আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
নেপালের ভয়াবহ বন্যায় মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রায় ৯০০ শিক্ষার্থীর প্রাণ বাঁচিয়েছেন এক প্রধান শিক্ষক। বিপর্যয়ের আগমুহূর্তে একের পর এক সতর্কবার্তা পেয়ে দ্রুত স্কুল খালি করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
নুওয়াকোট জেলার ত্রিভুবন ত্রিশুলি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি বিবিসিকে জানান, স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ১০ মিনিটে মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে তিনি চারটি ফোনকল পান। প্রত্যেকটি ফোনেই ভয়াবহ বন্যার সতর্কতা দেওয়া হয়েছিল।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে এক মুহূর্তও দেরি না করে শিক্ষার্থীদের উঁচু জায়গায় চলে যেতে বলেন দাওয়াদি। শিক্ষার্থীদের নিয়ে স্কুলের দিকে আসা বাসগুলোকেও তিনি ঘুরিয়ে দিয়ে নিরাপদ এলাকায় চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
দাওয়াদি বলেন, ‘আমরা যদি দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিতাম, আরও ১০ মিনিট দেরি হলে আজ শিক্ষার্থীসহ আমরা কেউই আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে পারতাম না।’
তিনি জানান, সতর্কবার্তা এসেছিল চারজন ভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে। এর মধ্যে এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক স্কুলে এসে মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার কথা জানান। এতে পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে যায়।
দাওয়াদি বলেন, অভিভাবকেরা কোনো শক্ত কারণ ছাড়া হঠাৎ স্কুলে ছুটে আসেন না। তাই তিনি বুঝতে পারেন, আর এক সেকেন্ডও নষ্ট করা উচিত নয়।
তিনি বলেন, ‘বন্যা না এলেও ক্ষতি ছিল শুধু এক দিনের ক্লাস। কিন্তু বন্যা এলে জীবন হারাতে হতো। এত মানুষের জীবন বাঁচাতে পেরেছি বলে আমি গর্বিত।’
বুধবারের ভয়াবহ বন্যায় নেপালের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়। এখন পর্যন্ত অন্তত ৯০০ এর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ৪ হাজারের বেশি নিখোঁজ রয়েছেন।
বন্যার পানির সঙ্গে আসা কাদা ও ধ্বংসাবশেষে ত্রিভুবন ত্রিশুলি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভবনও চাপা পড়ে যায়। স্কুল থেকে মাত্র প্রায় ১০০ মিটার দূরে থাকা একটি ছাত্রাবাস ভবন মুহূর্তের মধ্যেই পানিতে তলিয়ে যায়।
প্রধান শিক্ষক দাওয়াদিও মনে করেন, নেপালে আরও কার্যকর আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা প্রয়োজন। সাইরেন ও দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার সতর্কবার্তা থাকলে স্থানীয় বাসিন্দারাও আরও আগে নিরাপদ স্থানে যেতে পারতেন।
তবে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই। তিনি মনে করেন, কয়েক মিনিটের মধ্যে স্কুল খালি করার সিদ্ধান্তই বড় বিপর্যয় ঠেকিয়েছে।
দাওয়াদির ভাষায়, ‘যদি ক্লাস শেষ হওয়ার পর স্কুল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতাম, তাহলে হয়তো কিছুই অবশিষ্ট থাকত না-শুধু সকাল সাড়ে ৯টার ঘণ্টাটি বাজতে থাকত।’
প্রথমে অনেক শিক্ষার্থী পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পারেনি। ১৬ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইউনিশা আমাত্য জানায়, বন্যা আঘাত হানার মাত্র কয়েক সেকেন্ড আগে সে বন্ধুদের সঙ্গে নিরাপদে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
বিবিসিকে ইউনিশা বলে, ‘আমরা মাত্র ১০ সেকেন্ডের জন্য বেঁচে গেছি।’
বন্যার আগে তারা শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনা করছিল। শিক্ষকেরা এক জায়গায় জড়ো হলেও শুরুতে কী ঘটছে তা বুঝতে পারেনি। প্রায় পাঁচ মিনিট পর শিক্ষকরা এসে বন্যার খবর দেন এবং সবাইকে বাড়ি চলে যেতে বলেন।
ইউনিশা ও তার বন্ধুরা স্কুলের পেছনের সরু একটি পথ দিয়ে পাহাড়ের দিকে উঠে নিরাপদ আশ্রয়স্থলে চলে যায়। সে দ্রুত হাঁটতে না পারায় বন্ধুরা তাকে সাহায্য করে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই তার চোখের সামনে স্থানীয় বাজারটি পানির স্রোতে ভেসে যায়।
ইউনিশা জানায়, পালানোর সময় মানুষ একে অপরকে ধাক্কা দিয়ে নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করছিল। যারা অন্য একটি পথ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিল, তাদের কয়েকজন পানিতে ভেসে গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা প্রথমে স্কুল থেকে কয়েকশ মিটার উঁচু এলাকায় আশ্রয় নেন। পরে পাশের একটি গ্রামে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় এবং পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় অনেকেই সেখানে দুই রাত আটকে থাকেন।
পরে উদ্ধারকারী দল তাদের কাছে পৌঁছায়। প্রধান শিক্ষক দাওয়াদি ও ইউনিশা দুজনের বাড়িই স্কুলের বিপরীত পাশে নদীর ওপারে। শেষ পর্যন্ত তাদের হেলিকপ্টারে করে নিজ গ্রামে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।











































