Home আঞ্চলিক ১২বছরের ব্যবধানে বেদনাদায়ক ঘটনার পুনরাবৃত্তি; সন্তান হারিয়ে বাবা মা শোকে পাথর

১২বছরের ব্যবধানে বেদনাদায়ক ঘটনার পুনরাবৃত্তি; সন্তান হারিয়ে বাবা মা শোকে পাথর

7

১২ বছরের ব্যবধানে মর্মান্তিক বেদনাদায়ক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। তবে এবার সব শেষ। শেষ অবলম্বন টুকু আর রইলো না। রইলো না মধুর ডাক মা-আব্বু বলে ডাকার আর কেউ।

এক যুগের ব্যবধানে দুই সন্তানের পানিতে ডুবে মৃত্যু। এখন সন্তান শুন্য ঘর।

১৪বছরের কিশোর সন্তানের সাথে মায়া, মমতা, গভীর ভালোবাসার আদান-প্রদান যেখানে গাড় থেকে মধুর পর্যায়ে। ঠিক তখনই বিচ্ছেদ। এখন কি করে বাঁচবে। কাকে নিয়ে বাঁচবে বাবা-মা। ১২বছর আগে ২০০৮ সালে বড় ছেলে শুভর বয়স যখন ১২ বছর। তখন বাড়ির পাশে পুকুরে গোসল করতে গিয়ে পানিতে ডুবে বড় ছেলে শুভ’মৃত্যু হয়। তখন ছোট ছেলে নূহ’বয়স দুই বছর। সেদিন শুভর মৃত্যু দেখে সন্তান হারানোর শোকে মায়ের আর্তনাদ কান্নার আহাজারিতে একসময় মা শাহানাজ পারভীন অসুস্থ হয়ে পড়ে। দুই বছরের সন্তান এই নূহকে তখন মায়ের কোলে বসিয়ে দেয়। আর স্বজনরা বলেছিলেন এক ছেলে চলে গিয়েছে এই ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে তোমাকে বাঁচতে হবে। তোর কিছু হয়ে গেলে, নূহ’কি হবে?

তখন মা শাহানাজ নূহকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। পর্যন্ত ছেলেকে কখনো চোখের আড়াল হতে দেননি। কিন্তু বিধাতার কি নির্মম পরিহাস আবারও একই মর্মান্তিক বেদনাদায়ক ঘটনার পুনরাবৃত্তি। শুধু সময়ের পার্থক্য ১২বছর। আবু হুসাইন নূহ বড় ভাই শুভ’পথ ধরে চলে গেলেন। তখন না হয়, নূহ ছিলেন মায়ের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন হিসাবে। এখন মা শাহানাজ পারভীন বাবা মুসা মালিথা দম্পতি কি নিয়ে বাঁচবেন। মা আব্বু বলে ডাকার কেউ যে আর রইলো না। এদের একমাত্র আদরের সন্তান অবলম্বন ছিল এই আবু হুসাইন নূহ। বাবার সাথে ছিল ছেলের বন্ধুত্ব সম্পর্ক আচার ব্যবহার বাবার মত হওয়ায় নিজের ছায়া দেখতেন বাবা মুসা মালিথা। নূহ’মৃত্যুর সংবাদ দুরে অবস্থান করা বাবা কে দেওয়া হয়নি। কারণ খবর শুনে বাড়ি পর্যন্ত আসতে পারবে না। বাড়িতে এসে নূহ নেই জানতে পেরে বাবা মুসা এখন বাকরুদ্ধ। বাবা মা শোকে পাথর হয়ে পড়েছে। এঘটনা কুষ্টিয়া ভেড়ামারা উপজেলার মোকারিমপুর ইউনিয়নের গোলাপনগর স্টেশন পাড়া গ্রামে।

স্থানীয় ব্যক্তি আবু হুসাইন নূহ’বন্ধুদের সূত্রে জানাগেছে, গতকাল সোমবার জহুরের নামাজ পড়ে বাড়িতে আসে নূহ। বাড়িতে ২০-২৫ মিনিট অবস্থান করে। এরপর যখন বের হয়, তখন মা বলে রোজা মুখে এই দুপুরে কোথায় যাস। নূহ মাকে বলে মা আমি জিজি স্কুলের মাঠে যাচ্ছি। মা বলে তুই তাড়াতাড়ি চলে আসবি আমি তোর পছন্দের ইফতার বানাচ্ছি এসে দেখে নিবি সব ঠিক আছে কিনা বুঝলি। দুরে কোথাও যাবিনা। বুঝেছি মা দুরে না, কাছেই আমি তাড়াতাড়িই ফিরবো। মা তুমি ভেবো না। এই ছিল মা ছেলের শেষ কথা। প্রতক্ষ্যদর্শী বন্ধু তানভীর জানান, বাড়ির পাশেই পদ্মা নদী। স্থানীয় চার বন্ধু মোটরসাইকেলে পদ্মা নদীর হাডিং ব্রিজ এলাকায় গোসল করতে যায়।

