Home Lead খুলনাসহ চার বিভাগে সক্রিয় শুটার নেটওয়ার্ক: গভীর রাতে নদী ও ইটভাটায় চলে...

খুলনাসহ চার বিভাগে সক্রিয় শুটার নেটওয়ার্ক: গভীর রাতে নদী ও ইটভাটায় চলে গোপন প্রশিক্ষণ

123


স্টাফ রিপোর্টার।।
নির্বাচন সামনে রেখে রাজধানীর বাইরে নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রধারী পেশাদার শুটারদের একাধিক গ্রুপ। খুলনা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও নারায়ণগঞ্জ—এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে নির্বাচনকে ঘিরে অন্তত ১৫ থেকে ২০ জন শুটার সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক গোয়েন্দা সূত্র। সুত্র-ইনকিলাব


গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ভোটের মাঠে প্রভাব বিস্তার, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো এবং প্রয়োজনে টার্গেট কিলিংয়ের প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই গভীর রাতে নদীর মাঝখানে নৌকায় বসে কিংবা পরিত্যক্ত ইটভাটায় আগ্নেয়াস্ত্র চালনার গোপন প্রশিক্ষণ চালাচ্ছে এসব গ্রুপ। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, শুটারদের তৎপরতাও তত বেশি সুসংগঠিত হচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, আগে নিষ্ক্রিয় বা আত্মগোপনে থাকা অনেক শুটারকে নতুন করে মাঠে নামানো হচ্ছে। স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও অপরাধী গডফাদারদের মাধ্যমেই এই যোগাযোগ স্থাপন হচ্ছে বলে উল্লেখ রয়েছে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে।
চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর চরাঞ্চল ও পতেঙ্গা এলাকার নির্জন স্থানগুলোকে ব্যবহার করছে অন্তত পাঁচজন শুটারের একটি গ্রুপ। স্থানীয় জেলেদের বরাতে জানা যায়, গভীর রাতে নৌকার ইঞ্জিনের শব্দের সঙ্গে মাঝেমধ্যে গুলির মতো শব্দ শোনা যায়।

তবে নির্বাচনী উত্তেজনা ও ভয়ের কারণে কেউ প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে সাহস পাচ্ছেন না। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, এই গ্রুপটি মূলত নির্বাচনের আগে ‘ভয় দেখানোর’ কাজের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।


খুলনায় রূপসা ও ভৈরব নদীসংলগ্ন এলাকা এবং পরিত্যক্ত ইটভাটাগুলো শুটারদের গোপন প্রশিক্ষণের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। এখানে সক্রিয় অন্তত চারজন শুটার আগে মাদক কারবার ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ছিল। নির্বাচনের আগে তারা আবার সংগঠিত হয়ে নিয়মিত আগ্নেয়াস্ত্রের অনুশীলন চালাচ্ছে। রাজশাহীতে পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সীমান্তঘেঁষা এই অঞ্চলে অবৈধ অস্ত্রের সহজ প্রবাহ শুটারদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। পদ্মা নদীর চর, ফাঁকা কৃষিজমি ও বন্ধ ইটভাটায় গভীর রাতে গুলি চালনার অনুশীলনের তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এখানে অন্তত তিন থেকে চারজন শুটার রয়েছে, যারা প্রয়োজনে ঢাকাসহ অন্য জেলায় গিয়ে নির্বাচনী সহিংসতায় ব্যবহৃত হতে পারে বলে গোয়েন্দাদের আশঙ্কা।


নারায়ণগঞ্জে শুটার নেটওয়ার্কের সঙ্গে গ্যাং কালচার ও রাজনৈতিক প্রভাবের সরাসরি সংযোগ পাওয়া গেছে। শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী এলাকা ও বন্ধ ইটভাটাগুলোতে নিয়মিত প্রশিক্ষণের তথ্য রয়েছে পুলিশের হাতে। এখানকার শুটারদের অনেকেই একাধিক মামলার আসামি হলেও জামিনে মুক্ত থেকে আত্মগোপনে রয়েছে।


অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, এই প্রশিক্ষণ কোনো বিচ্ছিন্ন বা এলোমেলো কর্মকাণ্ড নয়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যেই চলছে পরিকল্পিত প্রস্তুতি। খুব কাছ থেকে নিখুঁত নিশানা, দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ, অস্ত্র লুকানো এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখার কৌশল—এসব বিষয়েই অনুশীলন করছে শুটাররা। পুলিশের নজর এড়াতে বারবার প্রশিক্ষণস্থল পরিবর্তন করা হচ্ছে।


আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, নির্বাচন এলেই শুটারদের ব্যবহার বাড়ে। প্রকাশ্য সংঘর্ষের ঝুঁকি এড়িয়ে কম সময়ে বড় প্রভাব ফেলতে পেশাদার শুটারদের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ভোটের সময় বন্দুকধারী শুটার মানেই বড় ঝুঁকি। তারা সামনে না থেকেও নির্বাচনী ফলাফল প্রভাবিত করার সক্ষমতা রাখে।”


পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, নির্বাচন সামনে রেখে অস্ত্রধারী ও পেশাদার অপরাধীদের হালনাগাদ তালিকা তৈরির কাজ চলছে। তবে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, রাজনৈতিক চাপ, স্থানীয় আশ্রয়দাতা এবং জামিন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে অনেক শুটার এখনও আইনের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে।


অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শুটার গ্রুপগুলোর এই সক্রিয়তা শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্যও বড় হুমকি। তাদের ভাষায়, শুটারদের ধরপাকড়ের পাশাপাশি অর্থদাতা, আশ্রয়দাতা ও রাজনৈতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করা গেলে নির্বাচনী সহিংসতার ঝুঁকি থেকেই যাবে। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, চার বিভাগে শুটার গ্রুপগুলোর এই নীরব কিন্তু সুসংগঠিত প্রস্তুতি দেশের নির্বাচন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সামনে ক্রমেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।