স্পোর্টস ডেস্ক।।
গাজার একটি বাজারে উজ্জ্বল পর্দার দিকে সবার স্থির দৃষ্টি। পর্দায় চলছে বিশ্বকাপের একটি ম্যাচ। নিউ জিল্যান্ড ও মিসরের ম্যাচের আগে বহুল প্রতীক্ষিত ম্যাচটি দেখতে সেখানে জড়ো হয়েছেন দর্শক। ফিলিস্তিনের গাজায় ফুটবলপ্রেমীদের কাছে মিশরের স্ট্রাইকার মোহাম্মদ সালাহ এক জীবন্ত কিংবদন্তি।
তবে ম্যাচটিতে নিউ জিল্যান্ডকে মোকাবিলা করে মিশর। খেলায় ৩-১ গোলের জয় পেয়েছেন সালাহরা। এক গোল এবং অ্যাসিস্ট করেছেন মিশরের সবচেয়ে বড় তারকা সালাহ। বাকি দুই গোল মোস্তফা জিকো ও ট্রেজেগুয়েতের। এর আগে নিউ জিল্যান্ডকে এগিয়ে দেন ফিন সারম্যান। যদিও তার এনে দেওয়া লিড শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারেনি নিউ জিল্যান্ড। এতে গাজায় ফুটবলপ্রেমীদের উৎসাহে কমতি নেই। অনেকেই বন্ধুর কাঁধে চড়ে মিশরের পতাকা উড়িয়ে উল্লাস করছেন।
গাজার মধ্যাঞ্চলের জনবহুল নুসেইরাত এলাকার এই ধ্বংসস্তূপের মাঝে মানুষের মুখে হাসি ফুটলেও, তাদের চারপাশের বাস্তবতা বড়ই কঠিন। দুই বছর ধরে চলা ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ গাজাকে এক বিশাল ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে।
ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (পিএফএ) সদস্য মোস্তফা সিয়াম বলেন, গাজাবাসীর জন্য বিশ্বকাপ কেবল একটি খেলা নয়। ফুটবল ম্যাচের উত্তেজনা তাদের চারপাশের সীমাহীন যন্ত্রণা আর উদ্বেগ থেকে সাময়িক মুক্তি দেয়।
তিনি আরও বলেন, সংকটের মধ্যেও স্থানীয় ক্যাফে মালিকরা পুরনো দিনের আবহ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন।
মধ্য গাজার আল-জাওয়াইদার একটি বাস্তুচ্যুতদের শিবিরে তাঁবুর নিচে ছোট একটি টেলিভিশন ঘিরে বসে আছেন মানুষ। বালুময় মেঝে, প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে তারা দেখেছেন বিশ্বকাপ ম্যাচটি।
টেলিভিশন দর্শক ঈদ আল-আত্তার বলেন, সাধ্যমতো বিশ্বকাপের স্বাদ নেওয়ার চেষ্টা করছি। স্টেডিয়ামে গিয়ে সরাসরি ম্যাচ দেখা আমাদের জন্য স্বপ্ন, কারণ আমরা অবরুদ্ধ। ইসরায়েলের কঠোর নিয়ন্ত্রণে থাকা এই ভূখণ্ড থেকে বিশেষ চিকিৎসা ছাড়া বাইরে যাওয়ার উপায় নেই।
গাজা সিটির ২৭ বছর বয়সী মাজেন আল-গুল বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, বিশ্ব যখন আনন্দ করছে, তখন আমাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, বিদ্যুৎ নেই, স্কুল নেই। এই বৈষম্য আমাদের ভেতর এক তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি করে।
অনেকেই ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের স্মৃতিচারণ করেন, যখন গাজা সিটির স্টেডিয়ামগুলোতে হাজার হাজার মানুষ খেলা উপভোগ করতেন। আজ সেই স্টেডিয়ামের অস্তিত্ব নেই। অনেক রেস্তোরাঁ ও ভেন্যু যুদ্ধের আঘাতে ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন ছোট কিছু ক্যাফেতে জেনারেটরের সাহায্যে খেলা দেখানোর চেষ্টা হলেও, ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে দর্শকদের সব আনন্দ ফিকে হয়ে যায়।
মার্বান আল-শেখ (৩০) বর্তমানে তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বলেন, আগে বন্ধুদের নিয়ে ক্যাফেতে খেলা দেখতাম, আমরা সুখে ছিলাম। আজ সেই উৎসাহ আর নেই। আজকের জীবন আমাদের কাছে দুর্বিষহ, শুধু ফুটবলের প্রতি নয়, পৃথিবীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে গেছে।
দক্ষিণ গাজার প্রধান শহর খান ইউনিসের সমুদ্র সৈকতে বিশ্ব মিডিয়ার আলোচনার বাইরে চলছে অন্য এক বিশ্বকাপ। সেখানে বালির ওপর খালি পায়ে ফুটবল খেলছে একদল তরুণ। কোচ মোহাম্মদ আবু তাহ জানালেন, ফুটবলই আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র মুক্তি। তার সহকর্মী জাবের আল-বাশিটি যোগ করেন, আমাদের এই বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে ধ্বংসপ্রাপ্ত এক মাটিতে। যেখানে নেই কোনো গ্যালারি, নেই সরঞ্জাম। কিন্তু ভাঙা কনক্রিটের ব্লকে বসে খেলা দেখা দর্শকদের ভালোবাসার কোনো অভাব নেই।









































