শামিম শিকদার ও রানা কবীর।।
নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে (২৩ জুন) কেন্দ্র করে খুলনায় বিশৃঙ্খলা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। সম্প্রতি নগরী ও এর আশপাশের এলাকায় ছাত্রলীগ-যুবলীগের ব্যানারে আকস্মিক ‘ঝটিকা মিছিল’ ও শোডাউন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত মহড়া বলে তথ্য মিলেছে। সচেতন মহলের অভিযোগ, পুলিশের একশ্রেণীর কর্মকর্তার চরম ‘আওয়ামী প্রীতি’, উদাসীনতা ও দায়সারা নজরদারির সুযোগ নিয়েই নিষিদ্ধ এই সংগঠনের নেতাকর্মীরা ভেতরে ভেতরে সংগঠিত হওয়ার সাহস পাচ্ছে। তবে এই পুরো প্রক্রিয়ার নেপথ্যে মাঠের সাধারণ কর্মীদের চেয়েও বেশি সক্রিয় ভূমিকা রাখছে পেশাজীবীদের একটি শক্তিশালী ‘আন্ডারগ্রাউন্ড সিন্ডিকেট’।
‘ট্যাকটিক্যাল ব্যাকআপ’ দিচ্ছে আইনজীবী ও সাংবাদিকদের গোপন চক্র: অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঝটিকা মিছিলের পরিকল্পনা, রুট নির্ধারণ এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের জড়ো করার মূল মস্তিস্ক হিসেবে কাজ করছে স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক ও আইনজীবী। এই চক্রটি মূলত দুই ধরনের সুবিধা দিয়ে নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মীদের মাঠে নামতে প্ররোচিত করছে- ১. আইনি সুরক্ষার আশ্বাস (লিগ্যাল শিল্ড): মাঠের কোনো কর্মী গ্রেপ্তার হলে তাৎক্ষণিক জামিন, আইনি লড়াই এবং পুলিশি হয়রানি থেকে বাঁচানোর পুরো দায়িত্ব নিয়েছে সিন্ডিকেটের আইনজীবী সদস্যরা।
২. মিডিয়া ও প্রোপাগান্ডা কাভারেজ: ঝটিকা মিছিলের ছবি ও ভিডিও ক্লিপস কীভাবে দ্রুত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে “দল এখনো মাঠে সক্রিয়”Ñএমন একটি আবহ তৈরি করা যায়, তার ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করছে সিন্ডিকেটের সাংবাদিক সদস্যরা। এমনকি মূলধারার গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় এই খবরগুলোকে বড় করে প্রচারের নেপথ্য ইন্ধনও আসছে তাদের কাছ থেকে। পাশাপাশি, নামসর্বস্ব কিছু ‘ফেসবুক সাংবাদিককে স্পট থেকে লাইভ চালানোর জন্য ইতোমধ্যে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আবার দলীয় সদস্য এমন কয়েকজন সাংবাদিক বিভিন্ন ছদ্মাবেশে একের পর বৈঠকের অভিযোগ উঠেছে- আওয়ামী লীগ, সাবেক ছাত্রলীগ-যুবলীগএ ধরণের একটি তালিকা গোয়েন্দা সংস্থার হাতে এসেছে।
এনক্রিপ্টেড অ্যাপসে ভার্চুয়াল বৈঠক ও অর্থায়ন: নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে এই চক্রটি সাধারণ মোবাইল কল বা স্বাভাবিক মেসেজ সম্পূর্ণ বর্জন করেছে। তারা যোগাযোগ রক্ষা করছে মূলত ‘সিগন্যাল’ ও ‘হোয়াটসঅ্যাপ’-এর মতো অ্যান্ড-টু-অ্যান্ড এনক্রিপ্টেড অ্যাপসের মাধ্যমে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, বিগত এক সপ্তাহে এই চক্রটি অন্তত চারবার ভার্চুয়াল গোপন বৈঠক করেছে। এসব বৈঠকে খুলনা জেলার রূপসা, নগরীর খালিশপুর এবং দৌলতপুর এলাকাকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে শো-ডাউনের ছক আঁকা হয়েছে। এই ঝটিকা মিছিল ও ভার্চুয়াল প্রচারণার পেছনে বড় অঙ্কের একটি গোপন ফাণ্ড কাজ করছে, যার জোগান দিচ্ছেন খুলনার সাবেক কয়েকজন প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি ও শিল্পপতি। এই অর্থ মূলত ডিজিটাল হুন্ডি এবং ছদ্মবেশী মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু এজেন্টের কাছে পৌঁছানো হচ্ছে।

রূপসা সেতু বাইপাসে যুবলীগের মোটরসাইকেল মহড়া: গোপন তৎপরতার মাঝেই গত শুক্রবার (১৯ জুন) খুলনায় জেলা যুবলীগের উদ্যোগে নগরীর রূপসা সেতু বাইপাস সড়কের লতা নামক জায়গা থেকে একটি বিশাল মোটরসাইকেল শোডাউন দেওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, ২২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর কাজী আবুল কালাম আজাদ বিকুর ভাইপো ও যুবলীগ নেতা মোঃ শিবলু কাজী, ২২ নং ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোঃ পলাশ এবং নতুন বাজার বাঁশপট্টি এলাকার মো. সোহাগসহ আরও অনেকেই সশরীরে উপস্থিত থেকে এই মিছিলে নেতৃত্ব দেন। নিষিদ্ধ সংগঠনের এই প্রকাশ্য মহড়া নগরবাসীর মনে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
