কয়রা প্রতিনিধি।।
জলাবদ্ধ নিচু জমিতে পাট জাগ দেওয়ার পর্যাপ্ত পানি মেলায় এবং এবার রোগবালাইয়ের প্রকোপ কম থাকায় ফলন ও দামে স্বস্তি ফিরেছে সাতক্ষীরার পাটচাষিদের মুখে। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন গ্রামীণ সড়কের পাশে, খালের জলে ও বিলের কোমরসমান পানিতে নেমে কৃষকেরা ব্যস্ত সময় পার করছেন পাটের আঁশ ছাড়ানো ও শুকানোর কাজে। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে সোনালি আঁশ শুকানোর দৃশ্য এবং রোদের তাপে তার উজ্জ্বল রূপ কৃষক পরিবারগুলোতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
সাতক্ষীরা সদর, তালা ও কলারোয়া উপজেলার গ্রামগুলোতে ঘুরে দেখা গেছে, চাষিরা পাট কেটে ১৫ থেকে ২০ দিন পানিতে ভিজিয়ে (জাগ দিয়ে) রাখার পর আঁশ ছাড়াচ্ছেন। অনেকে ভ্যানগাড়িতে করে হাটে বিক্রির জন্য পাট নিয়ে যাচ্ছেন, আবার অনেকে শুকানো পাটকাঠি জ্বালানি ও বিক্রির উদ্দেশ্যে সারিবদ্ধভাবে আঁটি বেঁধে সাজিয়ে রাখছেন।
কৃষকদের ভালো ফলন ও সন্তোষ
সদর উপজেলার তুজলপুর এলাকার কৃষক মোহাম্মদ আবদুল করিম জানান, ধান কাটার পর জমিতে পাট বুনেছিলেন। ১৮ দিন পানিতে জাগ রাখার পর আঁশ ছাড়িয়ে শুকাচ্ছেন। উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে এবার তিনি ভালো মুনাফার প্রত্যাশা করছেন।
তালা উপজেলার ইসলামকাটি এলাকার কৃষক আকবার আলী বলেন, গত বছর পাটখেতে ছত্রাকজনিত গোড়া পচা ও বিছা পোকার আক্রমণ বেশি থাকায় বারবার কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়েছিল। কিন্তু এবার আবহাওয়া ভালো থাকায় রোগবালাই অনেক কম হয়েছে এবং বাজারে পাটের ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে।
একই সুর কলারোয়ার হেলাতলা এলাকার কৃষক আবুল হোসেনের কণ্ঠেও। তিনি জানান, প্রতিবছর দুই বিঘা জমিতে পাট চাষ করে গত বছর ২৫ মণ পাট পেলেও এবার আবহাওয়া ও ফলন ভালো হওয়ায় প্রায় ৩০ মণ পাট উৎপাদনের আশা করছেন। অন্যদিকে, মাত্র পাঁচ কাঠা জমিতে চাষ করে আড়াই থেকে তিন মণ পাট ও ৩৪ আঁটি পাটকাঠি পেয়ে লাভের মুখ দেখছেন কলারোয়ার ঝাপাঘাট গ্রামের কিবরিয়া সরদার।
উপাদানের বাড়তি সুবিধা: পাটকাঠি
কেবল পাটের আঁশই নয়, এবার পাটকাঠির বাজারেও আশাব্যঞ্জক দাম পাচ্ছেন চাষিরা। সদর উপজেলার আসাদুল সরদার জানান, ১১ শতক জমিতে পাট চাষ করে দুই মণ পাটের পাশাপাশি যে পাটকাঠি পেয়েছেন, তার প্রতি আঁটি বাজারে ৬০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে সার্বিক বিচারে উৎপাদন খরচ পুষিয়ে কৃষকের লাভ থাকছে।
কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যান ও আবাদ বৃদ্ধি
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলার সাতটি উপজেলায় ১১ হাজার ৬৭৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের (১১,৬০৭ হেক্টর) তুলনায় ৬৮ হেক্টর বেশি। এসব জমি থেকে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার বেল (প্রতি বেল প্রায় ১৮২ কেজি) পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম জানান, এবার প্রতি বিঘা জমিতে ১২ থেকে ১৫ মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া যাচ্ছে। পাটের পাতা মাটির উর্বরতা বাড়ায় এবং আঁশ ও পাটকাঠি বহুমুখী কাজে লাগে। তবে জেলায় নিজস্ব কোনো পাটকল বা ভারী শিল্প না থাকায় স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে এই পাট দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়।
বর্তমান বাজার দর ও বিপণন
কৃষি বিপণন কার্যালয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, বাজারে বর্তমানে গুণগত মানভেদে প্রতি মণ কাঁচা পাট ৩ হাজার ২০০ টাকা থেকে ৩ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা সালেহ্ মোহাম্মাদ আবদুল্লাহ্ জানান, জেলার পাটকেলঘাটা এলাকায় পাটের একটি বড় পাইকারি বাজার রয়েছে। তাছাড়া ফড়িয়া ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা সরাসরি গ্রামে গিয়েও কৃষকদের কাছ থেকে পাট সংগ্রহ করছেন। তথ্যপ্রযুক্তির সুবাদে কৃষকরা ঘরে বসেই বাজারদর জানতে পারছেন, যা তাদের ন্যায্যমূল্য পেতে সাহায্য করছে।











































