খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
মাঠপর্যায়ে সরবরাহ ব্যবস্থায় চরম ধীরগতি, সরকারি কেনাকাটায় জটিলতা এবং বাজেট ছাড় সংক্রান্ত অনিশ্চয়তার কারণে দেশজুড়ে দেখা দিয়েছে অত্যাবশ্যকীয় পরিবার পরিকল্পনা উপকরণের তীব্র সংকট। দেশের প্রায় প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং কমিউনিটি ক্লিনিকে চাহিদার তুলনায় সরকারি সরবরাহ প্রায় শূন্যের কোটায় এসে ঠেকেছে। ফলে চরম অনিশ্চয়তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন দেশের প্রান্তিক, নিম্ন আয়ের ও সুবিধা বঞ্চিত মানুষ।
প্রান্তিক পর্যায়ে শূন্য মজুদ, হাহাকার সেবাগ্রহীতাদের: পটুয়াখালী সদর উপজেলার মৌকরণ কমিউনিটি ক্লিনিকসহ দেশের সিংহভাগ প্রান্তিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গত ৮ মাস ধরে বিনামূল্যে সরবরাহযোগ্য কনডম, খাওয়ার বড়ি (ওরাল পিল) এবং ইনজেকশনসহ প্রধান তিনটি উপকরণের কোনো মজুত নেই। কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) ও স্থানীয় পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিয়মিত বিরতিতে সেবাগ্রহীতারা কেন্দ্রগুলোতে এলেও খালি হাতে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। বাজার থেকে অতিরিক্ত দামে এসব স্বাস্থ্যসামগ্রী কেনা নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে।
সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার নেপথ্যে: পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের (ডিজিএফপি) তথ্যমতে, দেশে ব্যবহৃত মোট জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণের প্রায় ৩৭ শতাংশ আসে সরকারি বিনামূল্যে বিতরণ কর্মসূচি থেকে। ২০২০ সাল থেকে ধীরগতিতে চলা এই সরবরাহ ব্যবস্থা ২০২৪ সালের জুলাই মাস থেকে পুরোপুরি স্তব্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। ‘পঞ্চম স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি’ (এইচপিএনএসপি) অনুমোদন না হওয়া এবং নীতিগত পরিবর্তনের কারণে কেনাকাটার আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় ‘সাপ্লাই চেইন’ বা সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে।
স্বাভাবিক সময়ে ডিজিএফপি প্রতি মাসে গড়ে ৬০ থেকে ৭০ লাখ পাতা খাওয়ার বড়ি, ৭০ লাখ থেকে ১ কোটি কনডম, ৭ থেকে ১০ লাখ ইনজেকশন বিতরণ করত। তবে বর্তমানে কেন্দ্রীয় গুদামগুলো খালি হয়ে আসায় বিতরণ কার্যক্রম নজিরবিহীনভাবে নেমে এসেছে তলানিতে।
অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ও মাতৃমৃত্যু বৃদ্ধির আশঙ্কা: সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ায় প্রজনন স্বাস্থ্যে তৈরি হয়েছে মারাত্মক ঝুঁকি। ইউনিসেফের এমআইসিএস এবং জাতীয় প্রজনন স্বাস্থ্যসূচকের তথ্যানুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দেশে মোট প্রজনন হার (টিএফআর) ২.৩-এ থাকলেও সম্প্রতি তা বৃদ্ধি পেয়ে ২.৪-এ দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, শুধু উপকরণের অভাবে প্রতি বছর লাখ লাখ অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ঘটছে, যা অনেক নারীকে ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ গর্ভপাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে মাতৃমৃত্যুর হার পুনরুত্থানের পথ তৈরি হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী হাতের কাছে না থাকাটা সরাসরি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার বড় বিপর্যয়। এ অবস্থা দ্রুত না সামলালে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী মাতৃমৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনার আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি অর্জন করা বাংলাদেশের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (ড্রাগস্ অ্যান্ড স্টোরস্) আ. ফ. ম. আরাফাত হোসেন জানান, সংকট নিরসনে দ্রুত জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় কেনাকাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ৩ আগস্ট এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবনা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। প্রশাসনিক অনুমোদন মিললেই দ্রুত দরপত্র আহ্বান ও সরবরাহ প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। আগামী অক্টোবরের মধ্যে সারা দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ ফের স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করছেন তারা।











































