কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি।।
খুলনার কয়রা উপজেলার উপকূলীয় জনপদের বাসিন্দাদের জানমাল সুরক্ষায় ২০২২ সালে দুর্বল বেড়িবাঁধ উন্নয়নে পুনর্বাসন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তত্ত্বাবধানে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও ১ হাজার ১৭২ কোটি টাকার প্রকল্পটির অর্ধেক কাজও শেষ হয়নি। সর্বশেষ প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। আগামী বর্ষায় নদীভাঙনের আশঙ্কা প্রকাশ করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে।
প্রতি বছরের মে-জুন মাসে নদীতীরবর্তী বাঁধের নানা জায়গায় ভাঙন দেখা দেয়। এলাকাবাসী জানায়, বছরের এই সময়ে নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করে। এতে দুর্বল বাঁধের কোনো না কোনো অংশ ভেঙে যায়। ফলে নোনাপানিতে প্লাবিত হয় এলাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষিজমি, চিংড়ি ঘের, ঘরবাড়ি। এসব বিবেচনায় নিয়ে স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে দুর্বল বাঁধ টেকসই ও মজবুত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের অনিয়ম, অদক্ষতা ও উদাসীনতার কারণে সরকারের মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হতে চলেছে বলে তাদের অভিযোগ।
পাউবো সূত্র জানায়, প্রকল্পটির আওতায় শাকবাড়িয়া ও কপোতাক্ষ নদ-তীরবর্তী ৩২ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কার ও টেকসই করা হবে। মোট ৪৮টি প্যাকেজে বিভক্ত প্রকল্পটি পাউবোর খুলনা ও সাতক্ষীরা-২ বিভাগ যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে। সাতক্ষীরা-২ বিভাগের আওতায় ২৫টি ও খুলনা-২ বিভাগের আওতায় ২৩টি প্যাকেজ রয়েছে। এসব প্যাকেজে উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে আছে–বাঁধের উচ্চতা ও প্রশস্ততা বৃদ্ধি, ঢাল সংরক্ষণ, নদীশাসন ও চর বনায়ন।
সব মিলিয়ে ২৫টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আমিন অ্যান্ড কোম্পানি, এম এম বিল্ডার্স, আমীর ইঞ্জিনিয়ারিং ও বেঙ্গল গ্রুপ নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের বেশির ভাগ কাজ বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি দেখানো হয়েছে ৪৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ।
গত শুক্র ও শনিবার প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ প্যাকেজে মাটির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে এই কাজের সময় বিভিন্ন স্থানে চর বনায়নের অসংখ্য গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এ ছাড়া বাঁধের নিকটবর্তী চরের মাটি কেটে উচ্চতা ও প্রশস্ততা বাড়ানো হয়েছে। সেই সঙ্গে বাঁধের ঢাল সংরক্ষণ কাজের জন্য ভাঙনকবলিত জায়গার কাছাকাছি এলাকার নদী থেকে বালু তোলা হয়েছে। এলাকাবাসীর ভাষ্য, এ কারণে ভাঙনের ঝুঁকি উল্টো বেড়েছে। জোড়শিং বাজারের উত্তর পাশে হারেজখালি এলাকায় প্রায় দেড় হাজার মিটার বাঁধের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে সেখানকার দুই পাশের মাটি ধসে পড়তে দেখা গেছে। এ ছাড়া হেরিংবন্ডের ইট উঠে বাঁধের দুই পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এর একটু দূরে বীণাপাণি এলাকায় প্রায় এক কিলোমিটার বাঁধের দুই পাশে মাটি উঁচু করে মাঝখানে বালু দিয়ে ভরাট করা হচ্ছে।
দেখা গেছে, প্রকল্পের গোলখালি এলাকায় প্রায় ৫০০ মিটার ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের কাজ এখন পর্যন্ত শুরুই হয়নি। প্রকল্পের এই অংশটি বাস্তবায়ন করছে নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। বর্ধিত মেয়াদ অনুযায়ী ২০২৫ সালের নভেম্বরে এখানকার কাজ শেষ হওয়া কথা।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের আহ্বায়ক এম আনোয়ার হোসেন বলেন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যা থেকে উপকূলের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় প্রকল্পটি প্রশংসনীয়। কিন্তু সময়মতো কাজ শেষ না করা হলে এটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
উত্তর বেদকাশি ইউপি চেয়ারম্যান সরদার নুরুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পের কাজে ধীরগতির সঙ্গে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে নদীশাসনের জন্য ২০ লাখ বালুর বস্তা ডাম্পিংয়ের ক্ষেত্রে বেশি অনিয়ম হয়েছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আমিন অ্যান্ড কোম্পানির রুহুল আমিনের দাবি, এ প্রকল্পে তাঁর প্রতিষ্ঠানের কাজের অগ্রগতি গড়ে ৭৫ শতাংশ। বর্ধিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ হবে। প্রকল্পে অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানের কোনো কাজে অসংগতি অথবা ত্রুটি থাকলে প্রকল্পের নিয়ম মেনে তা মেরামতের সুযোগ রয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক ও পাউবোর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. আবুল বাশার বলেন, প্রকল্পটি ২০২২ সালে অনুমোদন হলেও নকশা তৈরি ও টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করতে দেরি হয়েছে। জমি অধিগ্রহণেও জটিলতা ছিল, তাই কাজে ধীরগতি দেখা দিতে পারে। কাজে অনিয়মের প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেবেন।











