পুলিশের নীরবতা রহস্যজনক : মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক চৌধুরী হাসানুর রশিদ মিরাজ বলেন, আওয়ামী লীগ যদি রাজনৈতিক দল হতো তাহলে আমরা রাজনৈতিকভাবে তাদের মোকাবেলা করতাম। নিষিদ্ধ দলের ব্যাপারে ভুমিকা নিবেন পুলিশ প্রশাসন। খুলনার অধিকাংশ পুলিশ সদস্য বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে সুবিধাভোগী। সাবেক একটি বিশেষ বাড়ির সাথে গভীর সখ্যতা থাকায় পুলিশ তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে না।
এছাড়া বিগত সময়ে যে সকল সাংবাদিক-আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশাজীবি সংগঠনের আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন, তারা এখন প্রশাসনের সামনে দিয়ে নির্বিঘ্নে চলাফেরা করছেন। পুলিশের উচিৎ তাদের ওপর নজরদারি করা। তিনি অভিযোগ করে বলেন, কয়েকজন আইনজীবী ও সাংবাদিক নেপথ্যে থেকে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কর্মকান্ড পরিচালনা করছে। মিরাজ বলেন, খুলনায় নিষিদ্ধ সংগঠনের ব্যানারে প্রকাশ্যে মিছিল-শোডাউন হচ্ছে, অথচ অজ্ঞাত কারণে পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করছে না, এমনকি কোনো মামলাও করা হচ্ছে না। এই নীরবতা রহস্যজনক।
‘আওয়ামী লীগ এখন একটি মাফিয়া দল, কঠোর ব্যবস্থা’: এদিকে, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের নাশকতা বা বিশৃঙ্খলা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শনিবার (২০ জুন) দুপুরে সচিবালয়ে পুলিশ সদস্যদের পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের এই নির্দেশনার কথা জানান।
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন. বর্তমান সরকার আওয়ামী লীগকে কোনো রাজনৈতিক দল হিসেবে গণ্য করে না, বরং এটি একটি ‘মাফিয়া দল’। দলটির সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম বর্তমানে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই অবস্থায় তাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে বিষয়ে বিশেষ নজরদারি ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

‘রেড অ্যালার্ট’ ও কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স: পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে সম্প্রতি পুলিশ সদরদপ্তর থেকে খুলনাসহ দেশের সব কটি রেঞ্জ, জেলা ও মেট্রোপলিটন ইউনিটকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকার ‘কড়া বার্তা’ পাঠানো হয়েছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মূল দিনে নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশে বা আচমকা বড় জমায়েত করে অন্যান্য সক্রিয় রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠনের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়ানোর অপচেষ্টা করতে পারে।
এরই প্রেক্ষিতে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং জেলা পুলিশ তাদের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স (পাল্টা গোয়েন্দা নজরদারি) বাড়িয়েছে। বিশেষ করে সাইবার ক্রাইম ইউনিট ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে চব্বিশ ঘণ্টা নজরদারি চালাচ্ছে।
খুলনা পুলিশ সুপারের কঠোর হুঁশিয়ারি: খুলনা জেলা পুলিশ সুপার তাজুল ইসলাম বলেন, আমরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছি। শুধু মাঠের অপরাধীদেরই নয়, বরং যারা পর্দার আড়াল থেকে অর্থ ও পরামর্শদাতারা এই নিষিদ্ধ অপতৎপরতাকে উসকে দিচ্ছে=তাদের প্রত্যেকের প্রোফাইল তৈরি করছি। অপরাধীর কোনো পেশাগত পরিচয় নেই। জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার চেষ্টা হলে এবার শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) নীতিতে কঠোর আইনি অ্যাকশন নেওয়া হবে।











































