মোংলা প্রতিনিধি||
ফেসবুকে একের পর এক আপত্তিকর পোস্ট ও ভিডিও ছড়িয়ে এক নারী বিউটিশিয়ানকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে আত্মহত্যার দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মোংলার এক কথিত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে। অভিযোগের পর আদালতের নির্দেশে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা হয়েছে। পরে অভিযান চালিয়ে প্রধান অভিযুক্ত রেজা মাসুদ ওরফে মাসুদ রানা (৪০) নামের ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পুলিশের দাবি, প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তি নিজেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে সাইবার হুমকি ও ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগ রয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় পৌর শহরের সিঙ্গাপুর মার্কেট এলাকায় অভিযান চালিয়ে রেজা মাসুদকে গ্রেপ্তার করে মোংলা থানা পুলিশ। পরে বৃহস্পতিবার দুপুরে তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়।
পুলিশ জানায়, সাইবার হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইলের শিকার এক নারীর ভাই ৩০ আগস্ট বাগেরহাট আদালতে তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা রেকর্ডের আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত অভিযোগটি মামলা হিসেবে রেকর্ডের জন্য মোংলা থানাকে নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পর বুধবার বিকেলে পুলিশ সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলাটি রেকর্ড করে।
মামলার আসামিরা হলেন- মোংলা পৌর শহরের কবরস্থান রোড এলাকার জিল্লুর সরদারের ছেলে মোঃ মাসুদ রানা (৪০), বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার গিলাতলা এলাকার মৃত আবুল হোসেনের ছেলে শেখ নাছিরুল হক সোহেল (৪০) এবং মোংলা পৌর শহরের মোর্শেদ সড়ক এলাকার হায়দার আলীর মেয়ে জিনিয়া আক্তার (২৯)।
মামলার বাদী মোংলা পৌর এলাকার শ্রম কল্যাণ রোডের বাসিন্দা মোঃ আল-আমিন মামলার অভিযোগে উল্লেখ করেন, প্রধান আসামি মাসুদ রানা নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে থাকেন। দ্বিতীয় আসামি শেখ নাছিরুল হক সোহেল বাদীর বোনের তালাকপ্রাপ্ত স্বামী এবং তৃতীয় আসামি জিনিয়া আক্তার বাদীর বোনের পরিচালিত বিউটি পার্লারের সাবেক কর্মচারী।
এজাহার সূত্রে জানা গেছে, বাদীর বোন কাজী কেয়া মোংলা পৌরসভার কবরস্থান রোড এলাকায় পৌরসভা থেকে ব্যবসায়িক ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ‘কেয়া ব্রাইডাল লুকস বিউটি পার্লার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন।
মামলায় অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, প্রধান আসামি মাসুদ রানা ওরফে রেজা মাসুদ দুইটি ফেসবুক পেইজ ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে কাজী কেয়াসহ মোংলার বিভিন্ন ব্যক্তি ও নারীর নামে আপত্তিকর এবং কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে পোস্ট দিয়ে আসছিলেন। এসব পোস্টের মাধ্যমে ব্যক্তি ও নারীদের সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার পাশাপাশি ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ব্ল্যাকমেইল করা হতো বলেও বাদীপক্ষের অভিযোগ।
বিশেষ করে কাজী কেয়াকে বিভিন্ন সময়ে অনৈতিক দাবি এবং অর্থের জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৮ জুলাই বিকেল ৪টার দিকে অভিযুক্ত মাসুদ রানা তার ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আইডি থেকে কাজী কেয়ার বিরুদ্ধে একের পর এক আপত্তিকর, মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত স্ট্যাটাস পোস্ট এবং ভিডিও আপলোড করেন। এসব পোস্ট ও ভিডিও মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন বলে অভিযোগ করা হয়।
এক পর্যায়ে কাজী কেয়া নিজের শিশু পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে ফেসবুক লাইভে এসে ঘটনার বর্ণনা দেন এবং আত্মহত্যার প্রস্তুতির কথা জানান। খবর পেয়ে মোংলা থানা পুলিশ তাকে উদ্ধার করে মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।
মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে নারীদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অপপ্রচার চালিয়ে তাদের সামাজিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে। এতে মোংলা পৌর শহর ও উপজেলার আরও অনেক নারী-পুরুষ একই ধরনের সাইবার হয়রানির শিকার হয়েছেন বলেও বাদীপক্ষ দাবি করেছে।
এদিকে কথিত সাংবাদিক রেজা মাসুদ ওরফে মাসুদ রানা আটকের খবরে বিভিন্ন এলাকায় ভুক্তভোগীরা মিষ্টি বিতরণ ও তাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসার খবর পাওয়া গেছে।
মোংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান বলেন, প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। মামলার প্রধান আসামীকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপর আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তিনি আরও বলেন, গ্রেপ্তার রেজা মাসুদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে নানা ব্যক্তিকে সাইবার হুমকি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগ রয়েছে।
যেভাবে উত্থানঃ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এবং একই বছরের ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে নিজেকে সাবেক ছাত্রদল নেতা হিসেবে পরিচিত করতে শুরু করেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন এবং মোংলা পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান মানিকের সঙ্গে পারিবারিক আত্মীয়তার সম্পর্ককে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে থাকেন। মাহবুবুর রহমান মানিক অভিযুক্ত রেজা মাসুদের স্ত্রীর বড় ভাই, অর্থাৎ তার সমন্ধি। এই আত্মীয়তার সূত্র ধরে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের অভিযোগ, এরপর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুককে নিজের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন অভিযুক্ত ব্যক্তি। মাদকবিরোধী আন্দোলনের দোহাই দিয়ে নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া, অভিযোগ তুলে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা এবং পরে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কোনো ব্যক্তি তার দাবির সঙ্গে আপস না করলে কিংবা অর্থনৈতিক সুবিধা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফেসবুকে বিভিন্ন ধরনের পোস্ট দিয়ে সম্মানহানির চেষ্টা করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও কিংবা বিভিন্ন তথ্য প্রকাশের ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগও উঠেছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, সামাজিক সমস্যা বা মাদকবিরোধী আন্দোলনের নামে ফেসবুকে পোস্ট দিলেও এর আড়ালে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করা হতো। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে না গিয়ে আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে নিয়ে পোস্ট দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তাদের দাবি, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে অনেক নিরীহ ব্যক্তি সামাজিকভাবে বিব্রত ও মানসিকভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন। কেউ কেউ সম্মানহানির ভয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে না চাইলেও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কাছে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।








































