Home আঞ্চলিক জীবনযুদ্ধে ঈদ উধাও: ঈদের জামাকাপড় দেব কনতে

জীবনযুদ্ধে ঈদ উধাও: ঈদের জামাকাপড় দেব কনতে

18

যশোর অফিস//

বৈশাখের তপ্ত দুপুরে ঘাম আর কাদাপানিতে ভেজা শরীরে ডিঙি থেকে শ্যাওলা নিয়ে কপোতাক্ষ নদের পাড়ে রাখছিলেন আব্দুল গনি মিয়া (৫০)। পাশে গিয়ে কুশলাদি বিনিময়কালে বললেন, ‘দিন-রাইত জাল ফেলে র্যাখেও মাছ উঠতেছে না। তাই ফাও (অলস) বইস্যে না থেকে গাঙয়ের শ্যাওলা তুলে বেচে যে দু-পাঁচশ রোজগার হচ্ছে, তা দিয়ে কোনো রকম ডাল-ভাতের খরচ জুটোচ্ছি।’

ঈদের আগমনী বার্তা দরজায় কড়া নাড়ছে- এ নিয়ে প্রস্তুতি কী জানতে চাইলে একগাল ফ্যাকাশে হাসি দিয়ে বললেন, মাস ছয় হলো মহাজনের কাছ থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দাদন নিয়ে বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। ভিটেবাড়িটাও করেছিলেন মেরামত। কথা ছিল, মাছ বিক্রির টাকায় দাদন শোধ করবেন। কিন্তু শুস্ক মৌসুমে নদে পানি তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। জালে একেবারেই মাছ উঠছে না। প্রখর রোদে সারাদিন নৌকায় ঘুরে ঘুরে যে শ্যাওলা পাওয়া যায়, তা দিয়ে এক নছিমনও পূর্ণ হয় না। আবার প্রতিদিন যে শ্যাওলা পাওয়া যায়, তাও না। ফলে রোজগার জোটে কম। তারপর এবার জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া। এ অবস্থায় সংসার চলবে কীভাবে আর দাদনের কিস্তি শোধ হবে কোত্থেকে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পুরো পরিবার। ঈদ নিয়ে ভাবার সময় নেই তাদের।

যশোরের মনিরামপুর উপজেলার মশ্মিমনগর ইউনিয়নের পারখাজুরা জেলেপাড়ার বাসিন্দা গনি মিয়া। স্ত্রী, তিন মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে ছয় সদস্যের সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম হলেন গনি মিয়া। ছেলে সাজু বাবার মাছ ধরা কাজে সহায়তা করলেও নদী শুকিয়ে যাওয়ায় এখন সে বেকার। বড় মেয়েটার বিয়ে হয়েছে। আর যমজ দুই মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। সহায়-সম্বল বলতে ৬ শতক ভিটেয় টিন আর টালির জীর্ণ কুটির।

সেখানে পা রেখে মিলল না ঈদ আগমনী উচ্ছ্বাস। বরং গনি মিয়ার স্ত্রী নূরজাহানের কণ্ঠে আক্ষেপের সুর। বললেন, ‘জেলের সংসার, তবুও ছাওয়াল-ম্যায়েগের থালায় মাছের টুকরো তুলে দিতি পারিনে কত দিন তার হিসাব নেই! ঈদির জামাকাপড় দেব কনতে?’

পারখাজুরা জেলেপাড়ায় ৯০টির মতো পরিবারের বসবাস। এর মধ্যে ২০টি পরিবার হিন্দু সম্প্রদায়ের। বাকি পরিবারগুলো মুসলমান। এ গাঁয়ের বুক চিরে বয়ে চলা মহাকবি মাইকেলের স্মৃতিবিজড়িত কপোতাক্ষ নদে মাছ ধরা জেলেপাড়ার মানুষের আয়-রোজগারের একমাত্র ভরসা। আগে খেয়া পারাপার করে কয়েকজনের সংসার চললেও নদের ওপর সেতু নির্মাণের পর তাদেরও বৈঠা ফেলে হাতে জাল তুলে নিতে হয়েছে। হিন্দু-মুসলিম পরিবারগুলো মিলেমিশে থাকা এ গ্রামটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দারুণ উদাহরণ। অর্থনৈতিক অবস্থায়ও অদ্ভুত মিল তাদের মধ্যে। দুটি পাকা বাড়ি ছাড়া গ্রামের বাকি সব ঘরবাড়ি মাটি অথবা বাঁশের বেড়ার তৈরি।

