বাগেরহাট প্রতিনিধি।।
বাগেরহাটের শরনখোলায় ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের পানির ট্যাংক বিক্রির অভিযোগ উঠেছে ধানসাগর নলবুনিয়া আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল ওহাবের বিরুদ্ধে। সুপেয় পানির সংকট নিরসনে আশ্রয়কেন্দ্রে নির্মিত এই ট্যাংক বিক্রি করায় ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
২০০৭ সালে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় এলাকার মানুষের জন্য একটি বিশেষ ত্রাণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প ‘ফায়েল খায়ের’ কর্মসূচির উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৪ সালের মার্চে স্কুল কাম সাইক্লোন সেল্টার নির্মাণ করা হয় ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তায়। তখন থেকে ধানসাগর নলবুনিয়া আলিম মাদ্রাসার শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা হয়ে আসছে ওই আশ্রয়কেন্দ্রে।
দুর্যোগকালীন সময়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আসা মানুষের সুপেয় পানির সংকট নিরসনে বিশাল কংক্রিটের একটি পানির ট্যাংকি নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছিল।
স্থানীয় সূত্র জানায়, দুর্যোগকালীন সময়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আসা মানুষের সুপেয় পানির সংকট নিরসনে দুটি পানির ট্যাংকি নির্মাণ করে দেওয়া হয়। ছোট ট্যাংক কিছুদিন পূর্বে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল ওহাব অন্যত্র বিক্রি করে দেন। এর কিছুদিন পর পাথরের তৈরি পানির রিজার্ভ বড় ট্যাংক ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন তিনি।
ট্যাংকটি প্রায় ২০ দিন ধরে ড্রিল মেশিন দিয়ে তিন-চারজন শ্রমিক ভাঙ্গার কাজ করছেন। কোনো ধরনের কর্তৃপক্ষের অনুমোদন কিংবা রেজুলেশন ছাড়াই অধ্যক্ষ এটি বিক্রি করে দেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। পানির ট্যাংক এভাবে সরিয়ে নেওয়ায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, স্কুল কাম সাইক্লোন সেল্টারে পরিচালিত ধানসাগর নলবুনিয়া আলিম মাদ্রাসার নিচে পানি সংরক্ষণের জন্য পাথরের তৈরি রিজার্ভ ট্যাংকের বেশ কিছু অংশ ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। ভাঙ্গা পাথরের অংশ পাশেই স্তুপ করে রাখা হয়েছে। সেখানে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিছুদিন ধরে ১০ হাজার লিটার পানি ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন কংক্রিটের ট্যাংক ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে। কি কারণে ভাঙ্গা হচ্ছে জানতে চাইলে তারা কিছুই জানেন না বলে জানান।
স্থানীয় মাদ্রাসার শিক্ষক আবু দাউদ বলেন, “দুর্যোগকালীন সময়ে যখন সুপেয় পানির সংকট হবে তখন এই ট্যাংক ভালো পানি সরবরাহ করবে এমন চিন্তা থেকে তৈরি করা হয়েছিল। ” এটি কেন ভাঙ্গা হলো সে সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ স্যার বলতে পারবেন।”
ধানসাগর নলবুনিয়া আলিম মাদ্রাসার ইংরেজী বিভাগের প্রভাষক আবু খায়ের বলেন, “পানির ট্যাংক ব্যবহার হচ্ছে না, ক্লাস রুম তৈরি করার জন্য এটা ভঙ্গে ফেলা হচ্ছে। এটি কমিটির সিন্ধান্ত কিনা তা আমার জানা নেই। কমিটির লোকজন জানেন।”
অভিযুক্ত ধানসাগর নলবুনিয়া আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল ওহাব বলেন, “কমিটির অনুমোদন নিয়ে রেজুলেশন করে ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে ট্যাংকটি। ”
বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ফায়েল খায়ের কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কিছুদিন আগে ফায়েল খায়ের কর্তৃপক্ষের ইঞ্জিনিয়ার ইব্রাহীম আলী শাহ এখানে পরিদর্শনের এসে ট্যাংকটি ভাঙ্গার নির্দেশনা দেন।”
ধানসাগর নলবুনিয়া আলিম মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আব্দুল জলিল আনোয়ারীর মোবাইলে এ বিষয়ে জানতে একাধিকবার মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
উন্নয়ন প্রকল্প ফায়েল খায়ের (ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক) ইঞ্জিনিয়ার ইব্রাহীম আলী শাহ বলেন, “এগুলো তো ভেঙে ফেলার কথা নয়। কেন ভাঙা হয়েছে, সেটিও আমি জানি না। অকার্য হলেই যে সেটি ভেঙে ফেলতে হবে, বিষয়টি এমন নয়। এটা ভেঙে ফেলার কোন অনুমতি আমাদের এখান থেকে দেওয়া হয়নি। এ ধরনের স্থাপনা ভাঙতে হলে সংশ্লিষ্ট আইডিবি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আগে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। অথচ সেটি ভেঙে ফেলার বিষয়টি আমি আপনার কাছ থেকেই এখন জানতে পারছি।”
তিনি বলেন, “২০২৫ সালের জুন মাসে আমি পরিদর্শনে গিয়ে ছিলাম। গুরুত্বপূর্ন স্থাপনা ভেঙ্গে ফেলার অনুমতি দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। মূলত, বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে সংরক্ষণ এবং পরবর্তীতে তা পরিশোধনের মাধ্যমে খাওয়ার উপযোগী করার লক্ষ্যেই এসব পানির ট্যাংকি নির্মাণ করা হয়েছিল। উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট বিবেচনায় নিয়ে ইসলামী ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি) অধীনে ৩৫টি সাইক্লোন সেন্টারে এ ধরনের বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাই এসব স্থাপনার গুরুত্ব অনেক বেশি। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় যেখানে সুপেয় পানির সংকট রয়েছে, সেখানে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ব্যবহার করার এই ব্যবস্থা মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ”
শরনখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজোয়ান ইফতেকার বলেন, “আমি তাদের ডেকে ছিলাম- তারা আমাকে জানিয়েছে, ম্যানেজিং কমিটির সিদ্বান্তে রেজুলেশন করে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। বিষয়টি আরো খতিয়ে দেখা হবে বলে।”









































