Home Lead বুলেটের মুখে সাংবাদিকতা: খুলনায় ৪ সাংবাদিককে লক্ষ্য করে গুলি, ক্লুহীন তদন্ত!

বুলেটের মুখে সাংবাদিকতা: খুলনায় ৪ সাংবাদিককে লক্ষ্য করে গুলি, ক্লুহীন তদন্ত!

122


স্টাফ রিপোর্টার।।


আবারও রক্তে রঞ্জিত হতে বসেছিল দক্ষিণাঞ্চলের মুক্ত সাংবাদিকতার আঙিনা। আবারও এক বুক আতঙ্ক, উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তা তাড়া করে ফিরছে খুলনার কলম সৈনিকদের। বিভাগীয় শহরের বুক চিরে চারজন পেশাদার সাংবাদিককে লক্ষ্য করে চালানো অতর্কিত গুলিবর্ষণের ঘটনার পাঁচ-পাঁচটি দিন অতিবাহিত হয়ে গেলেও অন্ধকার থেকে আলোতে ফেরেনি মূল তদন্ত। সনাক্ত হয়নি ঘাতক হামলাকারীরা, উদঘাটিত হয়নি নেপথ্যের মাস্টারমাইন্ডদের কালো হাত। ফলে রাজপথে সত্য প্রকাশে নামা সাংবাদিকদের হৃদয়ে জমাট বাঁধছে এক অদেখা হাহাকার ও চরম নিরাপত্তাহীনতা।


গত ১৪ জুলাই, মঙ্গলবারের নিস্তব্ধ গভীর রাত। জাতিসংঘ পার্কের কাছে এক চায়ের দোকানে সহকর্মীদের সঙ্গে খোশগল্পে মেতেছিলেন কয়েকজন সাংবাদিক- দিনভর পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্লান্তি ভুলে এক পশলা আড্ডায়। সেখানে ছিলেন এসএ টিভির খুলনা ব্যুরো প্রধান রকিবুল ইসলাম মতি, এমইউজে খুলনার সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক ও স্টার নিউজের ব্যুরো প্রধান রাফিউল ইসলাম টুটুল, দৈনিক খুলনাঞ্চলের স্টাফ রিপোর্টার সৈয়দ হুমায়ুন কবীর রানা এবং দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ব্যুরো প্রধান আওয়াল শেখসহ কয়েকজন।


হঠাৎ রাত সোয়া ১২টার দিকে একটি মোটরসাইকেলের বিকট শব্দ আর তার পরপরই বিভীষিকাময় গুলির তোড়! অতর্কিতে সাংবাদিকদের বুক লক্ষ্য করে ছোঁড়া সীসার গুলিটি আছড়ে পড়ে সাংবাদিক রকিবুল ইসলাম মতির বসার টুলে। অলৌকিক ভাগ্যবলে সরাসরি শরীরে বিদ্ধ না হলেও সেই ঘাতক বুলেট সাংবাদিক আওয়াল শেখের বুকের ডান পাশ স্পর্শ করে জখম করে চলে যায়। মুহূর্তে আনন্দমুখর চায়ের আড্ডা রূপ নেয় মৃত্যুর বিভীষিকায়। ধোঁয়া ও বারুদের গন্ধ ছড়িয়ে আততায়ীর মোটরসাইকেলটি দ্রুতবেগে হারিয়ে যায় শান্তিধাম মোড়ের অন্ধকারে।


পরদিন পুলিশ বাদী হয়ে হত্যাচেষ্টা মামলা করেছে, স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) কমিশনার অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার জোরালো আশ্বাসও দিয়েছেন। তবে দিন গড়িয়ে রাত নামলেও এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছে কালপ্রিটরা। বারবার ক্ষোভ ও বেদনায় ফেটে পড়ছে খুলনা প্রেসক্লাব, মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং বাংলাদেশ জার্নালিস্ট প্রটেক্ট কমিটি (বিজেপিসি)।


সাংবাদিক নেতাদের কণ্ঠে আজ বিচারহীনতার পুরোনো ক্ষত ও দীর্ঘশ্বাসের সুর। আঞ্চলিক সংবাদপত্র পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান মিলটন তীব্র হতাশা ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে বলেন, “সত্যিই আমরা গভীর হতাশায় ভুগছি। খুলনার মাটি অতীতে মানিক চন্দ্র সাহা, হুমায়ূন কবির বালু, শেখ বেলাল উদ্দিন, রশিদ খোকনদের রক্তে ভিজেছে। কিন্তু বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো পরিবারই শতভাগ ন্যায়বিচার পায়নি। আমরা আর কোনো সহকর্মীর লাশ দেখতে চাই না, আমরা শুধু সত্যের উন্মোচন চাই। কারণ আজ খুলনা শহরের বুকে আমরা কেউ নিরাপদ নই।”


আজ মানুষের হাহাকার, সামাজিক বৈষম্য ও অন্যায়ের খবর যারা সমাজের সামনে তুলে ধরেন, সেই সাংবাদিকদের নিজেদের জীবনই আজ চরম বিপন্ন। বাংলাদেশ জার্নালিস্ট প্রটেক্ট কমিটির (বিজেপিসি) সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান কবির আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “আমরা মানুষের সুখ-দুঃখের কথা বলি, অথচ আজ আমরা নিজেরাই মৃত্যুকূপে দাঁড়িয়ে। সেদিন যদি কোনো সহকর্মীর জীবন চলে যেত, তবে তাঁর অসহায় পরিবারের আহাজারি শোনা ছাড়া আর কিছুই করার থাকত না। আমরা স্পষ্ট ভাষায় আমাদের কাজের স্বাধীনতা ও জীবনের নিরাপত্তা চাই।”


অবশ্য কেএমপি কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান জানান, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জোর তৎপরতা চালানো হচ্ছে এবং দ্রুতই ঘটনার মূল রহস্য উন্মোচিত হবে। তবে পুলিশ বিভাগের বিদ্যমান জনবল সংকটকে তিনি এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।


কথা আর প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়িতে সাংবাদিক সমাজের কান্না থামবে না। সহকর্মীর রক্তে ভেজা জামা আর গুলির শব্দ যখন খুলনার বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন রাজপথের কলম সৈনিকেরা চেয়ে আছেন ন্যায়বিচারের দিকে- বিচারহীনতার এই দীর্ঘ পথচলা শেষ হবে কবে?