স্থানীয়রা জানান, এক দশক আগেও কপোতাক্ষ সারা বছর পানিতে টইটম্বুর থাকত। কিন্তু এবার শুস্ক মৌসুমে নদের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় প্রায় এ পাড়ার জেলেরা বেকায়দায় পড়েছেন। আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে গেছে তাদের। পেট বাঁচাতে কেউ এনজিও থেকে ঋণ নিচ্ছেন; কেউ বা নদ থেকে শ্যাওলা তুলে বিক্রি করে কোনো রকম দিনানিপাত করছেন। ফলে ঈদ উৎসবের রং এ পল্লির বাসিন্দাদের মন ছুঁতে পারেনি।

এ পাড়ার বাসিন্দা ইব্রাহিম হোসেন বললেন, ‘বংশপরম্পরায় মাছ ধরা আমাগের পেশা। এখন অন্য কাজ করতি পারিনে। বাধ্য হয়ে ধানক্ষেতে জন (দিনমজুর) দিতি গিছিলাম। কিন্তু আমাগের কাজ দেখে কেউ কাজে রাখতি চাই না। আর রাখলিও মজুরি কম দ্যায়। এই অবস্থায় ঈদির কথা চিন্তেও করতি পারছিনে।’

ভরদুপুরে ইব্রাহিমের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, তার স্ত্রী সালেহা বেগম উঠানে বসে লাউ কুটছিলেন। বললেন, ঘরে তরকারি নেই। পাশের ভবেশের বাড়ি থেকে লাউটি চেয়ে এনে রান্না করছেন। এর মাঝে আর ঈদ!

তিনি আরও বলেন, গত ঈদে স্বামী তাকে ও মেয়েকে নতুন কাপড় দিয়েছিলেন। এবার এমনিতে নদে মাছ নেই; তার ওপর জিনিসের যে দাম, তাতে সংসার চালানো কষ্টকর। এর মধ্যে ঈদ উৎসবের চেয়ে বোঝা হয়ে দেখা দিয়েছে।

লতিফ হোসেন নামের আরেক জেলে বলেন, নদীতে পলি পড়ে জোয়ার-ভাটা বন্ধ হয়ে গেছে। দ্রুত খনন না করলে জোয়ার-ভাটা হবে না। আর আমাদের মাছও পাওয়া যাবে না। নদীতে মাছ ধরে জীবন চালানো কষ্টকর হয়ে পড়েছে। বললেন, ‘এবার ঈদি নতুন কাপড় তো দূরের কথা; দুই কেজি গরুর গোস্ত আর সিমাই-চিনি কিনতি পারলিই খুশি।’

সাগর হোসেন নামের এক জেলে বলেন, ঈদের আগে সরকারের দেওয়া ভিজিএফের ১০ কেজি চাল পাব। ওটাই এবারের ঈদের প্রধান আকর্ষণ।

জেলেপাড়ার বাসিন্দাদের এই আলাপচারিতার প্রমাণ পাওয়া গেল পাশের পারখাজুরা বাজারে গিয়েও। ঈদ দোরগোড়ায়; কিন্তু ভিড় নেই এ বাজারে। স্বাভাবিক সময়ের মতো সন্ধ্যার পর চায়ের দোকানসহ দু-একটি অন্যান্য পসরার দোকান ছাড়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বেশিরভাগ দোকানপাটই। এ বাজারের তৈরি পোশাকের দোকানের মালিক আবু জাফর বলেন, বেচাকেনা তেমন নেই। করোনার ছোবলে গেল দু’বছর এমনিতেই ঈদ ছিল নিরানন্দ। আর এবার অভাবের বেড়াজালে বন্দি গরিবের ঈদ আনন্দ।

শুধু এ বাজার নয়, মনিরামপুরের বড় বাজার, রাজগঞ্জসহ একাধিক মোকাম ও বাজার ঘুরে মিলেছে একই রকম তথ্য। বিক্রেতারা বলছেন, শিশুদের মুখের দিকে তাকিয়ে লোকজন বাজারে ছুটলেও কিনছেন তুলনামূলক কম। শেষদিকে এসে বেচাকেনা কিছুটা বাড়লেও লক্ষ্য পূরণ হবে কিনা তা নিয়ে চিন্তিত ব্যবসায়ীরা।