Home আঞ্চলিক সাধুহাটিতে ‘বিষমুক্ত’ সবজি চাষ

সাধুহাটিতে ‘বিষমুক্ত’ সবজি চাষ

36

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি।।

সারি সারি মাচার ওপর হাওয়ায় দুলছে শিমের সবুজ লতাপাতা ও বেগুনি রঙের ফুল। তার ওপর বাঁশের খুঁটি ও কঞ্চিতে বাঁধা নীল, লাল, হলুদ, সাদা রঙের বোতল। দূর থেকে এগুলো দেখতে খেলনা মনে হয়। কিন্তু এসব বোতল আসলে সবজির জন্য ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনের ফাঁদ। কীটনাশকের ব্যবহার কমাতে এ উদ্যোগ নিয়েছেন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার সাধুহাটি গ্রামের কৃষকরা। এভাবে প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে পোকা দমন করে এই মৌসুমে নিরাপদ সবজি উৎপাদন করছেন তারা।
অন্য ফসলের তুলনায় সবজি ক্ষেতে পোকামাকড় বেশি আক্রমণ করে। গাছের গোড়া পচে বা ডগা শুকিয়ে অকালেই ঝরে যায় ফুল। এতে সবজি উৎপাদন কমে লোকসান হয় কৃষকের। তাই ফসল রক্ষায় পোকা দমনে মাসে চার থেকে পাঁচবার, অনেক সময় এরও বেশি কীটনাশক দিতে হয়। নিয়ম না মেনে কীটনাশক বা অন্য ওষুধ প্রয়োগের ফলে সবজি মানবদেহের ক্ষতি করছে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি যেমন বাড়ছে, তেমনি উত্তম কৃষি চর্চা (গ্যাপ) সনদ না থাকায় কৃষক তাঁর ক্ষেতের সবজি বিদেশে রপ্তানি করতে পারছেন না। স্থানীয় বাজারেই সবজি বিক্রি করে দিতে হচ্ছে, যেখানে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন তারা। এসব বিবেচনা করে দেড় মাস আগে ‘উত্তম কৃষি চর্চা’র জন্য সাধুহাটি গ্রামকে নির্ধারণ করে সদর উপজেলা কৃষি বিভাগ।

সরেজমিন দেখা যায়, গ্রামটির ৩০ কৃষক তাদের প্রায় ৭০ বিঘা জমির লাউ, শিম, পটোলসহ অন্য সবজি ক্ষেতে পোকা দমনে ব্যবহার করছেন হলুদ, নীল পাত্র, সেক্স ফেরোমন ফাঁদ, ইয়েলো স্টিকি ফাঁদ ইত্যাদি। ফাঁদের কোনোটিতে আঠা, মবিলসহ পানি দিয়ে রাখা হচ্ছে। যেখানে পড়ে মারা যায় পোকা। ফেরোমন ফাঁদে পোকার নিঃসৃত গন্ধকে কৃত্রিমভাবে বোতলে রাখা হয়, যাকে বলে লিউর। এ গন্ধে আকর্ষিত হয়ে পুরুষ পোকা এসে ফাঁদে থাকা পানিতে পড়ে মারা যায়। পুরুষ পোকার মৃত্যুর মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি রোধ করা হয়। প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে কৃষকদের আগ্রহী করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কাজ করছে। এ ধরনের ফাঁদের সুফল পাচ্ছেন কৃষকরা।

কৃষক সিদ্দিক আলী বলেন, ‘হলুদ বোতলে এক প্রকার হলুদ জাব আছে, পোকামাকড় যেটায় আটকায়। আর ফেরোমন ফাঁদে গান্ধি ও অন্য পোকা পড়ে। নীল বোতলে ফুলের জালি নষ্টকারী নীল জাব পড়ে মারা যায়। কীটনাশকের ব্যবহার ছাড়াই এভাবে পোকা দমনে অনেক সুফল পাচ্ছি।’

কৃষক মন্টু জানান, পটোলের ক্ষেতে এই ফাঁদ ব্যবহার করার ফলে পোকার সংক্রমণ তুলনামূলক কম হচ্ছে। এতে আগে মাসে চারবার সবজিতে ওষুধ স্প্রে করতে হতো, এখন এক থেকে দুবার করলেই সুফল মিলছে।

ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূর-এ-নবী জানান, কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে নিরাপদ সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যে এ উদ্যোগ। দেশে সবজি প্রচুর উৎপাদন হলেও মানসম্মত ও গ্যাপ সনদ না থাকায় বিদেশে রপ্তানি করা যায় না। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই কৃষক তাঁর পণ্যের সঠিক মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। তাই কৃষকের পণ্যের গ্যাপ সনদ ও সঠিক মূল্যমান নিশ্চিতে জেলায় প্রথম সাধুহাটি গ্রামের মাধ্যমেই উদ্যোগটি নেওয়া হয়। এতে যে কীটনাশকের ব্যবহার একেবারে বন্ধ হবে, তা নয়। কীটনাশক থাকবে পরিমিত মাত্রায়, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হবে না। সবজি উৎপাদনের পর তা প্রয়োজনীয় নিরীক্ষা শেখে কৃষি বিভাগই সেই সবজির গ্যাপ সনদ দেবে।