Home আন্তর্জাতিক ইরানের সঙ্গে ব্যবসার অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হুয়াওয়ে

ইরানের সঙ্গে ব্যবসার অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হুয়াওয়ে

2


বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক।।

ইরানের সঙ্গে ব্যবসায় যুক্ত থাকার তথ্য গোপন করে এইচএসবিসিসহ বিভিন্ন ব্যাংককে প্রতারণার অভিযোগে চীনা প্রযুক্তি জায়ান্ট হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে করা মামলা আট বছর পর অবশেষে বিচারের পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের ফেডারেল আদালতে মঙ্গলবার মামলাটির জুরি বাছাই শুরু হয়েছে।

হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে শুধু ইরান-সংক্রান্ত অভিযোগই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক গোপন তথ্য চুরির ষড়যন্ত্রের অভিযোগও রয়েছে। এছাড়া উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের বিষয়ে মিথ্যা তথ্য দেওয়া এবং ২০০৯ সালে তেহরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে বিক্ষোভকারীদের শনাক্ত করতে ইরানকে নজরদারি সরঞ্জাম সরবরাহের অভিযোগও আনা হয়েছে।

মামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নেওয়া প্রথমদিককার এবং সবচেয়ে আলোচিত আইনি লড়াইগুলোর একটি। বিচারটি এমন সময়ে শুরু হলো, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি খাতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হচ্ছে। একই সঙ্গে মার্কিন প্রযুক্তি যেন চীনের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যবহৃত না হয়, তা ঠেকাতে ওয়াশিংটনের প্রচেষ্টাও জোরদার হয়েছে।

হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে মামলার সূত্রপাত ২০১৮ সালে। ওই বছর কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে হুয়াওয়ের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা মেং ওয়ানঝৌকে গ্রেপ্তার করা হলে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও কানাডার মধ্যে বড় ধরনের কূটনৈতিক সংকট তৈরি হয়।

ইরান-সংক্রান্ত অভিযোগে হুয়াওয়ে দোষী সাব্যস্ত হলে ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক কালো তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্তের পক্ষে ওয়াশিংটনের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। সে সময় মার্কিন সরকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করে এমন কথিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।

ব্রুকলিনের ফেডারেল আদালতে মার্কিন জেলা বিচারক অ্যান ডনেলির নেতৃত্বে চলা এই বিচার প্রায় তিন মাস স্থায়ী হতে পারে। বিচার চলাকালীন ২৪ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠকও অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

সম্ভাব্য জুরি সদস্যদের ২৭ পৃষ্ঠার প্রশ্নপত্র পূরণ করতে হয়েছে। এতে চীন ও ইরান সরকারের বিষয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কেও প্রশ্ন রাখা হয়েছে।

হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন, অর্থপাচার, সংঘবদ্ধ অপরাধ, ইলেকট্রনিক প্রতারণা এবং তদন্তে বাধা দেওয়ার মতো অভিযোগও রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং মামলায় নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছে।

মামলাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ গড়ে উঠেছে ইরানে কার্যক্রম পরিচালনাকারী ‘স্কাইকোম’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হুয়াওয়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে। ২০১২ ও ২০১৩ সালে রয়টার্সের অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠান দুটির মধ্যে ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক সম্পর্কের তথ্য উঠে আসে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০১০ সালে স্কাইকোম ইরানের সবচেয়ে বড় মোবাইল ফোন অপারেটরের কাছে অন্তত ১৩ লাখ ইউরো মূল্যের নিষিদ্ধ হিউলেট-প্যাকার্ড কম্পিউটার সরঞ্জাম বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছিল। মেং ওয়ানঝৌ ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০০৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত স্কাইকোমের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উঠে আসে।

মার্কিন অভিযোগ অনুযায়ী, ইরানে হুয়াওয়ের ব্যবসার জন্য নিষিদ্ধ মার্কিন পণ্য, প্রযুক্তি ও সেবা সংগ্রহ এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশটি থেকে অর্থ সরিয়ে নিতে স্কাইকোমকে ব্যবহার করেছিল হুয়াওয়ে।

মার্কিন প্রসিকিউটরদের দাবি, নাম প্রকাশ না করা একটি ব্যাংক স্কাইকোম-সংশ্লিষ্ট ১০ কোটি ডলারের বেশি মার্কিন ডলারের লেনদেন সম্পন্ন করেছিল। রয়টার্সের পর্যালোচনা করা নথি ও সূত্রের মাধ্যমে ব্যাংকটি এইচএসবিসি বলে শনাক্ত করা হয়েছে।

প্রসিকিউটররা আরও অভিযোগ করেন, এইচএসবিসির এক কর্মকর্তার কাছে দেওয়া উপস্থাপনায় মেং হুয়াওয়ের সঙ্গে স্কাইকোমের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছিলেন। পরে প্রসিকিউটরদের সঙ্গে একটি চুক্তির অংশ হিসেবে মেং স্বীকার করেন যে তার দেওয়া কিছু বক্তব্য মিথ্যা ছিল। ওই চুক্তির পর তার বিরুদ্ধে করা অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়।

বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে এই মামলার সমালোচনা করে আসছে। চীনের অভিযোগ, দেশটির প্রযুক্তি খাতের উত্থান ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র বৃহত্তর একটি প্রচারণার অংশ হিসেবে হুয়াওয়েকে টার্গেট করছে।

হুয়াওয়ের এক মুখপাত্র শনিবার দেওয়া এক বিবৃতিতে মার্কিন সরকারের অভিযোগকে ‘প্রমাণযোগ্যভাবে মিথ্যা’ বলে দাবি করেছেন। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, মামলাটি তাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা দুর্বল করার চেষ্টা এবং তথ্য চুরির অভিযোগগুলো বহু আগেই নিষ্পত্তি হওয়া বাণিজ্যিক বিরোধকে নতুনভাবে উপস্থাপন করার শামিল।

বর্তমানে হুয়াওয়ে চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চিপ তৈরির উচ্চাকাঙ্ক্ষার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম ও স্মার্টফোনের ব্যবসার বাইরে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন প্রযুক্তি খাতেও নিজেদের কার্যক্রম সম্প্রসারিত করেছে।

হুয়াওয়ে দোষী সাব্যস্ত হলে অবৈধ কর্মকাণ্ড থেকে অর্জিত সম্পদ বা অর্থ বাজেয়াপ্ত করার আবেদন জানাতে পারে মার্কিন প্রসিকিউশন। সব অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে প্রতিষ্ঠানটিকে বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানার মুখেও পড়তে হতে পারে।