Home আঞ্চলিক কৃষক শাহাজানের মুখে তৃপ্তির হাঁসি

কৃষক শাহাজানের মুখে তৃপ্তির হাঁসি

163

সাবজাল হোসেন,বিশেষ প্রতিনিধি    

চলছে আমনের মৌসুম। মাঠে মাঠে এখন দিগন্তজোড়া ক্ষেতের ধান বাতাসে দোল খাচ্ছে। জাতের ভিন্নতায় ধানের আকার ও আয়ুষ্কালের পার্থক্য রয়েছে। সে কারনেই মাঠের কোন ক্ষেতের ধান পাকা, কোনটা আধাপাকা। কোনটা সবেমাত্র শিষ বের হচ্ছে আবার কোনটাতে এখনও সময় লাগবে। কিন্ত বাংলাদেশ ধান গবেষনা ইনষ্টিটিউটের উদ্ভাবিত ব্রিধান ৭৫ ফলনে চমক সৃষ্টি করেছে। যা কৃষকের ঘরে উঠতে শুরু করেছে। এ জাতের ধানচাষে কম খরচে অল্পদিনে অধিক ফলন পেয়ে কৃষকেরা বেজায় খুশি। তাদের মধ্যে একজন ঝিনাইদহ কালীগঞ্জের কৃষক শাহাজান মন্ডল। তিনি এ বছর দুটি ক্ষেত মিলে মোট ১৮ কাঠা জমিতে ব্রিধান ৭৫’র চাষ করে এলাকার অন্য কৃষকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছেন। এখনই তিনি ওই জমিতে বোনাস ফসল হিসেবে ইচ্ছা মত রবিশস্যের চাষ করতে পারবেন এই ভেবে তার মনে দিচ্ছে খুশির দোলা। কৃষক শাহাজান মন্ডল উপজেলার কোলা ইউনিয়নের খড়িকাডাঙ্গা গ্রামের আব্দুল খালেক মন্ডলের ছেলে। তার ক্ষেতের ধান দেখে অন্য কৃষকেরাও ঝুঁকছেন ব্রিধান ৭৫’এ। যে কারনে তার ক্ষেতের ধান বীজ হিসেবে সবাই পেতে চাচ্ছেন।

কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসসূত্রে জানাগেছে,এ বছর আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৫’শ ৭০ হেক্টোর। কিন্ত চাষ হয়েছে ১৮ হাজার ৪’শ হেক্টোর। এরমধ্যে বাংলাদেশ ধান গভেষনা ইনষ্টিটিউটের উদ্ভাবিত ব্রিধান ৭৫’র চাষ হয়েছে ১’শত ৭৫ হেক্টোর জমিতে। যে জাতের ধানের বীজ ২০১৮ সালে উদ্ভাবিত। যা সরকারী প্রণোদনা হিসেবে কৃষকদেরকে বিনামূল্যে দেয়া হয়েছিল।

সরেজমিনে কৃষক শাহাজাহান আলী মন্ডলের একটি ধানক্ষেতে গেলে দেখা যায় ধানগুলো পেকে সোনালী রঙ ধারন করতে শুরু করেছে। ধানের বাইল বা শিষ ধানের ভারে নুইয়ে পড়ছে। ধান দেখে কৃষক শাহাজান ক্ষেতে দাঁড়িয়েই তৃপ্তির হাসি হাসছেন।

কৃষক শাহাজান মন্ডল জানান, মাঠে তার নিজের ৩ বিঘা চাষযোগ্য জমি আছে। আর বছরে ১২ হাজার টাকার চুক্তিতে আরও ৪ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে বিভিন্ন জাতের আমন ধানের চাষ করেছেন। এরমধ্যে কৃষি অফিস থেকে বীজ নিয়ে বর্গা নেয়া দুই দাগের ১৮ কাঠা জমিতে নতুন জাতের ব্রিধান ৭৫’র চাষ করেছেন। এরমধ্যে ১১ কাঠার একখন্ডের ক্ষেতটি কেটে মাড়াই সম্পন্ন করেছেন। তিনি বলেন, ওই ১১ কাঠায় তিনি মোট সাড়ে ১৭ মন ধান পেয়েছেন। রোপনের সময় থেকে ৭২ দিন সময় লেগেছে। আর এ জাতের ধানের বাকি আরেক খন্ড ক্ষেতেই রয়েছে। দুয়েক দিনের মধ্যে কেটে মাড়ায় করবেন।

