Home আঞ্চলিক দেড় টাকার পুঁজি নিয়ে শুরু, এখন ইউরোপ-আমেরিকায় ফকিরহাটের কাঠের কলম

দেড় টাকার পুঁজি নিয়ে শুরু, এখন ইউরোপ-আমেরিকায় ফকিরহাটের কাঠের কলম

8


Advertisement

ফকিরহাট (বাগেরহাট) প্রতিনিধি।।

মাত্র দেড় টাকা পুঁজি আর একটি দা- এই সামান্য সম্বল দিয়েই প্রায় তিন দশক আগে কাঠের কলম উৎপাদন শুরু করেছিলেন ফকিরহাট উপজেলার ধনপোতা গ্রামের এক পরিবার। সেই ক্ষুদ্র উদ্যোগ আজ রূপ নিয়েছে ‘মিথুন কুঠির শিল্প’।


এই কাঠের কলম বর্তমানে দেশের বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও সম্ভাবনার জানান দিচ্ছে। ৩০ বছর আগে হাতের শৈল্পিক দক্ষতা কাজে লাগিয়ে শুরু করা কাঠের কলমের কুটির শিল্প এখন প্রযুক্তি ও শিল্পির রুচিতে ইউরোপ-আমেরিকায় চাহিদা তৈরি করেছে।

সরু ও মসৃণ এই কলম দিয়ে স্বাচ্ছন্দে লেখা যায় বলে জানান ব্যবহারকারীরা। অনেকে শখ করে সংগ্রহেও রাখেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল ধনপোতা গ্রামে মেহগনি কাঠ ব্যবহার করে নান্দনিক ও টেকসই কলম তৈরি করছেন কয়েকজন কারিগর। শুরুতে বাঁশ দিয়ে কলম তৈরি করলেও বর্তমানে তারা কাঠের কলম তৈরি করছেন। দুই ভাই অসিত পাল, অরুণ পাল ও তাদের পরিবারের সদস্যদের হাতেই পরিচালিত হচ্ছে এই কুটির শিল্প।

অশোক পাল জানান, ১৯৯৪ সালে দেড় টাকা দিয়ে একটা শিষ ও একটা শিরিস কাগজ কিনে প্রথম কলম তৈরি করা শুরু করেন। ওটাই তার প্রথম পুঁজি, সঙ্গে নিজের হাতের কাজের ওপর বিশ্বাস। তবে এই চলার পথ সহজ ছিল না। প্রথমে কলম তৈরি করে তা বাজারজাত করার জন্য মাসের পর মাস বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন শহরের বিপনী বিতানগুলোয় ঘুরেছেন। বিভিন্ন লোকজ মেলায় পথের ধারে বসে বিক্রি করেছেন। নান্দনিক ও ব্যবহার উপযোগী হওয়ায় আস্তে আস্তে সাফল্য ধরা দিতে থাকে তাদের কাঠের কলমের।

বর্তমানে তাদের দুটি কারখানায় মাসে গড়ে প্রায় ৬ হাজার কলম উৎপাদন হয়। পরিবারের ৭ থেকে ৮ জন সদস্য এই কাজে যুক্ত। প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ১৮ ঘণ্টা পরিশ্রম করে তারা উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছেন। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় একটি কলম তৈরি করতে প্রায় ৩৬টি ধাপ অতিক্রম করতে হয়।

তবে এই উৎপাদনের পথ সহজ নয়। অরুণ পাল জানান, প্রতি ১ হাজার কলমে প্রায় ২০০টি উৎপাদনজনিত ত্রুটির কারণে বাতিল হয়ে যায়। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং লাভের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। তার মতে, কারিগরি উন্নত প্রযুক্তি ও আর্থিক সহায়তা পেলে এই ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

মিথুন কুঠির শিল্পে বিভিন্ন ধরনের কাঠের কলম তৈরি হয়। উৎপাদনের ধরন অনুযায়ী প্রতিটি কলম পাইকারি পর্যায়ে ১৬ টাকা থেকে শুরু করে ৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা হয়। সাধারণ নকশাবিহীন কলমের পাশাপাশি রয়েছে কারুকাজ খচিত বিভিন্ন ডিজাইনের কলম।

তবে খুচরা বাজারে এসব কলম আরও বেশি দামে বিক্রি হয় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। উৎপাদকদের অভিযোগ, তারা ন্যায্যমূল্য না পেলেও মধ্যস্বত্বভোগীরা এসব পণ্য ব্র্যান্ড ও শোরুমে পৌঁছে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করছে।

অশোক পাল বলেন, বাজারে আমাদের কলমের ভালো চাহিদা রয়েছে। কিন্তু উৎপাদন খরচ বেশি হওয়া সত্ত্বেও পাইকারদের কাছে কম দামে বিক্রি করতে হয়। আমরা সরাসরি বাজারে পৌঁছাতে না পারায় মধ্যস্বত্বভোগীরাই বেশি লাভ করছে।

তিনি জানান, বিদেশে কুটির শিল্প ও হাতের কাজকে যেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়, দেশে সেই তুলনায় পৃষ্ঠপোষকতা কম। ব্যক্তি উদ্যোগে তাদের তৈরি কলম যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও জার্মানিতে পৌঁছেছে এবং সেখানে ভালো সাড়া পাওয়া গেছে। তাদের কাছ থেকে কলম কিনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিদেশে পাঠায়। তিনি নিজে সরাসরি বিদেশে রপ্তানির জন্য অনেক অফিসে যোগাযোগ করেও কোনো সুযোগ পাননি বলে জানান।

তবে বিদেশে ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যার কথাও জানান তিনি। বিশেষ করে শীতপ্রধান দেশে কিছু ধরনের শিষের কালি জমে যাওয়ার সমস্যা দেখা দেয়, যা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নত মানের কালি ও শিষ আমদানির জন্য বহু চেষ্টা করেও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা পাননি বলে জানান অশোক পাল।

তাদের দাবি, সরকারি বা বিসিকের কারিগরি সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ এবং সরাসরি রপ্তানির সুযোগ পেলে এই কুটির শিল্প আরও বিস্তৃত হতে পারে।

অরুন পাল জানান, তাদের কাঠের কলম ভারতের কলকাতার বিভিন্ন বিপণন, যাদবপুর ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রচুর চাহিদা রয়েছে। আগে সেখানে প্রচুর কলম বিক্রি হতো। বর্তমানে বর্ডারে আটকে যাচ্ছে এসব কলম। সরকারিভাবে সহজে পাঠানো গেলে দেশেরও ট্যাক্স বাড়বে বলে তিনি জানান।

ফকিরহাট কাজি আজহার আলি কলেজের শিক্ষক আবু সাঈদ মল্লিক বলেন, মিথুন কুটির শিল্পের উৎপাদিত কলমগুলো প্লাস্টিকের বদলে কাঠ দিয়ে তৈরি, যা পরিবেশ বান্ধব। কলমগুলো দেখতে সুন্দর এবং লিখেও স্বাচ্ছন্দ লাগে। তারা প্রয়োজনীয় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ফকিরহাটের ধনপোতার এই কাঠের কলম একদিন আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পরিচিতি আরও বাড়াতে সক্ষম হবে বলে জানান তিনি।

ফকিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রোকনুজ জামান বলেন, কাঠের কলম একটি ব্যতিক্রমধর্মী কুটির শিল্প, যা আমাদের শেকড়ের ঐহিত্যকে মনে করিয়ে দেয়। আমি তাদের সমস্যাগুলো সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করব। বিশেষ করে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলব।