খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচি শুরু হয় গত ১ জুলাই। ধাপে ধাপে এ কর্মসূচির ব্যাপকতা বাড়তে থাকে। তাদের আন্দোলনে যুক্ত হয় জনতাও। আন্দোলন দানা বাঁধলেও ১৭ জুলাই পর্যন্ত ঢাকায় পুলিশের মারণাস্ত্র ব্যবহার ছিল নিষেধ। ১৮ জুলাই এ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়; পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মাঠ পুলিশকে মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপরই ঢাকায় আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহার শুরু করে মাঠপর্যায়ের পুলিশ। পুলিশ সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, ১৮ জুলাই ঢাকার মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার হাবিবুর রহমান ওয়াকিটকিতে নির্দেশ দেন, ‘অলস্টেশন অ্যালার্ট, সিআর (চায়না রাইফেল) ফায়ার ওপেন করুন।’ তার এ ঘোষণা শুনে কিছুটা হতভম্ব হয়ে যান মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা। চায়না রাইফেল থেকে গুলি ছোড়া মানে হচ্ছে, অনেকটাই নিশ্চিত মৃত্যু। বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ার জন্য একজন পুলিশ কর্মকর্তা ডেল্টা-৩ অর্থাৎ কন্ট্রোল রুমকে ঘোষণাটা আবার দিতে বলেন। পরে পরিষ্কারভাবে ধীরে ধীরে ফের একই নির্দেশের
ঘোষণা দেওয়া হয়। পরদিন ১৯ জুলাইও ডিএমপি কমিশনার একই ঘোষণা দেন। কমিশনারের ঘোষণা শুনে অনেক কর্মকর্তা আগ্রাসী হয়ে ওঠেন। বুক-মাথা টার্গেট করে চায়না রাইফেলের গুলি চালালে ঘটনাস্থলেই অসংখ্য ছাত্র-জনতার মৃত্যু ঘটে। পুলিশের গুলিতে হতাহতের সংখ্যা যত বাড়তে থাকে, ছাত্র-জনতা তত বেশি উত্তেজিত হয়ে ওঠে বলে মাঠপুলিশে দায়িত্ব পালন করা একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
ডিএমপির একজন অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) বলেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন তখনো শান্তিপূর্ণ ছিল। এর মধ্যেই চায়না রাইফেল দিয়ে গুলি করার নির্দেশ দেওয়ায় আশ্চর্য হয়ে যাই। রাইফেলের একটি গুলি ছোড়া মানে হচ্ছে একটি মৃত্যু। হঠাৎ এভাবে ঘোষণা এলেও আমরা চেষ্টা করেছি যতটা সম্ভব শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে শান্ত রাখতে। মাঠে কাজ করা অধিকাংশ কর্মকর্তাই কৌশলে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছেন। তবে কমিশনারের নির্দেশের পর মাঠপর্যায়ের পুলিশ যেখানে আগ্রাসী হয়ে গুলি চালিয়েছে, সেখানে হতাহত বেশি হয়েছে।
এ কর্মকর্তার কথার প্রমাণ মেলে ঢাকার যাত্রাবাড়ী ও আশপাশের এলাকায় হতাহতের ঘটনায়। যাত্রাবাড়ী থানা ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের মধ্যে। ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মাদ ইকবালের একটি ভিডিও ভাইরাল হলে গত মঙ্গলবার তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ৩ আগস্টের ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে পুলিশের গুলির বিষয়টি তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালকে জানাচ্ছিলেন ডিসি ইকবাল। পাশেই ছিলেন তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন। ভিডিওতে ইকবালকে বলতে শোনা যায়, ‘গুলি করে করে লাশ নামানো লাগছে স্যার। গুলি করি, মরে একটা, আহত হয় একটা। একটাই যায় স্যার, বাকিডি যায় না। এইটা হলো স্যার সবচেয়ে বড় আতঙ্কের এবং দুশ্চিন্তার বিষয়।’
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে মোট নিহতের সংখ্যা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঢাকার আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পুলিশ ও ছাত্র-জনতা হতাহত হয়েছেন ওয়ারী বিভাগের অধীনে যাত্রাবাড়ী ও শনির আখড়া এলাকায়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ইকবালের দায়িত্বে থাকা যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, ওয়ারী, শ্যামপুর, গে-ারিয়া ও কদমতলী থানায় নিহত হয়েছে শতাধিক মানুষ। এসব ঘটনায় ৫ আগস্ট পর্যন্ত ওয়ারী বিভাগে সবচেয়ে বেশি ৫৫টি মামলা হয়। ওয়ারী বিভাগের ছয়টি থানায় গ্রেপ্তার করা হয় ৬৪৫ জনকে। সবচেয়ে কম মামলা হয় লালবাগ বিভাগে ১৭টি এবং সবচেয়ে কম গ্রেপ্তার হয় রমনা বিভাগে ১৮২ জন।