হার্ডিং ব্রিজ লালন শাহ সেতুর মাঝামাঝি স্থানে ৪বন্ধু তানভীর, আরন, রিয়াদ, নূহ পদ্মা নদীর পানিতে নামে গোসল করতে।

রিয়াদ নূহ সাঁতার জানে না। তাই হাঁটু পানিতে দুজনার বসিয়ে রেখে গেছে অপর দুই বন্ধু। তানভীর আরন সাঁতার জানায় ওরা বুক সমান পানিতে নেমেছে।

এসময় নূহ বলে আমিও আসবো তোদের কাছে? ওরা দুই বন্ধু বলে ওখানেই থাক কোথাও যাবিনা।

কিন্তু নূহ আস্তে আস্তে বেশী পানিতে নামতে থাকে। একসময় পানির নিচে খাদ ছিল, সেখানে পড়ে যায়। তখন বন্ধু আরন কে নূহ বলে আমার পায়ের নিচে মাটি নেই, ডুবে যাচ্ছি আমাকে বাঁচা। আরন হাত চেপে ধরে। সেসময় দুজনেই পানিতে হাবু ডুবু খায়। এক পর্যায়ে দুজন তলিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর আরন উঠে পড়ে। আরন বন্ধুদের বলে নূহ আমার হাত ছেড়ে দিয়েছে ওকে বাঁচা। নদীতে অনেকে গোসল করছিল।

বন্ধুদের চিৎকারে আশে পাশের লোকজন ছুটে এসে নূহকে আর পায়নি। গভীর পানিতে নূহ তলীয়ে যায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা, জেলে পুলিশ নিখোঁজ নূহ কে খোঁজা শুরু করে। সাড়ে তিনটার সময় ঘটনা ঘটে। এর আড়াই ঘন্টা পর আবু হুসাইন নূহ’মৃতূদেহ সেতুর নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়।

ভেড়ামারা ফায়ার সার্ভিসের ষ্টেশন অফিসার প্রবীর কুমার দেবনাথ বলেন খবর পেয়ে ঘটনা স্থলে পৌঁছামাত্র ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা নদীতে নেমে নিখোঁজের সন্ধান করতে থাকে। ডুবে যাওয়া স্থানে এর আশেপাশে অনেক জায়গাজুড়ে খোঁজাখুজি করা হয়। ঘটনার আড়াই ঘন্টা পর সেতুর নিচে থেকে নূহর মৃতদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। নদীর গভীরতা বেশী। কোথাও আবার বড় গর্ত। সকলকেই গোসল করতে গিয়ে সাবধান হওয়া উচিত। সাঁতার না জানা মানুষের নদীতে নামা উচিত নয়।

নূহ’বন্ধু মোহাম্মদ সৈকত ইসলাম বলেন সে আমাদের খুব ভাল বন্ধু ছিল। সে দুরে কোথাও বেশিক্ষন থাকত না। মা চিন্তা করবে কথা বলে চলে আসতো। কখনো কাউকে কোন কষ্ট দিত না।

নূহ’চাচা মোঃ মোজাম্মেল হক বলেন, নূহ বাহাদুরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর কারিগরি শাখার ছাত্র ছিল। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করত।

আমার নূহ অনেক ভালো ছাত্র ছিল। ভাই ভাবি এখন কি নিয়ে বাঁচবে। তাদের এখন কি বলে শান্তনা দিবো।

স্কুলছাত্র নুহু’মৃত্যুতে শুধু গোলাপনগর এলাকায় নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মর্মান্তিক ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে ভেড়ামারা জুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে।

নদী থেকে যখন স্কুল ছাত্র আবু হুসাইন নূহ(১৪) লাশ নদী থেকে উদ্ধার করে ইফতারের আগে বাড়িতে নিয়ে আসে। সেসময় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারনা ঘটে।

এসময় এলাকাবাসী আত্মীয় স্বজনের গগণবিদারী আত্মচিৎকার কান্নায় সেখানকার পরিবেশ ভারি হয়ে উঠে।

উপস্থিত হাজারো মানুষ চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারেনি। 

স্থানীয় বাসীন্দারা বলতে থাকেন, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা এমন অকাল মৃত্যু না হয়। কোন মা বাবার জীবনে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর যেন না ঘটে। কোন মায়ের কোল যেন খালি না হয়।

মোঃ রেজাউর রহমান তনু,কুষ্টিয়া