Home Lead বাগেরহাট বিমানবন্দর নির্মাণে আগ্রহী চীন-আমিরাত

বাগেরহাট বিমানবন্দর নির্মাণে আগ্রহী চীন-আমিরাত

1


খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।

বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর দীর্ঘ তিন দশক ধরে নানা জটিলতা ও উদ্যোগের অভাবে আটকে আছে খুলনার কাছে বাগেরহাটের খানজাহান আলী বিমানবন্দর প্রকল্প। অবশেষে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের আগ্রহে আলোর মুখ দেখার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চীন ও আরব আমিরাতের দুটি প্রতিষ্ঠান এই আগ্রহ দেখিয়েছে। প্রায় ৩০ বছর আগে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর মাটি ভরাট ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণের মতো প্রাথমিক কিছু কাজ ছাড়া প্রকল্পটি আর এগোয়নি। একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি বিমানবন্দরটি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিমানবন্দরটি নির্মাণে আগ্রহ দেখিয়েছে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন (সিএমসি) এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) আবুধাবিভিত্তিক বিনিয়োগ ও অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান ইকুইলাইন ফাইন্যান্স। এর মধ্যে ইকুইলাইন ফাইন্যান্স বিমানবন্দরটি নির্মাণের পাশাপাশি আরও কয়েকটি খাত মিলিয়ে প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ২৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে। ওই প্রস্তাবের আওতায় বিমানবন্দর চালুর জন্য অবকাঠামো ও আধুনিকায়নের বিষয়টিও রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট নথি ও সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের ২৭ জানুয়ারি বাগেরহাটের রামপালের ফয়লা এলাকায় খানজাহান আলী বিমানবন্দরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। শুরুতে ৭৫ একর জমি অধিগ্রহণ ও সামান্য মাটি ভরাটের কাজ হলেও প্রকল্প আর এগোয়নি। পরে ২০১১ ও ২০১৮ সালে আরও ৫০০ একরের বেশি জমি অধিগ্রহণ, সীমানা প্রাচীর ও আংশিক মাটি ভরাট করা হয়। কিন্তু রাজনৈতিক টানাপড়েন, বিনিয়োগ জটিলতা ও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে প্রায় তিন দশকেও পূর্ণাঙ্গ বিমানবন্দর নির্মাণ হয়নি। দীর্ঘ এই অচলাবস্থার মধ্যে সম্প্রতি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহে প্রকল্পটি নিয়ে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সূত্র জানায়, গত ৩০ জুলাই চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন (সিএমসি) বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যানের কাছে এ বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক আগ্রহপত্র (এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট-ইওআই) পেশ করে। প্রস্তাবটি বর্তমানে বেবিচক দপ্তরে যাচাই-বাছাই চলছে। চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটি রামপাল উপজেলার ফয়লাহাট এলাকায় বিমানবন্দর প্রকল্প উন্নয়ন ও বাস্তবায়নে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করে। চীনা প্রতিষ্ঠানটির বিবেচনায় খুলনা, বাগেরহাট ও মোংলার মাঝামাঝি অবস্থানের কারণে বিমানবন্দরটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে মোংলা বন্দর, মোংলা ইপিজেড, রপ্তানিমুখী চিংড়ি শিল্প, সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাড়াতে বিমানবন্দরটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে কাজ করতে পারে বলে প্রস্তাবে তুলে ধরা হয়েছে।

আরও জানা গেছে, খানজাহান আলী বিমানবন্দর প্রকল্প বাস্তবায়নে সিএমসি একক কোনো মডেল নির্ধারণ করে দেয়নি। বরং বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে চারটি সম্ভাব্য মডেলের যেকোনো একটির মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রথমত, জি-টু-জি (সরকার থেকে সরকার) ভিত্তিতে সফট লোন বা সহজ শর্তের ঋণের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব রয়েছে। দ্বিতীয়ত, পিপিপি অথবা জয়েন্টভেঞ্চার (জেভি) মডেলে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কিংবা যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে বিমানবন্দর নির্মাণ করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, বিওটি— বিল্ড, অপারেট অ্যান্ড ট্রান্সফার মডেলে বিমানবন্দর নির্মাণ, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তা পরিচালনা শেষে সরকারের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তাব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। চতুর্থত, ইপিসি-এফ মডেলে (ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট, কনস্ট্রাকশন ও ফাইন্যান্স) কাজ করার প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ অর্থায়নের ব্যবস্থা করে প্রকল্পের নির্মাণকাজসহ যাবতীয় সম্পন্ন করতে আগ্রহী সিএমসি।

সরকারি নথি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিভিন্ন খাতে সরকারি নিশ্চয়তা, অফ-টেক চুক্তি কিংবা পিপিপি কাঠামোর আওতায় অর্থায়ন বা বিনিয়োগ করতে আগ্রহী।

অন্যদিকে ইকুইলাইন ফাইন্যান্সের এই প্রস্তাব ঢাকায় অবস্থিত সংযুক্ত আরব আমিরাতের দূতাবাসের মাধ্যমে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠায়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে প্রস্তাবটি পরীক্ষা করে মতামত দিতে বলা হয়। এর ধারাবাহিকতায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় তাদের সংশ্লিষ্ট অংশের বিষয়ে মতামত চেয়ে বিষয়টি বেবিচকের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠিয়েছে।

ইকুইলাইন ফাইন্যান্সের প্রস্তাবের মধ্যে বিমান ও পর্যটন খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ খাতে বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা আধুনিকায়নে অর্থায়নের আগ্রহ দেখিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। শুধু বিমানবন্দর নয়, বাংলাদেশ বিমানের জন্য কার্গো উড়োজাহাজ ক্রয় এবং বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের অধীনে মিড-সাইজ হোটেল ও মোটেল নির্মাণের প্রস্তাবও রয়েছে। অর্থাৎ বিমানবন্দর অবকাঠামোর পাশাপাশি বিমান পরিবহন ও পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নেও বিনিয়োগ করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।

খানজাহান আলী বিমানবন্দর বাস্তবায়িত হলে শুধু বাগেরহাট নয়, পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। খুলনা, বাগেরহাট ও মোংলার মধ্যে যোগাযোগ সহজ হওয়ার পাশাপাশি মোংলা বন্দর, মোংলা ইপিজেড, চিংড়ি ও অন্যান্য রপ্তানি শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে পণ্য ও যাত্রী পরিবহন ব্যবস্থায় নতুন একটি বিমান যোগাযোগ যুক্ত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ আকর্ষণে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।