রমনা থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (বর্তমানে কুষ্টিয়ার ইনসার্ভিস সেন্টারে বদলি) উৎপল বড়–য়া বলেছিলেন, আমরা কোনো ছাত্র-জনতার ওপর সরাসরি গুলি চালাইনি। কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। ফলে কোনো পুলিশ কিংবা থানায় কোনো ধরনের আক্রমণ হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাঠ পুলিশের আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, গত ৩ ও ৪ আগস্ট তিনি শাহবাগ ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় এলাকায় দায়িত্ব পালন করছিলেন। ছাত্র-জনতা এ সময় ভীষণভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। তারা বিভিন্ন সময় পুলিশের ওপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা করেছে। এ সময় সমন্বয়করা শিক্ষার্থী-জনতাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছে। গুলি না চালিয়ে কৌশলী হওয়ায় বড় ধরনের হতাহত থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে। তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের জমায়েত দেখে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেন। গুলি না চালানোতে উর্ধ্বতনরা তাদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজও করেন। তবে পুলিশ ধৈর্য্য ধরেছে। ফলে হতাহত কম হয়েছে। ৫ আগস্ট সকালে ডিএমপির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নিজে মাঠে নেমে শহীদ মিনার এলাকায় চায়না রাইফেল দিয়ে গুলি চালান। ফলে অনেক হতাহত হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাঠ পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, চায়না রাইফেলের গুলি ৭ পয়েন্ট ৬২ বোরের। এই রাইফেলের গুলি চালানো মানে হচ্ছে অনেকটা নিশ্চিত মৃত্যু। হাত-পায়ে লাগলে মৃত্যু না হলেও চিরতরে পঙ্গু হয়ে যাবে। সাধারণত থানায় আক্রমণসহ বড় ধরনের প্রাণনাশের হুমকি থাকলে চায়না রাইফেল ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়। মেট্রোপলিটন এলাকায় কমিশনার কিংবা ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে গুলি চালানো হয়।
১৮ জুলাই থেকে চায়না রাইফেল চালানোর ব্যাপারে কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মাঠ পুলিশকে বলেন, রাস্তায় আন্দোলনে এখন আর কোনো শিক্ষার্থী নেই। বিএনপি-জামায়াত শিক্ষার্থীদের বেশে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তাই তাদের রাস্তা থেকে যে কোনো উপায়ে সরিয়ে দিতে হবে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য বলছে, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গত ১৬ জুলাই থেকে সারাদেশে তারা ৮১৯ জনের মৃত্যুর তথ্য পেয়েছে। এর মধ্যে ৬৩০ জনের নাম জানা গেলেও ১৮৯ জনের নাম জানা সম্ভব হয়নি। এ সময়ের মধ্যে আহত হয়েছে কমপক্ষে ২৫ হাজার মানুষ। ছয় সহস্রাধিক মানুষ তাদের এক চোখ বা দুই চোখের দৃষ্টিশক্তিই হারিয়েছেন। নিহতের তাদের মধ্যে ৬৯ শতাংশের বয়স ৩০-এর কম। এর মধ্যে ৫ আগস্ট সবচেয়ে বেশি ২০৫ জন নিহত হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শীর্ষ কর্মকর্তাদের নির্দেশে এবং প্রাণ বাঁচাতে মাঠ পুলিশ অনেক বেশি আগ্রাসী হয়ে ওঠে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের দিনও সারাদেশে হত্যাযজ্ঞ আর নৃশংসতাই এর প্রমাণ। ৫ আগস্ট জনগণের বিজয় মিছিলেও গুলি চালানো হয়েছে। সেদিন নিহত হন ২০৫ জন।
রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পা হারানো নবম শ্রেণির ছাত্র আল-আমিন জানায়, তারা ব্র্যাক বিশ^বিদ্যালয় এলাকায় বিজয় মিছিল নিয়ে বের হয়েছিল। পরে থানা এলাকায় গেলে পুলিশ তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। একটি গুলি এসে তার পায়ে লাগে। গুলিটি পায়ের পেছনের দিক দিয়ে ঢুকে সামনে দিয়ে বের হয়ে যায়। তার একটি পা কেটে ফেলা হয়েছে।
-সুত্র: আমাদের সময়







































