স্টাফ রিপোর্টার।।
খুলনা নগরীতে জলাবদ্ধতা ও পয়োনিষ্কাশন সংকট নিরসনের ‘খুলনা পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটির কাজে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২৭০ কোটি টাকা। পাশাপাশি মেয়াদ বৃদ্ধি করে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির প্রথম সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) অনুমোদন দেওয়া হয়। নতুন সংযোজিত পরিকল্পনায় রয়েছে হাউজ কানেকশন ও রাস্তা সংস্কারের কাজ। এখানে মোট ব্যয় ৫১২ কোটি টাকা ধরা হলেও প্রকল্পের অন্যান্য পর্যায় থেকে ব্যয় কমেছে প্রায় ২৪২ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে একনেকে নতুন করে অনুমোদন পেয়েছে প্রায় ২৩০ কোটি টাকা।
এদিকে নাগরিক সমাজ বলছে, প্রকৌশলগত কাজে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের ব্যর্থতার কারণে নতুন করে পরিকল্পনা করতে হয়েছে। পুনরায় নগরীর রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করতে হবে। এতে নতুন করে নগরবাসীর ভোগান্তি আবার তৈরি হবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে খুলনা নগরীর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা একটি শৃঙ্খলার মধ্যে আসবে। পয়োবর্জ্য ব্যবস্থায় আধুনিকতা আসবে। তবে প্রকল্পে হাউজ কানেকশনে নতুন করে ব্যয় বেড়েছে। একটি বাড়ি থেকে পয়োবর্জ্য নিষ্কাশন সংযোগ পথ তৈরি করতে প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা খরচ হবে। অনেক বাড়ির মালিক বাড়তি ব্যয়ের কারণে নিষ্কাশন সংযোগ ব্যবস্থা করতে নাও চাইতে পারেন। তখন প্রকল্পটি চালু হতে সমস্যা হবে। এজন্য বাড়ি থেকে সংযোগ পথ তৈরি করে দেওয়া হবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে এই ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়েছে।
অন্যদিকে খুলনা সিটি করপোরেশনের বিদ্যমান রাস্তা খুঁড়ে প্রকল্পের কাজ করা হয়েছে। যা ওয়াসা সংস্কার করে দেবে। এখানে ব্যয় হবে প্রায় ২৪২ কোটি টাকা। ব্যয় প্রকল্পের অন্যান্য খাতের ব্যয় থেকে সংযোজন বিয়োজন করা হয়েছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের ২৮ জুলাই ‘খুলনা পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন’ প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়। টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্নের পর একই বছরের অক্টোবরে ম্যাঙ্ ইনফ্রাকচার লিমিটেড কোম্পানি কাজ শুরু করে। কিন্তু কোভিডÑ১৯ এর কারণে ২০২২ সালের অক্টোবরে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু হয়। এ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৩৩৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) ঋণ ১ হাজার ৪০৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা এবং সরকারের নিজস্ব তহবিলের রয়েছে ৯২৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এর মধ্যে বর্তমানে ভৌত অগ্রগতি ৮০ শতাংশ হয়েছে। তবে সম্প্রতি প্রকল্পে নতুন পরিকল্পনা গৃহীত হয়ে ২৭০ কোটি টাকা ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
ওয়াসার এক কর্মকর্তা বলেন, ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন। এছাড়া নির্মাণসামগ্রীর মূল্য এবং প্রকল্পের কাজের পরিধি বৃদ্ধি। ডলারের বিনিময় হার ৮৫ থেকে বেড়ে ১২২ টাকা হওয়ায় অতিরিক্ত ১৪৮ কোটি টাকা ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি বাড়ির অভ্যন্তরে পূর্ণাঙ্গ স্যুয়ার সংযোগ যুক্ত করায় ১৭০ কোটি এবং রাস্তা পুনর্বাসন ও প্রশস্ত খননের কারণে ব্যয় বেড়েছে ২০৪ কোটি টাকা। তবে প্রকল্পে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ১৬ কোটি ডলারের ঋণের পরিমাণ অপরিবর্তিত রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খুলনা নগরীর প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিটি বাড়ির সামনেই পয়ঃনিষ্কাশনের পাইপ বসানো হয়েছে। ওই পাইপ দিয়ে বর্জ্য পানি ও সেপটিক ট্যাংকের পানি নগরীর ভেতরের আটটি পাম্প স্টেশনে যাবে। সেখান থেকে পাম্প করে বর্জ্য নগরীর বাইরে মাথাভাঙ্গা ও ঠিকারাবাঁধে পরিশোধন কেন্দ্র দুটিতে পাঠানো হবে। সেখান থেকে তরল অংশ নদীতে যাবে এবং সলিড অংশ জৈব সার তৈরির জন্য রিফাইনিং করার ব্যবস্থা করা হবে। দুইটি শোধনাগারে প্রতিদিন প্রায় ৫২ লাখ লিটার পয়োবর্জ্য শোধন করা হবে। এছাড়া এখনো এ ব্যবস্থার আওতায় না আসা বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য ট্রাকে করে নিয়ে শোধন করা হবে।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, প্রকৌশলগত কাজে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা ব্যর্থ। ব্যর্থতার কারণেই নতুন করে পরিকল্পনা করতে হয়েছে। পরিকল্পনা না করেই কাজ করায় নতুন করে পুনরায় রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করতে হবে। আবার নগরবাসীকে ভোগান্তিতে পড়তে হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্পে নতুন পরিকল্পনা মানে নতুন ব্যয়। ব্যয় কমিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। একইসঙ্গে প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা কমাতে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতা বাস্তবায়ন করতে হবে।
‘খুলনা পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন’ প্রকল্পের পরিচালক এবং খুলনা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খান সেলিম আহমেদ বলেন, প্রকল্পের কাজ শুরুর প্রাক্কালে কোভিড-১৯ জনিত কারণে ২০২২ সালের অক্টোবরে শুরু হয়। ২০২৩ সালের মেয়র নির্বাচনের সময় প্রায় ৭ মাস কেসিসির নির্দেশে কাজ বন্ধ ছিল। এরপর ২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর প্রায় ৪ মাস কাজ বন্ধ ছিল। তবে আগামী বছরের জুনের মধ্যে সম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করার জন্য আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হবে বলে আশা করছি।
তিনি বলেন, এ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজ বাস্তবায়ন হলে নগরীর প্রায় দশ লাখ মানুষ উন্নত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার আওতায় আসবে। জলাবদ্ধতা ও পয়োনিষ্কাশন সংকট থেকে খুলনা নগরীকে আধুনিকায়ন করাও সম্ভব হবে। এছাড়া প্রতিটি বাড়ি থেকে পয়োবর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা করে দেয়া হবে।











































