Home জাতীয় র‍্যাব বিলুপ্তে বিল, সংসদে বিতর্ক

র‍্যাব বিলুপ্তে বিল, সংসদে বিতর্ক

2

ঢাকা অফিস।।

র‍্যাব বিলুপ্ত করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠনের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে বিল আনা হয়েছে। ২০০৩ সালে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অর্ডিন্যান্স সংশোধন করে র‍্যাব গঠনের ভিত্তি দেওয়া হয়েছিল। এখন সেটা বাতিল করে নতুন আইনের পাশাপাশি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন পুলিশের জন্যও নতুন একটি আইন করা হচ্ছে। সে বিলটিও বৃহস্পতিবার সংসদে তোলা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল’ সংসদে তুলতে গেলে আপত্তি জানান বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি এসআরবি নামে নতুন এলিট ফোর্স গঠনের আগে সংসদে বিশদ আলোচনার দাবি করেন।

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানও একই আহ্বান জানান। এটি নিয়ে বিরোধী নেতার সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিতর্ক হয়। তবে শেষ পর্যন্ত বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পরে বিলটি পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।

বিল উত্থাপনের বিরোধিতা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, র‍্যাব ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, আয়নাঘর– ইত্যাদি কারণে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল র‍্যাব বিলুপ্ত হবে। বিএনপিও বলেছিল। তারা র‍্যাবের মতো আরেকটি প্রতিষ্ঠান করার কথা বলেনি। এখন নতুন মোড়কে র্যাব পুনর্গঠন করা হচ্ছে। ফ্যাসিবাদের চিহ্ন হচ্ছে র‍্যাব।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, পুলিশের প্রধান ছিলেন কুখ্যাত বেনজীর আহমেদ। সে জন্য কি পুলিশ বিলুপ্ত করে দেব? তিনি বলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল, র‍্যাব নামে কোনো সংগঠন থাকবে না। সেটা বিলুপ্ত করা হচ্ছে। কিন্তু পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিট দরকার।

তখন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, তারা র‍্যাব বিলুপ্তির প্রস্তাব সমর্থন করেন। নতুন একটি সংস্থার বিষয়ে আরও চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

বিলে বলা হয়েছে, র‍্যাবের জনবল, আদেশ, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, বিদ্যমান সুবিধা, তহবিল, নগদ ও ব্যাংকে রাখা অর্থ, দায়, চুক্তি, স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি, রেজিস্ট্রার, রেকর্ডপত্রসহ সব দলিল এসআরবির কাছে স্থানান্তর হবে। পাশাপাশি নতুন আইনে বিধিমালা না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান ২০০৫ সালের বিধিমালায় র‍্যাব-সংক্রান্ত বিভাগীয় শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা বা আদালতের কার্যধারা বহাল থাকবে।

বিলে বলা হয়েছে, পুলিশ বাহিনীর আওতাধীন স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট থাকবে। সরকারের প্রয়োজনীয়তার নিরিখে পুলিশ, শৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্ধারিতসংখ্যক কর্মকর্তা, আর্মড পারসোনেল বা কর্মচারী পদায়ন বা প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে এ ইউনিট গঠিত হবে। ইউনিটের কর্মকর্তা বা আর্মড পারসোনেল বা কর্মচারীদের পদবিন্যাস, নিয়োগ পদ্ধতি ও চাকরির শর্তাবলি বিধি দ্বারা নির্ধারিত হবে। ইউনিটের জন্য বিধি দ্বারা নির্ধারিত একটি পতাকা, প্রতীক ও সুনির্দিষ্ট পোশাক থাকবে। ইউনিটের মহাপরিচালক হবেন পুলিশে কর্মরত একজন অন্যূন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক।

এপিবিএন পাবে তদন্তের ক্ষমতা
অন্যদিকে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস অর্ডিন্যান্স রহিত করে নতুন আইন করতে আরেকটি বিল আনা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল, ২০২৬’ সংসদে উত্থাপন করেন।

এর কারণ সংবলিত বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ও জননিরাপত্তার চাহিদা, অপরাধের ধরন ও প্রকৃতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে। এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের সাংগঠনিক কাঠামো, দায়িত্ব, কার্যাবলি, ক্ষমতা ও জবাবদিহির বিধানগুলো আরও সুস্পষ্ট ও কার্যকরভাবে পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

বিলে বলা হয়েছে, পুলিশ বাহিনীর অধীনে এপিবিএন গঠিত ও পরিচালিত হবে। এই ইউনিটে স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়ন, পার্বত্য ব্যাটালিয়ন, বিমানবন্দর ব্যাটালিয়ন ও অন্য কোনো ব্যাটালিয়ন অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

প্রস্তাবিত আইনে এপিবিএনকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধি ও বিদ্যমান অন্যান্য আইন প্রতিপালন সাপেক্ষে কোনো স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দকরণ ও গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

