আন্তর্জাতিক ডেস্ক ||
জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টনিও গুতেরেস সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এল নিনোর প্রভাব বিশ্বব্যাপী অনুভূত হতে শুরু করায় বিশ্ব ‘চরম আবহাওয়ার বিপদজনক অঞ্চলে’ প্রবেশ করেছে। বৃহস্পতিবার বিবিসি এ তথ্য জানিয়েছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এই প্রাকৃতিক আবহাওয়া সংক্রান্ত ঘটনাটির সর্বশেষ তথ্য প্রকাশ করেছে। এর থেকে দেখা যাচ্ছে এল নিনো গত ৭০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হতে পারে এবং অন্তত ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত ঘটনা যা প্রশান্ত মহাসাগরে তৈরি হয় এবং এটি বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত। এর ফলে উষ্ণ জল পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং বায়ুমণ্ডলে তাপ নির্গত করে। এল নিনো বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ধরন পরিবর্তন করে, কিছু অঞ্চলকে খরার দিকে ঠেলে দেয়, আবার অন্য কিছু অঞ্চলে শক্তিশালী টাইফুন ও বন্যা দেখা দেয়।
আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান তাপের পাশাপাশি এল নিনো কিছু জায়গায় তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেবে। এল নিনোর কারণে সৃষ্ট ক্রমবর্ধমান তাপ ইতিমধ্যেই বিভিন্ন প্রভাব ফেলছে; ইন্দোনেশিয়ায় দাবানলের ভয়াবহতা বৃদ্ধি থেকে শুরু করে ভারতে গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমী বৃষ্টিপাত হ্রাসের মতো প্রভাব দেখা যাচ্ছে। এই প্রভাব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে, অস্ট্রেলিয়ায় দাবানলের ঝুঁকি বৃদ্ধি থেকে শুরু করে দক্ষিণ আমেরিকায় আরো তীব্র বন্যা পর্যন্ত এর প্রভাব দেখা যাবে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি আগস্ট মাসে জানিয়েছিল, এল নিনোর কারণে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ তীব্র ক্ষুধার কবলে পড়তে পারে।
জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সৃষ্ট দূষণের ফলে সৃষ্ট জলবায়ু সংকট ইতিমধ্যেই চরম আবহাওয়াকে আরো তীব্র করে তুলছে এবং মানুষের প্রাণহানি ঘটাচ্ছে। এই গ্রীষ্মে ইউরোপে এযাবৎকালের সবচেয়ে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ আঘাত হেনেছে, যার ফলে অন্তত ৩৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এল নিনো এই প্রভাবকে আরো বাড়িয়ে দেবে এবং এই ঘটনার মাত্রাকে ‘সত্যিই বিস্ময়কর’ এবং ‘গডজিলা-স্তরের’ ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
গুতেরেস বলেন, ““আমাদের চোখের সামনেই এল নিনো বিশাল আকার ধারণ করছে। বিজ্ঞান এ বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ রাখে না: পৃথিবী এক অজানা পথে রয়েছে, এবং সেই পথ ক্রমশ উষ্ণ হচ্ছে। বিশ্ব চরম আবহাওয়ার বিপদসীমার মধ্যে রয়েছে। এখনকার লড়াইটা হলো ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় পদক্ষেপ গ্রহণ ও মানুষকে রক্ষা করার প্রতি আমাদের অঙ্গীকারের মধ্যে। আমাদের এই লড়াইয়ে জিততেই হবে।”
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, এল নিনোর সাথে সম্পর্কিত সম্ভাব্য চরম আবহাওয়ার পূর্বাভাস যত বেশি সম্ভব জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তারা একটি ‘বড় ধরনের উদ্যোগ’ গ্রহণ করেছে।
ডব্লিউএমও-এর মহাসচিব সেলেস্তে সাওলো সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, “এল নিনো বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী এবং অর্থনীতিতে একটি বিশাল আঘাত হানার সম্ভাবনা রাখে।”
যদিও বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার উপর এর প্রভাব ২০২৭ সাল পর্যন্ত অনুভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, এরপরেও বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা আগামী কয়েক মাসে বৃষ্টিপাতের ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের আশঙ্কা করছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্য আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে স্বাভাবিকের চেয়ে শুষ্ক পরিস্থিতির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা খরা এবং দাবানলের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে। চলতি শুষ্ক মৌসুমে ইন্দোনেশিয়া দেশব্যাপী ১ লাখ সাত হাজারেরও হেক্টরেরও বেশি জমি পুড়িয়ে দেওয়া দাবানল নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে।
চীন আশঙ্কা করছে, চলতি বছরেই সাতটি টাইফুন তাদের উপকূলে আঘাত হানবে – যা দেশটির বিশেষজ্ঞরা সুপার এল নিনোর প্রভাবের সাথে সম্পর্কিত বলে জানিয়েছেন। শুধু জুলাই মাসেই চীন তিনটি টাইফুনের সম্মুখীন হয়েছিল – বাভি, নউল এবং মায়সাক – যেগুলোতে অর্ধশতাধিক মানুষ মারা গিয়েছিল। গত আগস্ট মাসে টাইফুন ডলফিনের আঘাতে ভারী বৃষ্টিপাত ও তীব্র বাতাসের ফলে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল।
একইভাবে, পূর্ব আফ্রিকা, দক্ষিণ ব্রাজিল এবং দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে, যা বন্যার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাসচিব অধ্যাপক সেলেস্তে সাওলো বলেছেন, “আমরা ইতিমধ্যেই খরা ও বন্যার কারণে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা ও ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে পাচ্ছি এবং আমরা আশঙ্কা করছি, এল নিনোর তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে এই প্রভাবগুলোও বৃদ্ধি পাবে।”











































