাণীদের দম ফেলার সময় নেই। নতুন ধান বিক্রি করে ছেলে মেয়ে ও স্ত্রীর জন্য শীতের কাপড় কিনবেন , সংসারের যাবতীয় চাহিদা মিটাবেন এমন ভাবছেন তারা।

এ বছর ধান,  চালের বাজার সন্তোষজনক রয়েছে। ফলন ভালো হওয়ায় গেল বছরের মতো এবার লোকসানের আশঙ্কা নেই।সবচেয়ে মোটা ধান গুটি স্বর্ণা ধানের দাম মণপ্রতি ১১০০/১২০০ টাকা, চিকন/সুগন্ধি জাতভেদে ১৭০০-১৮০০ টাকা।পরবর্তী বোরো সহ রবি ফসল চাষে কৃষক বিনিয়োগ করতে পারছেন এটা নিঃসন্দেহে পজিটিভ দিক।

 

দেশে শতকরা প্রায় ৯০-৯৩ ভাগ আমন ধান কর্তন হয়েছে, ইতোমধ্যে আমন ধানের মাঠ আলু, সরিষা, গম, ভূট্টা, পেঁয়াজ মরিচ সহ বিবিধ রবি ফসলে ভরে উঠেছে। দেশের উত্তরাঞ্চলের তিস্তা নদী বিধৌত ভারত সীমান্ত ঘেঁষা একটি প্রাচীন জনপদ নীলফামারী জেলা। মঙ্গা বা অভাবের সেদিন আর এখন নেই। বর্তমান  উন্নয়ন ধারাবাহিকতায় দৃশপট পাল্টে গেছে।

এ জেলার অর্থনীতি আধুনিক কৃষি ব্যবস্থারপাশাপাশি হাজারো ছোটবড় শিল্প কারখানায় গড়ে উঠেছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে মানুষজনের আয়-রোজগার বেড়েছে। ফলে মঙ্গার ভূত এখন আর তাড়িয়ে বেড়ায় না। প্রয়াত কবি সৈয়দ শামসুল হকের সাড়া জাগানো নূরলদীনের সারাজীবন কবিতাটির সেই গভীর উচ্চারণ “জাগো বাহে কোনঠে সবায়”। সত্যিই তারা জেগে উঠেছে। বর্তমানে যোগ হয়েছে বাণিজ্যিক কৃষি হিসাবে কফি, চা, ড্রাগন, মাল্টা, লিচু, থাই পেয়ারা ও লেবু বাগান। উত্তরাঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানের খেলাধূলার ব্যবস্থা সহ সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড বৃদ্ধি পেয়েছে।

মঙ্গা কবলিত মানুষেরাই মঙ্গা প্রতিরোধে প্রধান ভূমিকা পালন করতে পারেন। অন্যের আশায় অপেক্ষা করলে নিজের উন্নয়ন সম্ভব নয়। নিজের সামর্থ্যরে মধে যা কিছু করা সম্ভব তাই করতে হবে। কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে এরইমধ্যে দেশ থেকে মঙ্গা দূর হয়েছে। মঙ্গার কথা মানুষ ভুলে গেছে।

এ অবস্থায়, আমাদের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত আগাম জাতের আমন ধানের চাষ রংপুর, নীলফামারীসহ উত্তরাঞ্চলে আরো ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করতে পারলে আগে থেকেই মাঠে ময়দানে কর্মযজ্ঞ শুরু হবে ফলে দেশে ভবিষ্যতে আর কোনও দিন মঙ্গা ফিরে আসবে না।