বিলে এপিবিএনের শৃঙ্খলা ও আচরণ বিধান করা হয়েছে। সংগঠন, মিডিয়া বা সংবাদপত্রে অংশগ্রহণে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, এই ইউনিটের কোনো সদস্য কোনো সংগঠনের সদস্য হতে বা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্টতা রাখতে পারবেন না। তবে পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি বা আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের স্বার্থে পেশাজীবী সংঘ বা সংগঠনের সদস্য হতে পারবেন।

এই ইউনিটের কোনো সদস্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও সংবাদপত্রে কোনো প্রকার তথ্য বা অন্য প্রকার দলিল প্রকাশ করতে পারবেন না বা প্রকাশে সহযোগিতা করতে পারবেন না বা প্রকাশ করার কারণ হবেন না।

ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের বিতর্কিত ধারা বাতিলে বিল
ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের বহুল আলোচিত ১৮(ক) ধারা বিলুপ্ত করতে সংসদে বিল আনা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি সংসদে তোলেন। পরে বিলটি পরীক্ষা করে দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।

বিলে বলা হয়েছে, ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ১৮(ক) ধারা বিলুপ্ত হবে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশে এই ধারাটি ছিল না। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ওই অধ্যাদেশটি সংশোধন করে সংসদ অনুমোদন করেছিল। সেখানে এই ধারাটি যুক্ত করা হয়।

একীভূত হওয়া সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পুরোনো ও বিতর্কিত পরিচালকদের ফেরার সুযোগ নতুন আইনে রেখেছিল বর্তমান সরকার। এজন্য কিছুদিন আগে ব্যাংক রেজল্যুশন আইন সংসদে পাস করার সময় ১৮(ক) ধারা নামে নতুন ধারা যুক্ত করা হয়। তখন এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়।

১৮(ক) ধারায় বলা হয়, কোনো ব্যাংক রেজল্যুশনের আওতায় যাওয়ার আগে যারা শেয়ারধারী ছিলেন, তারা চাইলে পরে আবার সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে অন্য কোনো উপযুক্ত ব্যক্তিকেও এই সুযোগ দিতে পারবে।

এটি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হওয়ার পর সরকার এই ধারাটি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সে অনুযায়ী এই সংশোধনী আনতে বিল আনা হয়েছে।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রী বলেন, আইনটি কার্যকর হওয়ার পর উক্ত ধারার পূর্ণ শর্ত পরিপালন করে ইতোমধ্যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবেদন না করায় ধারাটি বিলুপ্ত করা সমীচীন।

এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইনের সংশোধনী আনতে একটি বেসরকারি বিল এনেছিলেন। তিনি বিলটি সংসদে উত্থাপনের অনুমতি চাইলে অর্থমন্ত্রী এ বিষয়ে বক্তব্য দেন এবং বিলটি প্রত্যাহারের অনুরোধ করেন। তবে নাজিবুর রহমান এটি প্রত্যাহার করতে রাজি হননি। তখন বিষয়টি ভোটে দেওয়া হয়। ভোটে না জয়ী হওয়ায় নাজিবুরকে বিলটি উত্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়নি।

বিলের কপি সরবরাহে বিলম্বে ‘মর্মাহত স্পিকার’
মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদনের পরও আইনসভায় বিল আসতে বিলম্বের কারণে মর্মাহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। তিনি বলেছেন, মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদনের পর বিল যত দ্রুত সম্ভব আইনসভায় পাঠানো উচিত। যেন সব সদস্য আইনটা দেখে আসতে পারেন। এ ক্ষেত্রে ব্যত্যয় দেখা যাচ্ছে, যাতে তিনি খুবই মর্মাহত।

সংসদের বৈঠকে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন বিল উত্থাপনের পরে আলোচনার এক পর্যায়ে এসব কথা বলেন ডেপুটি স্পিকার। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন বিল উত্থাপনের পরে দুই কার্যদিবসের মধ্যে পরীক্ষাপূর্বক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী সংসদীয় কমিটি পাঠানোর প্রস্তাব করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

এতে জামায়াতের নাজিবুর রহমান বলেন, বিল পরীক্ষায় সময় বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। এর আগে জাতীয় মানবাধিকার বিলের প্রতিবেদন দেওয়ার জন্যও দুই কার্যদিবস বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। এর মাধ্যমে সংসদীয় কমিটিকে হাত-পা বেঁধে দেওয়া হচ্ছে।

এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ৮ থেকে ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আইনগুলো পাস করতে হবে। বিলটি সব সদস্যের কাছে পাঠানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, ‘বিষয়টি নজরে এনেছেন অনেকেই, এটা আইনসভা। কিন্তু আমাদের (স্পিকারের) বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার করতে হচ্ছে বারবার। সব সদস্যের কাছে পাঠানো হয়েছে, কিন্তু সবাই পায়নি।’

ডেপুটি স্পিকার বলেন, ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) বিল গত ১০ আগস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হয়। বিলটা অনেক আগেই সংসদে আসতে পারত। এ বিষয়ে পরবর্তী সময়ে নির্বাহী বিভাগকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।