Home Lead মেটলাইফের নিঃশব্দ বেদনা: নীল-সাদা কাব্যের এক করুণ ট্র্যাজেডি

মেটলাইফের নিঃশব্দ বেদনা: নীল-সাদা কাব্যের এক করুণ ট্র্যাজেডি

9

স্পোর্টস ডেস্ক:

মেটলাইফ স্টেডিয়ামের এক প্রান্তে তখন আলোর রোশনাই, স্প্যানিশ উন্মাদনা আর ট্রফি স্পর্শের বাঁধভাঙা উল্লাস। স্পেনের ফুটবলাররা যখন বিশ্বজয়ের স্মারক ঘিরে আনন্দে আত্মহারা, ঠিক তখনই স্টেডিয়ামের অন্য প্রান্তে ফুটবলের ক্যানভাসে আঁকা হচ্ছিল এক নিঃশব্দ হাহাকার।

সবুজ ঘাসের ওপর একা বসে আছেন লিওনেল মেসি। পাশে খুলে রাখা বুট আর শিনগার্ড, দুই হাতের ভর দিয়ে পেছনে হেলান দিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন গ্যালারির দিকে। ট্রফি প্রদানের মঞ্চ তৈরিতে ব্যস্ত ফিফা’র স্বেচ্ছাসেবকদের একজন তাকে সরে যাওয়ার ইশারা করলেন, কিন্তু মেসির নিঃস্পৃহ দৃষ্টি যেন অনেক দূরে— গ্যালারির ভীড়ে তিনি তখন ব্যাকুল হয়ে খুঁজে ফিরছেন পরিবারের প্রিয় মুখগুলোকে। টেলিভিশনের ক্যামেরায় বারবার ধরা পড়ছিল মহাকালের এক করুণ ছবি— একটি যুগের, এক জীবন্ত কিংবদন্তির নিঃশব্দ বেদনার মহাকাব্য।

আর্জেন্টিনা মাঠে নেমেছিল কেবল একটি ম্যাচ জিততে নয়, পেলের অপরাজেয় ব্রাজিলের পর টানা দু’টি বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস ছুতে। কিন্তু ইতিহাসের পাতাগুলো আজ নীল-সাদাদের জন্য বড় নিষ্ঠুর হয়েই রইল। পুরো ম্যাচে প্রতিপক্ষের পোস্টে একটি লক্ষ্যভেদী শটও নিতে পারেনি লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা। অন্যদিকে একটি মাত্র সফল আক্রমণেই নিজেদের রাজত্ব ছিনিয়ে নেয় তরতাজা স্পেন।

ম্যাচ শেষে কণ্ঠে তীব্র বেদনা চেপে স্কালোনি বললেন, ‘আমরা ভীষণভাবে ভেঙে পড়েছি। এই সমর্থকরাই ছিল আমাদের শক্তির উৎস। আমরা চেষ্টা করেছি, কিন্তু স্পেনই আজ জয়ের যোগ্য ছিল। এটাই নির্ভেজাল সত্য। তবে এই ভাঙনের বুক থেকেই আমাদের আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে হবে।’

কিন্তু সেই ‘নতুন করে শুরু’র ক্যানভাসে কি আর কখনো দেখা মিলবে ১০ নম্বর জার্সির সেই চেনা জাদুকরের?

২০২১ ও ২০২৪-এর কোপা আমেরিকা, মাঝে ২০২২-এর সেই ঐতিহাসিক কাতার জয়— গত কয়েক বছর ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে আর্জেন্টিনা ছিল এক অপরাজেয় আবেগের নাম। মেটলাইফের এই ফাইনালটি মেসির জন্য ছিল কেবল ফুটবল নয়, তার হৃদয়ের খুব কাছের এক স্মৃতিকথা। কারণ যে স্পেনের কাছে স্বপ্নভঙ্গ হলো, সেই দেশেই কেটেছে তার শৈশব ও যৌবনের রূপকথা, বার্সেলোনার আঙিনায় রচিত হয়েছিল তার বিশ্বজয়ের পথচলা। সেই স্পেনের বিপক্ষেই এমন বেদনাময় হারের বিদায়— হৃদয়ভাঙ্গা এক ট্র্যাজেডির চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছিলেন, শেষ ষোলোয় মিশরের বিপক্ষে করেছিলেন সেই বাঁচা-মরার গোল, আর সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে তছনছ করে দিয়েছিলেন দুটি জাদুকরী অ্যাসিস্টে। পুরো টুর্নামেন্টে ৮ গোল আর ৪ অ্যাসিস্ট— একাই বয়ে নিয়ে গেছেন দেশের স্বপ্নকে। মাত্র দুটি গোলের জন্য গোল্ডেন বুটটি কিলিয়ান এমবাপ্পের হাতে উঠলেও মেসির মহিমা তো আর কোনো বুট বা ট্রফিতে সীমাবদ্ধ নয়।

২০৭টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ, ১২৫টি গোল, একটি বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা এবং একটি ফিনালিসিমা— আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির এই পরিসংখ্যান কেবল কিছু সংখ্যার হিসাব নয়; এটি একটি প্রজন্মের স্বপ্ন, একটি দেশের নিঃশ্বাস এবং ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর কবিতা।

সব সত্যের শেষ সত্য হলো সময়ের নিষ্ঠুরতা। পরবর্তী বিশ্বকাপ ২০৩০ সালে, তখন মেসির বয়স স্পর্শ করবে ৪৩— যা অবাস্তবের ওপারে। হয়তো ২০২৮-এর কোপা আমেরিকায় আবার তাকে দেখা যেতেও পারে, কিন্তু বিশ্বকাপের সেই নিখাদ সোনার ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরার শেষ দৃশ্যটি এমন ট্র্যাজেডিতে শেষ হবে, তা কে ভেবেছিল?

অশ্রুসিক্ত চোখে ট্রফিহীন এই প্রস্থান হয়তো আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির শেষ অধ্যায় হয়ে রইল। তবে নীল-সাদা পোশাকের শেষ দৃশ্যটি যতই বেদনার হোক না কেন, ফুটবল ইতিহাসের পাতায় লিওনেল মেসি নামের রাজপুত্রের মহাকাব্য চিরকাল অমলিন ও অমর হয়েই থাকবে।