স্টাফ রিপোর্টার ।।
খুলনা অঞ্চলজুড়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন উপচে পড়ছে আক্রান্ত রোগীর ভিড়। তবে এই মানবিক বিপর্যয়ের সুযোগ নিয়ে খুলনায় গড়ে উঠেছে একশ্রেণীর অসাধু প্যাথলজি মালিক, দালাল চক্র ও চিকিৎসকদের সিন্ডিকেট। সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রোগীদের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠাতে বাধ্য করা হচ্ছে। এতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে চরম হয়রানি ও প্রতিনিয়ত আর্থিক শোষণের শিকার হচ্ছেন ডেঙ্গু আক্রান্ত ও তাদের স্বজনেরা।
খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতাল ও খুলনা জেলা সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিন গড়ে শত শত ডেঙ্গু ও ডেঙ্গু উপসর্গের রোগী ভিড় করছেন। সরকারি নিয়মানুযায়ী ডেঙ্গু শনাক্তকরণ টেস্ট (NS1) এবং রক্তের সিবিসি (CBC) বা প্লাটিলেট কাউন্ট অতি স্বল্পমূল্যে বা বিনামূল্যে করার বিধান থাকলেও হাসপাতালে নানা অজুহাতে পরীক্ষা বন্ধ রাখা কিংবা দীর্ঘ সময় ঝুলিয়ে রাখার অভিযোগ মিলছে।
ল্যাবে দীর্ঘ লাইন আর রিপোর্ট পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিলম্বের সুযোগ নিচ্ছেন হাসপাতালে সক্রিয় দালালরা। আয়া, ট্রলিচালক ও কিছু কর্মচারীর প্রত্যক্ষ সহায়তায় রোগীদের ভিড় ঠেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে হাসপাতালের ঠিক উল্টো দিকে থাকা অনুমোদনহীন বা কমিশননির্ভর বেসরকারি প্যাথলজিগুলোতে।
বাগেরহাটের ফকিরহাট থেকে আসা ডেঙ্গু রোগী রফিকুল ইসলামের স্ত্রী রহিমা বেগম আকুতি জানিয়ে বলেন, “হাসপাতালে সিবিসি পরীক্ষা করাতে গিয়ে তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও সিরিয়াল পাইনি। প্লাটিলেট আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে দালালদের কথায় বাইরের এক প্যাথলজিতে যাই।
সেখানে একই রক্ত পরীক্ষার জন্য ৮০০ টাকা নিয়েছে, অথচ সরকারি হাসপাতালে খরচ হওয়ার কথা মাত্র ৫০ থেকে ১০০ টাকা। আমাদের মতো গরিব মানুষের শেষ সম্বলটুকুও এভাবে কাড়া হচ্ছে।”
নগরীর রূপসা এলাকা থেকে খুমেকে ভর্তি হতে আসা আরেক ভুক্তভোগী সাব্বির হোসেন জানান, “ডাক্তার সাহেব প্রেসক্রিপশনে ডেঙ্গু টেস্টের পাশাপাশি এমন কিছু প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা লিখেছেন, যা বাইরের নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টার ছাড়া কেউ করতে পারছে না। এমনকি অন্য প্যাথলজি থেকে একই পরীক্ষা করিয়ে আনলে সেই রিপোর্ট গ্রহণে ডাক্তার গড়িমসি করেন এবং পুনরায় সেই নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক থেকেই রিপোর্ট করাতে বাধ্য করেন। দিনে দুই-তিনবার প্লাটিলেট মাপতেই ২ থেকে ৩ হাজার টাকা চলে যাচ্ছে।”
অভিযোগ রয়েছে, খুলনার ক্লিনিক ও প্যাথলজি সেন্টারগুলোর সাথে চিকিৎসকদের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ (কমিশন) চুক্তি রয়েছে। সরকার নির্ধারিত ফি অনুযায়ী ডেঙ্গু টেস্টের সর্বোচ্চ মূল্য ৫০-৩০০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও খুলনার অধিকাংশ প্যাথলজি তা মানছে না। এনএস-১, প্লাটিলেট ও সিবিসি টেস্টের নামে ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত হাঁকানো হচ্ছে। তদুপরি, অনেক ল্যাবে নিম্নমানের রিএজেন্ট ব্যবহার করে ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে, যা রোগীর জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
খুলনার সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, মহামারীকালীন এই স্বাস্থ্য খাতকে কেন্দ্র করে বাণিজ্য চালানো কেবল নৈতিকতার চরম অবক্ষয় নয়, এটি সরাসরি জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার শামিল। সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করতে খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তর ও জেলা প্রশাসনের অবিলম্বে মাঠে নামা উচিত।
ভুক্তভোগীদের দাবি-খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ সব সরকারি হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ডেঙ্গু পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে লাইসেন্সহীন প্যাথলজি, অতিরিক্ত ফি আদায়কারী প্রতিষ্ঠান ও দালাল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।











































