Home Lead বিএনপি নেতাকে ‘মাইনাস’ করতে রাশিদুলের ব্লু-প্রিন্ট: স্ট্যান্ড রিলিজে কেএমপিতে স্বস্তি

বিএনপি নেতাকে ‘মাইনাস’ করতে রাশিদুলের ব্লু-প্রিন্ট: স্ট্যান্ড রিলিজে কেএমপিতে স্বস্তি

176


শামিম শিকদার।।


তথ্য ফাঁস করলে অধীনস্থ ইন্সপেক্টরকে ‘গাছে ঝুলিয়ে পিটিয়ে মারার’ উসকানিমূলক বক্তব্যের দায়ে স্ট্যান্ড রিলিজ হওয়া খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাশিদুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে জুলাই-পরবর্তী ফৌজদারি মামলা রয়েছে বলে সুনির্দিষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে। শুধু প্রত্যাহারই নয়, তার বিরুদ্ধে ওঠা নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগের প্রেক্ষিতে খোদ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে তার ফৌজদারি মামলার তথ্য তলব করা হয়েছিল। ৩৬ জুলাই-পরবর্তী পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের কর্মকর্তাদের ফৌজদারি মামলার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ তালিকার ৭৬ নম্বর সিরিয়ালে স্থান পেয়েছিলেন কেএমপি থেকে বিদায়ি এই প্রভাবশালী কর্মকর্তা। যেকোনো মুহূর্তে তিনি বড় ধরণের ফৌজদারি মামলায় ফেঁসে যেতে পারেন বলে ধারণা করছেন পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা।


হেডকোয়ার্টার্সের চিঠি: দাপ্তরিক নথির অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ক্রাইম অ্যানালাইসিস শাখা থেকে ‘অতি গোপনীয়’ এক দাপ্তরিক চিঠি (স্মারক নং-৪৪.০১.০০০০.১৮৭.১৬.০০২.২০২৬/৩৭৫(২৫)) জারি করা হয়। গত ৭ মে ২০২৬ তারিখে প্রেরিত ওই পত্রে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রুজুকৃত বা চলমান ফৌজদারি মামলা সংক্রান্ত তথ্য হার্ডকপি ও সফটকপি আকারে ১৪ মে ২০২৬ তারিখের মধ্যে পাঠানোর জন্য দেশের সব ইউনিটকে নির্দেশ দেওয়া হয়। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই স্পর্শকাতর তালিকার ৭৬ নম্বরেই ছিলো “মোহাম্মদ রাশিদুল ইসলাম খান, বিপিএম-সেবা, পিপিএম (বার) (বিপি-৭১৫০ ৩০২০৮৯৬), অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার, কেএমপি, খুলনা”-এর নাম। এর মাধ্যমেই স্পষ্ট হয় যে, এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জল অনেক দূর গড়িয়েছে।


এয়ারপোর্টে ১০ বছরের একচ্ছত্র রাজত্ব: তদন্ত সংশ্লিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, খুলনায় যোগদানের আগে বিসিএস ক্যাডারের এই কর্মকর্তা দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৮ম আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নে (এপিবিএন) সিনিয়র এএসপি এবং পরবর্তীতে ব্যাটালিয়ন সিও (কমান্ডিং অফিসার) হিসেবে একচ্ছত্র রাজত্ব চালিয়েছেন। বিগত আওয়ামী সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন হওয়ার সুবাদে বিমানবন্দরে তার সিদ্ধান্তই ছিল শেষ কথা।


সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগে জানা গেছে, এই দীর্ঘ সময়ে তিনি অবৈধ সম্পদের মালিক বনেছেন। শুধু তাই নয়, বিমানবন্দরে কঠোর নজরদারি ও হ্যারাসমেন্ট করে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাকর্মীদের বিদেশে যেতে বাধা দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের কাছ থেকে ‘পুরস্কারস্বরূপ’ একাধিক পদক (বিপিএম, পিপিএম) বাগিয়ে নেন তিনি।


বদলি বাণিজ্য : গত ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক বিতর্কিত ও ফ্যাসিবাদের দোসর পুলিশ কর্মকর্তা ওএসডি বা বরখাস্ত হলেও রাশিদুল ইসলাম খান চতুর তদবিরের জোরে কেএমপির অ্যাডমিন, ফিন্যান্স ও ক্রাইম সেকশনের মতো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী পদ বাগিয়ে নেন। খুলনায় এসে বাহ্যিক নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করলেও পর্দার আড়ালে তিনি পুরো শহরকে অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত করেন।


অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি খুলনার প্রতিটি থানার ওসিকে রূপান্তর করেছিলেন নিজের ক্যাশিয়ার হিসেবে। যোগ্য, সৎ এবং বিশেষ করে অস্ত্র উদ্ধারে পারদর্শী পুলিশ অফিসারদের সুকৌশলে খুলনার বাইরে বদলি করে দিতেন। বিপরীতে, মোটা অঙ্কের ঘুষ ও মাসোহারা বাণিজ্যের বিনিময়ে অত্যন্ত অযোগ্য ও বিতর্কিত ইন্সপেক্টরদের গুরুত্বপূর্ণ থানাগুলোতে পদায়ন করতেন। ফলে কেএমপির চেইন অব কমান্ড সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে এবং একসময়ের শান্তির শহর খুলনা এখন অপরাধ ও আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে।


বিএনপি নেতাকে ‘মাইনাস’ করতে জালিয়াতি: রাশিদুল ইসলামের সবচেয়ে বড় ও বিস্ফোরক জালিয়াতির ছক উন্মোচিত হয়েছে খুলনা মহানগরীর ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক অঙ্গনে। খুলনা সদর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মোল্লা ফরিদ আহমেদকে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় এবং তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য ধ্বংস করতে এক নজিরবিহীন ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করেন রাশিদুল।