তিনি বলেন, নতুন জাতের ব্রিধান ৭৫ তাদের মাঠে এ বছরই প্রথম চাষ করেছেন। একই সাথে রোপন করা অন্যজাতের ধান ক্ষেতের ধান সবেমাত্র বাইল বা শিষ বের হচ্ছে। অথচ ব্রিধান ৭৫ ঘরে উঠিয়ে এখন মসুর চাষের জন্য জমি প্রস্তত করতে বেশ সময় পাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন এ ধান রোপনের পর থেকে মাত্র ১ বার সার প্রয়োগ করেছেন। আর রোগ বালাই নেই বললেই চলে। কম উৎপাদন ব্যয়ে অল্প সময়ে ভালো ফলন পেয়েছেন। কৃষক শাজাহান আরও বলেন, তিনি বিগত ১৮ বছর ধরে কৃষি কাজের সাথে জড়িত। সব মৌসুমেই তিনি ধানের চাষ করে থাকেন। কোন কোন বছর ফলন এতো কম হয় যে উৎপাদন ব্যয় ঘরে আনাটাও কষ্ট হয়ে যায়। সেদিক বিবেচোনায় বর্তমান সময়ে ব্রিধান ৭৫ সবচেয়ে কৃষক বান্ধব বলে মনে করছেন। ফলে আগামীতে তিনি সব জমিতেই এ জাতের ধানের চাষ করবেন।

ওই গ্রামের কৃষক জামাল হোসেন জানান, তাদের গ্রামের সারা মাঠেই এখন আমন ধানের ক্ষেত। কিন্ত কৃষক শাহাজান মন্ডলের ক্ষেতে নতুন জাতের ধান হয়েছে দেখার মত। শুধু তাই নয়, তার ধানক্ষেতের পাশদিয়ে গেলে এ জাতের ধানের মিষ্টি সুগন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। আবার ফলনও ভালো। এখন গ্রামের অধিকাংশ মানুষ তার নিকট বীজের জন্য ধান কিনতে চাচ্ছেন। তিনি নিজেও আগামীতে এ ধানের চাষ করবেন। আর সবচেয়ে বড় কথা এ ধানের চাষ করে সহজেই রবি শস্যের চাষ করা সম্ভব।

কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার মোহায়মেন ইসলাম জানান, এ উপজেলার কৃষক শাহাজান মন্ডল একা নয় এ উপজেলাতে মোট ১’শ ৭৫ হেক্টোর জমিতে ব্রিধান ৭৫’র চাষ করা হয়েছে। এ ধানে উৎপাদন ব্যয় অনেক কম। অপেক্ষাকৃত কম দিনে সংগ্রহ করা যায়। ফলনও বেশি। তাই কৃষকদের দৃষ্টি এখন ব্রিধান ৭৫’র দিকে। কৃষি অফিসের মাঠকর্মিসহ কৃষকেরা সরাসরি এসেই এ ধানের ভালো ফলনের গল্প শোনাচ্ছেন। তিনি নিজেও কয়েকটি ক্ষেতে ধান দেখে প্রমান পেয়েছেন। ব্রিধান ৭৫’র পাকা ক্ষেতের পাশে গেলে একটা মিষ্টি সুগন্ধ পাওয়া যায়। সাড়া ফেলেছে কৃষকদের মাঝে। ফলে আগামীতে এ ধানের চাষ ব্যাপকহারে বাড়বে বলে তিনি মনে করছেন।

কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর ঝিনাইদহের উপ-পরিচালক কৃপাংশ শেখর বিশ্বাস জানান, বাংলাদেশ ধান গভেষনা ইনষ্টিটিউট ব্রিধান ৭৫ এর জাত উদ্ভাবন করে। এরপর ২০১৮ সালে সরকারী ভাবে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু হয়। এ জাতের ধান বীজ কৃষকদেরকে প্রণোদনা হিসেবে দেওয়ার পর কৃষকেরা চাষ করেছেন। ফলন ভালো পাওয়ায় এখন সাড়া পড়ে গেছে জেলাব্যাপি। তিনি বলেন, এ জাতের পাকা ধানক্ষেতের পাশ দিয়ে গেলে মিষ্টি গন্ধ পাওয়া যায়। তাই এটাকে সুগন্ধি ধান বলা হয়। কম আয়ুষ্কালের ধান হওয়ায় কৃষকেরা ধান কেটেই আবার ভালোভাবে অন্য ফসলের চাষের সুযোগ পাচ্ছেন। এখন থেকেই কৃষকেরা আগামী দিনের জন্য বীজ নিয়ে ভাবছেন। তিনি আরও বলেন, তাদের প্রদর্শনীপ্লট থেকে বীজ সংগ্রহ করবেন। আর কৃষক পর্যায়ের ক্ষেতের ধানের বীজ সংরক্ষনের জন্য প্রযুক্তি সহযোগীতা নিশ্চিত করা হবে। কৃষকের হাসিতে সারাদেশ হাসে। আর এটা ভাবতেও ভাল লাগে বলে যোগ করেন এই কৃষিবিদ।