নড়াইল প্রতিনিধি ||
নড়াইলের ইছামতি, চাঁচুড়ি, কুমড়ি, ঘাঘা, ইতনা ও নলামারার বিলগুলোতে একসময় শামুকের বেশ প্রাচুর্য ছিল। বর্ষা ও শীত মৌসুমে বিলের পানিতে, কাদায় ও জলজ উদ্ভিদের আশপাশে অসংখ্য শামুক দেখা যেত। এগুলো ছিল বিলের জলজ পরিবেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাছ, হাঁসসহ বিভিন্ন জলজ ও পরিযায়ী পাখির খাদ্যের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল এই শামুক। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বিল ও জলাশয় থেকে নির্বিচারে শামুক নিধন করায় বিলগুলোতে শামুক আশঙ্কাজনক হারে কমে এসেছে।
শামুক কমে যাওয়ায় এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে পুরো জলজ পরিবেশে। কমছে বিভিন্ন পাখির খাদ্যের প্রাপ্যতা। কোথাও কোথাও পানির স্বাভাবিক পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে। ফলে হুমকির মুখে পড়ছে মাছ, জলজ উদ্ভিদ, পাখি ও অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণীর আবাসস্থল।
শনিবার (১০ অক্টোবর) বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, দল বেঁধে বিলে শামুক সংগ্রহ করছেন নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ। শামুক সংগ্রহ করতে পিছিয়ে নেই শিশুরাও। কেউ হাতে ঝুড়ি বা বস্তা, আবার কেউ কেউ মাটির ভাঁড় ব্যবহার করে বিলের অগভীর পানি ও কাদামাটি থেকে শামুক তুলে নিচ্ছেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জমে উঠছে বিপুল পরিমাণ শামুক।
চাঁচুড়ি গ্রামের সাজ্জাদ হোসেন জানান, সংগৃহীত শামুকের একটি অংশ স্থানীয়ভাবে বিক্রি হয়। আবার বড় একটি অংশ মাছের খাবার হিসেবে বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। শামুকের খোসা ও মাংস বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় এর ভালো দাম রয়েছে। ফলে চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এর আহরণ।
ইছামতি বিল এলাকার আনিস শেখ বলেন, বিল থেকে যারা শামুক কুড়াচ্ছেন, ছোট শামুকও তাদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। এসব শামুক হাঁসের খাবার হিসেবে উপযোগী। কিন্তু ছোট শামুক তুলে নেওয়ায় প্রাকৃতিকভাবে এর বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিল থেকে শামুকের স্বাভাবিক অস্তিত্বই সংকটে পড়তে পারে।
শামুক সংগ্রহের সঙ্গে জড়িত ঘাঘা গ্রামের আবির মিয়া জানান, তাদের মতো অনেকেই জীবিকার তাগিদে শামুক কুড়ানোর কাজ করেন। তাদের মতে, অন্য কাজের সুযোগ সীমিত থাকায় বিল থেকে শামুক সংগ্রহ করে বিক্রি করেই সংসার চালাতে হয়। তবে পরিবেশকর্মীদের প্রশ্ন, জীবিকার প্রয়োজন থাকলেও কোনো জলজ সম্পদ এভাবে নির্বিচারে আহরণ করা কি সঠিক?
কৃষিবিদ রঘুনাথ কর জানান, একটি জলাশয়ের জীববৈচিত্র্য টিকে থাকে অসংখ্য জীবের পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ওপর। শামুকও সেই ব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, পাখি ও জলজ প্রাণীর খাদ্য হিসেবে শামুক ব্যবহৃত হয়। আবার জলজ পরিবেশে জৈব পদার্থের প্রক্রিয়াকরণ ও পুষ্টি উপাদানের পুনর্ব্যবহারেও শামুক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পাখিপ্রেমী সিদ্দিকুর রহমান জানান, নড়াইলের বিভিন্ন বিল শীত মৌসুমে অতিথি পাখির অন্যতম প্রধান বিচরণক্ষেত্র। প্রতি বছর শীতের শুরুতে দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখি এসব জলাশয়ে আসে। তবে আগের তুলনায় অনেক বিলেই অতিথি পাখির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। শামুক নিধনের ফলে খাদ্যসংকট দেখা দেওয়ায় শীত মৌসুমে বিলগুলোতে পাখির বিচরণ কমে গেছে বলে তিনি ধারণা করেন।
নড়াইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, শামুক মাটির উর্বরাশক্তি বৃদ্ধি করে। শামুক মাটির নিচে চলাফেরার সময় মাটি আলগা করে, যার ফলে মাটিতে বাতাস চলাচলের পথ তৈরি হয়। এ ছাড়া শামুকের বর্জ্য মাটিতে মিশে মাটির উর্বরাশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে।
নড়াইল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, শামুক পানির ফিল্টার হিসেবে কাজ করে। পানির নিচে থাকা দূষিত পদার্থ পরিশোধনে ভূমিকা রেখে পানিকে তুলনামূলক পরিষ্কার রাখতে এবং মাছের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করে। তবে দিন দিন কিছু অসাধু মৎস্যচাষি নির্বিচারে শামুক নিধন করে মাছ ও চিংড়ির খাবারসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করছেন, যা প্রাকৃতিক পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলছে।








