নথি অনুযায়ী, সোনাডাঙ্গা মডেল থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ শফিকুল ইসলামকে দিয়ে গত ১১ আগস্ট ২০২৫ তারিখে একটি বিশেষ ডায়েরি নোট (জিডি নং-৭৯০) সংরক্ষণ করান রাশিদুল। সেখানে দাবি করা হয়-গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর মোল্লা ফরিদ আহমেদ তার সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে সোনাডাঙ্গা কাঁচাবাজার ও ট্রাকস্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু হিন্দু ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের ওপর ত্রাস সৃষ্টি করে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করছেন এবং দেশত্যাগের হুমকি দিচ্ছেন। প্রায় একই ধরনের অবাস্তব গল্প সাজিয়ে খুলনা সদর থানাতেও একটি ডায়েরি নোট (জিডি নং-৪৯৯) অন্তর্ভুক্ত করা হয়।


তবে এই পুরো প্রক্রিয়াকে ‘সাজানো ও সম্পূর্ণ জালিয়াতি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন খোদ খুলনা বড়বাজারের সনাতন ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায় এবং সর্বস্তরের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ। মহানগর বিএনপি মনিটরিং সেলের মাধ্যমে কথিত ভুক্তভোগীদের চিঠি দেওয়া হলে, হিন্দু ব্যবসায়ীরা লিখিত জবানবন্দিতে জানান-মোল্লা ফরিদ কোনো চাঁদাবাজির সাথে জড়িত নন, বরং তিনি উল্টো তাদের নিরাপত্তা দিয়েছেন। এই জালিয়াতির ছক ফাঁস হওয়ার পরও শান্ত হননি রাশিদুল; তিনি গভীর রাতে সদর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের বাড়িতে সশরীরে পুলিশ পাঠিয়ে গ্রেফতারের জন্য হানা দেন। এসময় রাশিদুল সদর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের পরিবারের সাথে বিভিন্ন ধরণের অসৌজন্যমুলক আচরণ করেন বলে অভিযোগ এসেছে। এ ব্যাপারে সদর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোল্লা ফরিদ আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে হয়রানী করার জন্য তিনি শীঘ্রই আইনের আশ্রয় নিবেন।


ফাইল সরবরাহ ও সহকর্মীকে সরাতে ‘অর্থ বিনিয়োগ’: কেএমপি সূত্র জানিয়েছে, রাশিদুল ইসলাম কেবল বাইরেই অপরাধ করেননি, বরং ডিপার্টমেন্টের ভেতরেও চরম অন্তর্ঘাতমূলক কাজ করেছেন। তিনি পুলিশের অতি গোপনীয় ও কৌশলগত অনেক ফাইল এবং তথ্য বাইরে ফাঁস করে খোদ কেএমপি প্রশাসনকে চরম বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছেন। এমনকি তার দুর্নীতিতে বাধা দেওয়ায় কেএমপিরই একজন সৎ ইন্সপেক্টরকে খুলনা থেকে তাড়াতে রাশিদুল ইসলাম নিজে মোটা অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন বলে গুরুতর তথ্য মিলেছে।


কেএমপিতে ‘ঈদের আনন্দ’ ও স্বস্তি: শনিবার বিকেলে রাশিদুল ইসলাম খানের বদলি ও প্রত্যাহারের খবর ছড়িয়ে পড়লে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) কনস্টেবল থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে বিশেষ আনন্দ ও স্বস্তি পরিলক্ষিত হয়। খুশিতে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা বিভিন্ন পত্রিকা অফিসে ফোন দিয়ে রাশিদুলের বদলির বিষয়টি নিশ্চিত হন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেএমপির একাধিক কর্মকর্তা জানান, রাশিদুলের তীব্র অত্যাচার, মানসিক হয়রানি ও অনৈতিক চাপের কারণে চাকরি করার মতো ন্যূনতম পরিবেশ ছিল না। তার ওপর চরম বিরক্ত হয়ে অনেকেই কেএমপি থেকে স্বেচ্ছায় বদলি নিয়ে চলে গিয়েছিলেন।


পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের ক্ষোভ: একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার মুখে এমন ‘আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার’ এবং জনসমক্ষে অধীনস্থদের ‘পিটিয়ে মারার’ উসকানি দেওয়ার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। ২০ জুন সকালেই বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ) এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ এনে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়। বাহিনীর অভ্যন্তরে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়া এবং তীব্র অসন্তোষের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় একই দিন বিকেলে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে তাকে খুলনা থেকে প্রত্যাহারের এই কঠোর ও শাস্তিমূলক আদেশ জারি করা হলো।


ডিবি হারুনের চেয়েও ভয়ঙ্কর মাফিয় রাশিদুল: পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স কর্তৃক ফৌজদারি মামলার তালিকায় রাশিদুলের নাম ৭৬ নম্বরে আসায় খুলনার সচেতন নাগরিক মহল ও সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি নেমে এসেছে। স্থানীয়দের দাবি, বিগত আওয়ামী সরকারের ডিবি প্রধান হারুনুর রশীদের চেয়েও সুকৌশলী ও ভয়ঙ্কর এই ‘মাফিয়া’ পুলিশ কর্মকর্তাকে শুধু বদলি বা প্রত্যাহার করলেই হবে না; ফৌজদারী মামলার আসামি হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অবিলম্বে গ্রেফতার করা এখন সময়ের দাবি।